আল–জাজিরা
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের অবসান এবং আবারও আলোচনায় ফেরার জন্য কাতারের মধ্যস্থতায় ওয়াশিংটনের কাছে আনুষ্ঠানিক কিছু শর্ত পাঠিয়েছে ইরান। দেশটির শীর্ষ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজায়ি আল–জাজিরাকে দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তেহরান এখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় রয়েছে।
শনিবার আল–জাজিরার তেহরান ব্যুরোপ্রধান নুর এদ্দিন এদঘিরকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে রেজায়ি বলেন, কাতারের সঙ্গে ইরানের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধের অবসানের লক্ষ্যে তেহরানের শর্তগুলো কাতার ইতিমধ্যে ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে।
তিনি বলেন, ‘মধ্যস্থতাকারী কাতারের সঙ্গে আমাদের যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে। যুদ্ধ অবসানের লক্ষ্যে তারা আমাদের শর্তগুলো ওয়াশিংটনের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। আমরা এখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের জবাবের অপেক্ষায় আছি।’
ইরানের সুপ্রিম ন্যাশনাল সিকিউরিটি কাউন্সিলের সচিবের দায়িত্ব নেওয়ার প্রায় এক মাস পর এই বক্তব্য দিলেন রেজায়ি। তাঁর ঘোষিত শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ, বিদেশে জব্দ বা আটকে থাকা ইরানের অর্থ ছাড় এবং ইরানের ওপর আরোপিত নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার।
তিনটি প্রধান শর্ত
রেজায়ি বলেন, ‘আমাদের শর্ত হলো—সব ফ্রন্টে যুদ্ধ বন্ধ করতে হবে, আমাদের জব্দ করা অর্থ ছাড়তে হবে এবং নৌ-অবরোধ তুলে নিতে হবে।’
তাঁর দাবি, এসব শর্ত মেনে নেওয়া শুধু তেহরানের স্বার্থেই নয়, ওয়াশিংটনের স্বার্থেও প্রয়োজন। ট্রাম্পের হুমকি দিয়ে ইরানকে আলোচনায় বাধ্য করা সম্ভব হবে না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
রেজায়ি বলেন, ‘ট্রাম্পের হুমকিতে কোনো কাজ হবে না। আমরা চূড়ান্ত যুদ্ধের জন্যও প্রস্তুত।’
এর আগে ইরান বলেছিল, যুদ্ধ ও নৌ-অবরোধ অব্যাহত থাকলে হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতিও স্বাভাবিক করা হবে না। তেহরান একই সঙ্গে যুদ্ধ বন্ধ, জব্দ অর্থ ছাড় এবং আঞ্চলিক পর্যায়ে সংঘাত কমানোর মতো শর্ত সামনে রেখে আসছে।
কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতার চেষ্টা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সরাসরি যোগাযোগ সীমিত হয়ে পড়ার পর কয়েক মাস ধরে কাতার ও পাকিস্তান দুই দেশের মধ্যে মধ্যস্থতার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে আগে হওয়া সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আলোচনার পথ পুনরায় খোলার চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
সাম্প্রতিক সময়ে চীনও দুই পক্ষকে সংযম দেখিয়ে আলোচনায় ফেরার আহ্বান জানিয়েছে। চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচির সঙ্গে বৈঠকে আগের অন্তর্বর্তী সমঝোতার ভিত্তিতে আলোচনার কাঠামো পুনর্গঠনের আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি দিয়ে নিরাপদে জ্বালানি পরিবহন নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও জোর দিয়েছেন তিনি।
তবে মধ্যস্থতাকারীদের তৎপরতার মধ্যেও সংঘাত পুরোপুরি থামেনি। বরং হরমুজ প্রণালি, উপসাগরীয় অঞ্চল এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্য কয়েকটি ফ্রন্টে উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
নতুন মার্কিন হামলার আশঙ্কা
ইরানে যুক্তরাষ্ট্র নতুন করে হামলা চালাতে পারে—এমন আশঙ্কাও উড়িয়ে দেননি রেজায়ি। সামরিক মূল্যায়নের বরাত দিয়ে তিনি বলেন, নতুন হামলার আশঙ্কা ‘বেশ জোরালো’। তবে একই সঙ্গে তেহরানও সম্ভাব্য সংঘাতের জন্য প্রস্তুত রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
রেজায়ির বক্তব্য অনুযায়ী, আগের দুই দফা সংঘাতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে ইরান তার সামরিক পরিকল্পনায় কিছু পরিবর্তন এনেছে। এবার তাদের মূল নজর থাকবে ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন নৌবাহিনীর ওপর।
তিনি বলেন, পারস্য উপসাগর থেকে ওমান উপসাগর হয়ে আরব সাগর পর্যন্ত মার্কিন সামরিক লক্ষ্যবস্তু ইরানের সম্ভাব্য হামলার আওতায় থাকবে। তবে ভারত মহাসাগরের আরও দূরের লক্ষ্যবস্তু ইরানের সামরিক পরিকল্পনার আওতায় পড়বে না বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
মার্কিন যুদ্ধজাহাজকে ঘিরে ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা
রেজায়ি দাবি করেন, সম্প্রতি মার্কিন রণতরি ও যুদ্ধজাহাজের কাছাকাছি এলাকায় একাধিক ওয়ারহেডযুক্ত জাহাজবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের সফল পরীক্ষা চালিয়েছে ইরান। ভবিষ্যতে এসব ক্ষেপণাস্ত্রের ওয়ারহেড আরও উন্নত করা হতে পারে বলেও জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভবিষ্যতে ইরানের পাল্টা হামলার মাত্রা আগের তুলনায় আরও তীব্র হতে পারে। মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করার পাশাপাশি ওই অঞ্চলে থাকা মার্কিন বাণিজ্যিক স্বার্থ ও মার্কিন কোম্পানিগুলোকেও সম্ভাব্য লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে বলে সতর্ক করেন তিনি।
এ ধরনের বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তেহরান একদিকে আলোচনার পথ খোলা রাখার বার্তা দিচ্ছে, অন্যদিকে সম্ভাব্য সামরিক সংঘাতের জন্য প্রস্তুতির কথাও জানাচ্ছে।
‘বাস্তব অর্থে যুদ্ধ এখনো চলছে’
যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে রেজায়ি বলেন, ‘বাস্তব অর্থে যুদ্ধ এখনো চলছে।’ তবে সংঘাত যত দ্রুত সম্ভব শেষ করতে তেহরান একটি নতুন কৌশল নিয়ে কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
আল–জাজিরার তেহরান প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রেজায়ির বক্তব্য ইরানের সাম্প্রতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে। একদিকে তেহরান মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের সঙ্গে যোগাযোগ বজায় রাখছে এবং যুদ্ধ বন্ধের শর্ত দিচ্ছে; অন্যদিকে সামরিক প্রস্তুতি অব্যাহত রাখার কথাও প্রকাশ্যে জানাচ্ছে।
অর্থাৎ, কূটনৈতিক দরজা পুরোপুরি বন্ধ না করলেও সামরিক চাপের মধ্যে নিজেদের অবস্থান শক্ত রাখার কৌশল নিয়েছে তেহরান।
ওয়াশিংটন কীভাবে দেখছে ইরানের শর্ত?
পেন্টাগনের আরব উপদ্বীপবিষয়ক সাবেক পরিচালক ডেভিড ডেস রোচেস আল–জাজিরাকে বলেছেন, ওয়াশিংটন সম্ভবত ইরানের এই শর্তগুলোকে আলোচনার জন্য খুব একটা ইতিবাচক সূচনা হিসেবে দেখবে না।
তাঁর মতে, প্রথম দৃষ্টিতে যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্তকে ইরানের পক্ষ থেকে সমঝোতার চেয়ে নিজেদের অবস্থান থেকে চাপ তৈরির প্রচেষ্টা হিসেবে দেখতে পারে। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের অবস্থানে কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেখছেন।
বিশেষ করে আগে ইরান যে যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ দাবি করেছিল, সাম্প্রতিক শর্তের তালিকায় সেই দাবি না থাকার বিষয়টি তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
ডেস রোচেস বলেন, ‘সবার আগে নজর কাড়ে যে তিনি ক্ষতিপূরণের দাবিটি বাদ দিয়েছেন।’
অর্থাৎ, ইরানের নতুন প্রস্তাবে কিছু কঠোর শর্ত বহাল থাকলেও আগের তুলনায় আলোচনার জন্য একটি সীমিত জায়গা তৈরি হয়েছে কি না, সেটি এখন পর্যবেক্ষণের বিষয়।
আলোচনার পাশাপাশি সামরিক প্রস্তুতি
ইরানের সর্বশেষ বার্তা এমন এক সময়ে এল, যখন যুক্তরাষ্ট্র ও তেহরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় শুরু করার চেষ্টা চলছে, কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে উত্তেজনা কমার স্পষ্ট লক্ষণ নেই। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পও সাম্প্রতিক সময়ে যুদ্ধ শেষ হওয়ার সম্ভাবনার কথা বলেছেন। তবে একই সময়ে সংঘাত ও হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে আঞ্চলিক উত্তেজনা অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে কাতারের মাধ্যমে ইরানের শর্ত ওয়াশিংটনে পৌঁছানোকে কূটনৈতিক তৎপরতার নতুন ধাপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র এসব শর্ত গ্রহণযোগ্য মনে করবে কি না এবং দুই পক্ষ আবার আনুষ্ঠানিক আলোচনার টেবিলে ফিরতে পারবে কি না।
তেহরানের বক্তব্য থেকে আপাতত যে বার্তাটি স্পষ্ট, তা হলো—যুদ্ধ বন্ধের জন্য তারা আলোচনার পথ খোলা রাখছে, কিন্তু সেই আলোচনার আগে যুদ্ধ বন্ধ, ইরানের অর্থ ছাড় এবং নৌ-অবরোধ প্রত্যাহারের মতো শর্তকে তারা গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে।