ঢাকা

লংমার্চের উদ্দেশ্য নিয়ে বিএনপির প্রশ্ন, রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও নজর

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটসহ বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১–দলীয় জোটের ধারাবাহিক কর্মসূচির ওপর নজর রাখছে বিএনপি। তবে এসব কর্মসূচিকে আপাতত বড় কোনো রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে না ক্ষমতাসীন দলটি। সংসদ ও রাজনৈতিক বক্তব্যে বিরোধীদের কর্মসূচির জবাব দেওয়া হলেও পাল্টা কোনো কর্মসূচি দেওয়ার কথা ভাবছে না বিএনপি।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা প্রথম আলোকে বলেছেন, সরকারে থেকে বিরোধী দলের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার চেয়ে যেসব সমস্যা নিয়ে বিরোধীরা মাঠে নামছে, সেগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়াকেই বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। বিশেষ করে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটের মতো জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো মোকাবিলায় সরকারের পদক্ষেপের ওপরই জোর দেওয়া হচ্ছে।

তবে বিএনপির ভেতরেই একটি অংশ মনে করে, জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধী দলগুলো ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকলে সেটিকে দীর্ঘ সময় উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। এ ধরনের কর্মসূচির রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে দলের পক্ষ থেকে জনগণের কাছে ব্যাখ্যা তুলে ধরার প্রয়োজন হতে পারে।

জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে ১১–দলীয় জোট ইতিমধ্যে জ্বালানি তেল, গ্যাস ও বিদ্যুৎ–সংকটের সমাধান, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের চেতনা ও গণভোটের রায় বাস্তবায়নসহ বিভিন্ন দাবিতে ধারাবাহিক কর্মসূচি শুরু করেছে। গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পর্যন্ত লংমার্চের পর আজ রংপুর অভিমুখে লংমার্চ করছে জোটটি। পর্যায়ক্রমে খুলনা, সিলেটসহ অন্যান্য বিভাগীয় শহর অভিমুখেও লংমার্চ করার ঘোষণা রয়েছে।

লংমার্চের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন

বিরোধী দলগুলোর এসব কর্মসূচির রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন বিএনপির নেতারা। তাঁদের বক্তব্য, লংমার্চ বা এ ধরনের কর্মসূচির মাধ্যমে গ্যাস, বিদ্যুৎ কিংবা জ্বালানি–সংকটের মতো সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সরকার এসব সমস্যা সমাধানে যে পদক্ষেপ নিচ্ছে, সেটিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত।

প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানও সংসদে লংমার্চের উদ্দেশ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। জ্বালানি–সংকটের সমাধানে লংমার্চ প্রসঙ্গে তিনি সংসদে বলেন, একটি বড় গাড়িবহর নিয়ে লংমার্চ আয়োজন করা হয়েছিল। জনগণকে অযথা উত্তেজিত করে অন্য কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।

তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গাড়ির লংমার্চ করে যদি গ্যাস বা বিদ্যুতের সমস্যার সমাধান করা যেত, তাহলে সরকারই সবার আগে লংমার্চের আয়োজন করত।

সরকারের অন্য নেতারাও বিরোধী দলগুলোর লংমার্চের সমালোচনা করেছেন। তাঁদের বক্তব্যে কর্মসূচিটির যৌক্তিকতা, দেশের জ্বালানি–সংকটের বাস্তব পরিস্থিতি এবং সরকার এ সংকট মোকাবিলায় কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে—এসব বিষয় উঠে এসেছে।

বিএনপি দেখছে গণতান্ত্রিক কর্মসূচি হিসেবে

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী প্রথম আলোকে বলেন, বিরোধী দলের লংমার্চকে তাঁরা গণতান্ত্রিক চর্চার অংশ হিসেবেই দেখছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করা সবার অধিকার এবং বিএনপি বিষয়টিকে সেভাবেই দেখছে।

তবে বিরোধীদের কর্মসূচিকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার প্রয়োজন দেখছে না দলটি। বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের ভাষ্য, সরকারে থাকা অবস্থায় বিরোধী দলের প্রতিটি কর্মসূচির জবাবে একই ধরনের কর্মসূচি দেওয়া তাদের অগ্রাধিকার নয়।

সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে জনগণের সমস্যা সমাধানে কাজ করা। তাই বিরোধীরা যে ইস্যুতে কর্মসূচি দিচ্ছে, সেসব ইস্যুর বাস্তব পরিস্থিতি মোকাবিলা করাই সরকারের জন্য বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন দলটির নেতারা।

জামায়াতের বক্তব্য ভিন্ন

বিএনপির এই অবস্থানকে অবশ্য ভিন্নভাবে দেখছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য ও সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ প্রথম আলোকে বলেন, বিরোধী দলের কর্মসূচিকে গুরুত্ব না দিলে সংসদে তার প্রতিক্রিয়া দেখানো হতো না।

তিনি দাবি করেন, বিএনপির পাল্টা কর্মসূচি দেওয়ার সক্ষমতা নেই এবং বিরোধী রাজনীতিতে থাকার সময় দলটির যে নৈতিক অবস্থান ছিল, ক্ষমতায় এসে সেটিও বদলে গেছে।

জামায়াতের এই বক্তব্যের পটভূমিতে রয়েছে তাদের নেতৃত্বে ১১–দলীয় জোটের ধারাবাহিক রাজপথের কর্মসূচি। জোটের নেতারা বলছেন, এসব কর্মসূচির লক্ষ্য শুধু রাজনৈতিক সমাবেশ করা নয়; বরং জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংকটসহ জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যার সমাধানে সরকারকে চাপ দেওয়া।

চট্টগ্রাম লংমার্চে কড়া বক্তব্য

গত ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে লংমার্চের বিভিন্ন পথসভায় সরকারকে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন বিরোধী দলের নেতারা।

জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান বিভিন্ন পথসভায় দেশের বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি পরিস্থিতির সমালোচনা করেন। একই সঙ্গে দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।

ফেনীর মহিপালের পথসভায় তিনি সরকারের বিরুদ্ধে আরও সরাসরি বক্তব্য দেন। তাঁর অভিযোগ, সরকার জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা শুরু করেছে। তিনি বলেন, তাঁরা কারও চোখ রাঙানি সহ্য করবেন না এবং কোথাও বাধার মুখে পড়লে প্রতিরোধ গড়ে তুলবেন।

এর পর থেকেই বিএনপির নেতাদের বক্তব্যে বিরোধী দলের এসব কর্মসূচির উদ্দেশ্য ও কার্যকারিতার বিষয়টি উঠে আসছে।

পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে ভাবছে না বিএনপি

বিএনপির উচ্চপর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক কর্মসূচির কারণে এখনই এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলে তাঁরা মনে করছেন না, যার জন্য দলকে পাল্টা কর্মসূচি নিয়ে মাঠে নামতে হবে।

বিরোধীদের কর্মসূচির ওপর নজর রাখা হলেও রাজপথে একই ধরনের কর্মসূচি দিয়ে তার জবাব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা তাঁরা দেখছেন না। দলটির নেতাদের যুক্তি, রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন বিরোধী দলের সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক অধিকারের অংশ। তবে কোনো কর্মসূচিতে জনদুর্ভোগ তৈরি হলে কিংবা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটলে সরকার পরিস্থিতি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেবে।

ফলে আপাতত বিএনপির কৌশল হচ্ছে প্রশাসনিক ও সরকারি কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে জনসমস্যা মোকাবিলা করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী রাজনৈতিক বক্তব্যের মাধ্যমে বিরোধীদের বক্তব্যের জবাব দেওয়া।

দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের নেতাদের বক্তব্য ও সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড থেকে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, বিএনপি বিরোধীদের কর্মসূচিকে এখনই বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছে না। তবে জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীদের ধারাবাহিক আন্দোলন অব্যাহত থাকলে পরিস্থিতি নিয়ে দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনা হতে পারে।

বিরোধীদের মাঠের তৎপরতা

প্রায় দুই দশক বিরোধী রাজনীতিতে থাকার সময় বিএনপির প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার ছিল রাজপথের কর্মসূচি। এখন দলটি সরকারে থাকায় রাজনৈতিক অগ্রাধিকারও বদলেছে। সরকার পরিচালনা, সংসদীয় কার্যক্রম এবং প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি অর্থনীতি ও জনজীবনের সমস্যাগুলো মোকাবিলাই এখন দলের সামনে বড় দায়িত্ব হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বে বিরোধী দলগুলোর ধারাবাহিক মাঠের কর্মসূচি বিএনপির জন্য ভিন্ন ধরনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি তৈরি করছে। জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস ও দ্রব্যমূল্যের মতো বিষয় সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হওয়ায় এসব ইস্যুতে বিরোধীরা নিয়মিত মাঠে থাকলে রাজনৈতিক বিতর্কও অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে।

বিএনপির নেতাদের একটি অংশও মনে করেন, এ ধরনের জনসম্পৃক্ত ইস্যুতে বিরোধীরা দীর্ঘদিন সক্রিয় থাকলে শুধু সংসদীয় বক্তব্যের মাধ্যমে তা মোকাবিলা করা যথেষ্ট নাও হতে পারে। সে ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া পদক্ষেপ এবং সংকটের প্রকৃত কারণ জনগণের কাছে আরও কার্যকরভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন হবে।

সাংগঠনিক তৎপরতাও আলোচনায়

বিরোধী দলগুলো যখন ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে রাজপথে নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে, তখন বিএনপির সাংগঠনিক তৎপরতা তুলনামূলকভাবে সীমিত। স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে থাকলেও মাঠপর্যায়ে দলীয় প্রস্তুতির বড় কোনো কর্মসূচি এখনো দৃশ্যমান নয়।

সম্ভাব্য প্রার্থীদের কেউ কেউ নিজেদের উদ্যোগে এলাকায় সক্রিয় রয়েছেন। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে দলীয় কর্মসূচির মাধ্যমে সারা দেশে সংগঠনকে সক্রিয় করার মতো বড় কোনো তৎপরতা এখনো দেখা যাচ্ছে না।

ক্ষমতায় আসার পর বিএনপির সাংগঠনিক কাঠামো কতটা সক্রিয় রয়েছে, সেই প্রশ্নও দলের ভেতরে ও বাইরে আলোচনায় এসেছে। কেন্দ্রীয় নেতাদের বড় একটি অংশ বর্তমানে মন্ত্রিসভা, সংসদ ও প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনে ব্যস্ত। ফলে মাঠপর্যায়ের সাংগঠনিক কার্যক্রমে দলের আগের মতো মনোযোগ রয়েছে কি না, তা নিয়েও আলোচনা রয়েছে।

সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন থাকায় এই পরিস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। ওই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি মাঠপর্যায়ে কতটা সক্রিয় হয়, সেটিও দলের সাংগঠনিক সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

অন্যদিকে বিরোধী দলগুলো যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, দ্রব্যমূল্যসহ জনসম্পৃক্ত বিভিন্ন ইস্যুতে ধারাবাহিক কর্মসূচি চালিয়ে যায়, তাহলে ক্ষমতাসীন বিএনপির রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতার দিকেও নজর থাকবে। এখন পর্যন্ত দলটির অবস্থান হলো—বিরোধীদের কর্মসূচির পাল্টা কর্মসূচি নয়, বরং সরকার পরিচালনা ও সংশ্লিষ্ট সমস্যার সমাধানের মধ্য দিয়েই এসব পরিস্থিতি মোকাবিলা করা।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স