রয়টার্স | রিয়াদ
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে প্রধান বিমানবন্দরের কাছে শনিবার ভোরে বিস্ফোরণের পর আগুন ও কালো ধোঁয়ার বিশাল কুণ্ডলী দেখা গেছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে রিয়াদ ও আশপাশের এলাকায় ‘বিমান হামলার হুমকি’ জানিয়ে সতর্কতা জারি করেছিল সৌদি কর্তৃপক্ষ। পরে ইয়েমেনের হুতিরা রিয়াদের ‘সংবেদনশীল স্থাপনা’ লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করে। সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট জানিয়েছে, রিয়াদের দিকে ছোড়া একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করা হয়েছে।
হামলার সময় কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও ঘন কালো ধোঁয়া দেখা যায়। রয়টার্সের যাচাই করা ভিডিওতে বিমানবন্দরের আশপাশ থেকে ধোঁয়ার কুণ্ডলী উঠতে দেখা গেছে। বিমানবন্দরে কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হওয়ার খবরও পাওয়া যায়। তবে সৌদি কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে কোনো হতাহত বা বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর দেয়নি।
এই হামলার মধ্যেই ইরানের বিরুদ্ধে বিদ্যমান মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর আইনে সই করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ওয়াশিংটনের এ পদক্ষেপকে তেহরান ‘অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে বর্ণনা করেছে। ফলে একদিকে সৌদি আরবকে ঘিরে ইয়েমেনের যুদ্ধ নতুন করে তীব্র হচ্ছে, অন্যদিকে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক চাপও অব্যাহত থাকছে।
রিয়াদে প্রথম বড় সতর্কতা
শুক্রবার গভীর রাতে রিয়াদ ও রাজধানীর পূর্বে অবস্থিত আল-খারজ এলাকায় বাসিন্দাদের মোবাইল ফোনে সতর্কবার্তা পাঠানো হয়। এতে সম্ভাব্য আকাশপথের হামলার আশঙ্কার কথা জানিয়ে মানুষকে নিরাপদ স্থানে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়। পরে শনিবার সকালে ওই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়। এটি জুলাইয়ে ইয়েমেনে নতুন করে সংঘাত তীব্র হওয়ার পর রিয়াদে প্রথম বড় ধরনের বিমান হামলার সতর্কতা ছিল।
সতর্কতা জারির পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও কালো ধোঁয়া দেখতে পাওয়ার কথা জানান স্থানীয় বাসিন্দারা।
সৌদি কর্তৃপক্ষ পরে জানায়, হুতিরা রিয়াদের পাশাপাশি বিশা, তাইফ, ফারাসান ও ইয়ানবুতে বেসামরিক মানুষ ও অবকাঠামো লক্ষ্য করার চেষ্টা করেছিল। সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এসব হামলা প্রতিহত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে হুতিদের সামরিক মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি জানান, রিয়াদে ‘সংবেদনশীল স্থাপনা’ এবং লোহিত সাগরের উপকূলীয় শহর ইয়ানবুতে সৌদি আরবের তেল কোম্পানি আরামকোর স্থাপনা লক্ষ্য করে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। হুতিদের দাবি, ইয়েমেনের রাজধানী সানায় সৌদি হামলার জবাবেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
বিমান চলাচলে প্রভাব
রিয়াদের নিরাপত্তা পরিস্থিতির প্রভাব পড়েছে বিমান চলাচলেও। কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কয়েকটি ফ্লাইট বাতিল ও বিলম্বিত হয়েছে। রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ এই বিমানবন্দরের কাছেই আগুনের সূত্রপাত হওয়ায় যাত্রীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
তবে তাৎক্ষণিকভাবে বিমানবন্দর পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। সৌদি কর্তৃপক্ষও হামলায় বিমানবন্দরের বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির কথা জানায়নি।
রিয়াদে হামলার ঘটনা এমন এক সময়ে ঘটল, যখন ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চল ও লোহিত সাগর উপকূলজুড়ে হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রা এবং সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর পাল্টা অভিযান অব্যাহত রয়েছে। গত জুলাই থেকে শুরু হওয়া নতুন সংঘাতকে ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সবচেয়ে তীব্র সামরিক উত্তেজনার পর্যায় হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বাব আল–মানদেব ঘিরে নতুন চাপ
ইয়েমেনের সংঘাতের সঙ্গে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ যোগসূত্র রয়েছে। হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা পশ্চিমাঞ্চলীয় এলাকাগুলো লোহিত সাগর ও বাব আল–মানদেব প্রণালির কাছাকাছি। এই প্রণালি দিয়ে বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশের জ্বালানি ও পণ্য পরিবহন হয়ে থাকে।
সাম্প্রতিক সময়ে হুতিরা লোহিত সাগরের উপকূলে তাদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করেছে। কয়েক দিনের অভিযানে সৌদি-সমর্থিত বাহিনীকে কৌশলগত কয়েকটি এলাকা থেকে পিছু হটতে হয়েছে। এর ফলে বাব আল–মানদেব ও আশপাশের সমুদ্রপথের নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
সানা সেন্টারের কর্মকর্তা ইয়াসমিন আল-ইরিয়ানি আল–জাজিরাকে বলেছেন, সাম্প্রতিক সংঘাতে হুতিরাই উত্তেজনার সময় ও মাত্রা নির্ধারণ করছে। তাঁর মতে, পাহাড়ি ও দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে তাদের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান পরিচালনা করা সৌদি-সমর্থিত বাহিনীর জন্যও কঠিন হয়ে উঠেছে।
তাইজ ও মারিবে তীব্র লড়াই
ইয়েমেনের বিভিন্ন এলাকায়ও সরকারি বাহিনী ও হুতিদের মধ্যে সংঘর্ষ চলছে। বিশেষ করে তাইজ, মারিব, লাহজ, আল-জাওফ ও আল-বায়দা এলাকায় সামরিক উত্তেজনা বেড়েছে। সৌদি-সমর্থিত ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে অভিযান চালাচ্ছে, আর হুতিরাও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।
শনিবার সরকারি বাহিনী দাবি করেছে, দক্ষিণ মারিবের আল-ফুলিয়াহান এলাকায় হুতিদের একটি অনুপ্রবেশের চেষ্টা তারা প্রতিহত করেছে। এতে ১২ জন হুতি যোদ্ধা নিহত এবং আরও কয়েকজন আহত হয়েছে বলে তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়। দুই দিনের সংঘর্ষে তাইজ ও লাহজে ১৩ জন ইয়েমেনি সেনা নিহত হওয়ার কথাও জানিয়েছে সরকারি বাহিনী। এসব দাবির স্বাধীনভাবে পূর্ণাঙ্গ যাচাই করা যায়নি।
তাইজের পাহাড়ি এলাকাগুলোতেও সংঘর্ষ তীব্র হয়েছে। দুর্গম ভূখণ্ডের কারণে সেখানে কোনো পক্ষের জন্যই দ্রুত নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা কঠিন। ফলে স্থলযুদ্ধের পাশাপাশি বিমান হামলাও বাড়ছে।
মারিব নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কয়েক বছর ধরে হুতিরা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ এই প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করছে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর সংঘাতের তীব্রতা কিছুটা কমলেও মারিবকে ঘিরে দুই পক্ষের সামরিক প্রতিযোগিতা পুরোপুরি থামেনি।
ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা আরও পাঁচ বছর
ইয়েমেনে সংঘাতের পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার উত্তেজনাও নতুন মাত্রা পেয়েছে। গত শুক্রবার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘লিন্ডসে ও. গ্রাহাম স্যাংশনিং রাশিয়া অ্যান্ড ইরান অ্যাক্ট অব ২০২৬’ নামের এইচআর ৫৩৩৪ বিলে সই করেছেন। হোয়াইট হাউস জানিয়েছে, আইনটি রাশিয়া ও ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা, শুল্ক ও অন্যান্য নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থার আইনি কাঠামো সম্প্রসারণের পাশাপাশি ইরানের বিদ্যমান নিষেধাজ্ঞা আরও পাঁচ বছর বাড়িয়েছে।
এর ফলে ১৯৯৬ সালের ‘ইরান স্যাংশনস অ্যাক্ট’-এর কার্যকারিতা আরও পাঁচ বছর বাড়ল। মার্কিন প্রশাসনের ভাষ্য অনুযায়ী, এই আইনের মাধ্যমে ইরানের জ্বালানি খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিদেশি ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধেও নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষমতা বহাল থাকবে।
এর আগে হোয়াইট হাউসের নীতি-বিষয়ক নথিতে বলা হয়েছিল, আইনটির মাধ্যমে ১৯৯৬ সালের ইরান নিষেধাজ্ঞা আইন আরও পাঁচ বছরের জন্য বাড়ানো হবে।
ইরান এ পদক্ষেপকে অর্থনৈতিক চাপ হিসেবে দেখছে। তেহরানের অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের অর্থনীতি ও জ্বালানি খাতকে চাপে রাখার চেষ্টা করছে।
হরমুজে জ্বালানি পরিবহন নিয়ে মার্কিন দাবি
ইরানকে ঘিরে নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি নিয়েও ওয়াশিংটনের নজর অব্যাহত রয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ডের দাবি, গত দুই সপ্তাহে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অপরিশোধিত তেল, পণ্য এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহনের পরিমাণ ছয় মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালিকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারেও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন সামরিক সংঘাত একই সঙ্গে হরমুজ ও বাব আল–মানদেব—দুটি গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তাকে প্রভাবিত করছে।
‘নিরাপত্তা বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয়’
এদিকে মধ্যপ্রাচ্যে টেকসই নিরাপত্তাব্যবস্থা বাইরের কোনো পক্ষের চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি। ইন্দোনেশিয়ার ‘গ্লোবাল টাউন হল ২০২৬’ অনুষ্ঠানে ভার্চ্যুয়ালি দেওয়া বক্তব্যে তিনি বলেন, সংলাপ, পারস্পরিক আস্থা, সহযোগিতা ও সম্মানের ভিত্তিতে আঞ্চলিক নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
আরাগচি পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দারের সঙ্গেও আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে ফোনে কথা বলেছেন। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ পুনরায় চালুর পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
ইরানের সঙ্গে আলোচনার পথ পুনরায় খোলার বিষয়ে কাতার, পাকিস্তানসহ কয়েকটি দেশ কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ওমানের রাজধানী মাসকাটে হুতিদের প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাতে জানিয়েছে রয়টার্স।
একই সময়ে দুই ফ্রন্টে উত্তেজনা
রিয়াদের বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও বিস্ফোরণ, ইয়েমেনে হুতিদের স্থলঅভিযান, বাব আল–মানদেব ঘিরে সামুদ্রিক উত্তেজনা এবং ইরানের ওপর নতুন করে মার্কিন নিষেধাজ্ঞা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এখন একাধিক ফ্রন্টে ছড়িয়ে পড়ছে।
রিয়াদে শনিবারের হামলা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি সৌদি রাজধানীর নিরাপত্তাকে সরাসরি চ্যালেঞ্জ করেছে। যদিও সৌদি বিমান প্রতিরক্ষা একটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিহত করার দাবি করেছে এবং তাৎক্ষণিকভাবে হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি, বিমানবন্দরের কাছে আগুন ও ফ্লাইট বিঘ্নিত হওয়ার ঘটনা পরিস্থিতির ঝুঁকি স্পষ্ট করেছে।
অন্যদিকে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরও পাঁচ বছর বাড়ানোর সিদ্ধান্ত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যকার অর্থনৈতিক চাপের মেয়াদ দীর্ঘ করল। ফলে কূটনৈতিকভাবে আলোচনার চেষ্টা চললেও সামরিক ও অর্থনৈতিক—দুই দিকেই চাপ অব্যাহত রয়েছে।
এই পরিস্থিতিতে ইয়েমেনের যুদ্ধ কতটা বিস্তৃত হয়, বাব আল–মানদেব ও হরমুজের মতো গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ কতটা নিরাপদ থাকে এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক যোগাযোগ কোন দিকে এগোয়—এসব বিষয়ই এখন মধ্যপ্রাচ্যের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।