রয়টার্স
ওয়াশিংটন
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাও—এই তিনটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সংগ্রহ ও কার্যক্রম চালাতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) তিনি এ সিদ্ধান্তের কথা জানান। সংবাদমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে ‘ভুয়া খবর’ প্রকাশের অভিযোগ তুলেছেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের ঘোষণার পর বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা ও প্রেসের প্রবেশাধিকার নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকতার অধিকার নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠন বলছে, কোনো সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত প্রতিবেদনের কারণে তাকে হোয়াইট হাউসের প্রেস কার্যক্রম থেকে বাদ দেওয়া হলে তা যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে সুরক্ষিত সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
‘ভুয়া খবর’ প্রচারের অভিযোগ ট্রাম্পের
ট্রাম্প শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনটি সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানান। তিনি অভিযোগ করেন, তাঁকে নিয়ে প্রতিবেদন করার সময় এসব সংবাদমাধ্যম নিয়মিত ‘মিথ্যা’ ও ‘মনগড়া’ তথ্য প্রকাশ করে।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দিয়েছেন, ভবিষ্যতে আরও সংবাদমাধ্যমকে একই ধরনের নিষেধাজ্ঞার আওতায় আনা হতে পারে। তিনি হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট ও দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের নামও উল্লেখ করেন এবং এসব সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ভবিষ্যতে ব্যবস্থা নেওয়ার সম্ভাবনার কথা জানান।
হোয়াইট হাউসকে ‘জনগণের বাড়ি’ হিসেবে উল্লেখ করে ট্রাম্প বলেন, সেখানে কোনো সংবাদমাধ্যমকে প্রবেশের সুযোগ দিতেই হবে—এমন বাধ্যবাধকতা নেই।
ওভাল অফিসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প জানান, কোনো একটি নির্দিষ্ট প্রতিবেদনের কারণে তিনি সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেননি। বরং কয়েক বছর ধরে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনের সামগ্রিক বিষয় বিবেচনা করেই সিদ্ধান্তটি নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
ট্রাম্পের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি সংবাদমাধ্যমগুলোর প্রতিবেদনের ধরন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অসন্তুষ্ট। সিএনএনের এক সম্প্রচারিত প্রতিবেদনে তাঁর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তিনি এসব সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসে দেখতে চান না এবং তাদের প্রতিবেদনের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন।
আইনি চ্যালেঞ্জের আশঙ্কা
ট্রাম্পের এই সিদ্ধান্তের আইনি বৈধতা নিয়ে ইতিমধ্যে প্রশ্ন উঠেছে। যুক্তরাষ্ট্রের সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার সুরক্ষা রয়েছে। এ কারণে কোনো সংবাদমাধ্যমের সম্পাদকীয় অবস্থান বা সরকারের সমালোচনামূলক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে হোয়াইট হাউসের প্রেস কার্যক্রম থেকে তাদের বাদ দেওয়া যায় কি না, তা নিয়ে আইনি বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির নাইট ফার্স্ট অ্যামেন্ডমেন্ট ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক জামেল জেফার বলেছেন, কোনো সাংবাদিক বা সংবাদমাধ্যমের দৃষ্টিভঙ্গি পছন্দ না হওয়ার কারণে তাদের প্রেস পুল থেকে বাদ দেওয়া প্রথম সংশোধনীর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল প্রথম সংশোধনীর আওতায় একটি ‘পাবলিক ফোরাম’ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
নাইট ইনস্টিটিউটের বক্তব্য অনুযায়ী, সরকার সাংবাদিকদের সম্পাদকীয় অবস্থান বা প্রতিবেদন পছন্দ না হওয়ার কারণে তাদের সরকারি প্রেস কার্যক্রমে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত করতে পারে না। প্রতিষ্ঠানটি ট্রাম্পের এবারের পদক্ষেপকে সরাসরি অসাংবিধানিক বলে উল্লেখ করেছে।
এর আগেও হোয়াইট হাউসের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিরোধ
হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে সংবাদমাধ্যমের বিরোধ অবশ্য নতুন নয়। ২০২৫ সালে অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) সাংবাদিকদের হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। এপি মেক্সিকো উপসাগরকে ঐতিহাসিক নামেই উল্লেখ করার সিদ্ধান্ত বজায় রাখার পর তাদের প্রবেশাধিকার সীমিত করা হয় বলে নাইট ইনস্টিটিউট জানিয়েছে।
ওই ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটি যুক্তি দিয়েছিল, সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এপিকে প্রেস পুল থেকে বাদ দেওয়া প্রথম সংশোধনীর অধীনে বেআইনি ‘ভিউপয়েন্ট-বেসড’ নিষেধাজ্ঞা। ২০২৫ সালের এ মামলায় ডিস্ট্রিক্ট কোর্ট প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করে এপির পক্ষে যায়; পরে সরকার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল করে।
নাইট ইনস্টিটিউটের মতে, হোয়াইট হাউসের প্রেস পুল সাংবাদিকদের প্রেসিডেন্টকে সরাসরি প্রশ্ন করার এবং সরকারি কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের সুযোগ দেয়। এ কারণে এটি শুধু প্রশাসনের দেওয়া সুবিধা নয়, বরং জনসাধারণের কাছে সরকারি কর্মকাণ্ডের তথ্য পৌঁছানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবস্থা।
নিষেধাজ্ঞার পরও হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকেরা
ট্রাম্প নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা দেওয়ার পরও শুক্রবার বিকেলে সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওয়ের প্রতিনিধিদের হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করতে দেখা গেছে। এর অর্থ, ঘোষণার পরপরই নিষেধাজ্ঞাটি কীভাবে এবং কতটা কার্যকর করা হবে, তা নিয়ে বাস্তব পরিস্থিতি তখনও পুরোপুরি স্পষ্ট ছিল না।
সিএনএন এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, হোয়াইট হাউস থেকে সংবাদ সংগ্রহ করা তাদের সাংবাদিকদের পাশে রয়েছে তারা। সংবাদমাধ্যমটি বলেছে, সরকারের বাধা বা হস্তক্ষেপ ছাড়া সংবাদ সংগ্রহের অধিকার মার্কিন সংবিধানে সুরক্ষিত।
সিএনএনের ভাষ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসন যদি ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করে, তাহলে সেটি সংবাদ সংগ্রহের সাংবিধানিক অধিকারের ওপর বেআইনি হস্তক্ষেপ হবে।
পলিটিকোর প্রতিক্রিয়া
পলিটিকোও জানিয়েছে, তারা তাদের সাংবাদিকতার কাজ অব্যাহত রাখবে এবং সংবিধানের প্রথম সংশোধনীতে সুরক্ষিত অধিকার রক্ষায় আইনি ও অন্যান্য উপায়ে লড়াই করবে।
সংবাদমাধ্যমটি বর্তমান প্রশাসন এবং ভবিষ্যতের যেকোনো মার্কিন প্রশাসন সম্পর্কে একই ধরনের সাংবাদিকতার মান বজায় রাখার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে।
অন্যদিকে, ট্রাম্পের ঘোষণার পর এমএস নাও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া জানায়নি।
সংবাদমাধ্যমের ওপর ট্রাম্পের চাপ নিয়ে নতুন বিতর্ক
ট্রাম্পের দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউস ও বড় সংবাদমাধ্যমগুলোর মধ্যে সম্পর্ক নিয়ে এর আগেও একাধিক বিরোধ তৈরি হয়েছে। প্রেস পুলে প্রবেশাধিকার, সাংবাদিকদের সরকারি ব্রিফিংয়ে অংশগ্রহণ এবং প্রশাসনের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নিয়ে সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে হোয়াইট হাউসের ভূমিকা নিয়ে আইনি প্রশ্ন উঠেছে।
এবার সিএনএন, পলিটিকো ও এমএস নাওকে একসঙ্গে নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা সেই বিতর্ককে আরও সামনে এনেছে। বিশেষ করে ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, আরও সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। ফলে হোয়াইট হাউসের প্রেস কার্যক্রমে সংবাদমাধ্যমের প্রবেশাধিকার নিয়ে ভবিষ্যতে আরও আইনি ও রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তবে ঘোষিত নিষেধাজ্ঞার সুনির্দিষ্ট আইনি পরিধি, এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে এবং আদালতে চ্যালেঞ্জ হলে তার পরিণতি কী হবে—এসব বিষয় এখনো নির্ধারিত নয়। এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যম ও প্রেস-স্বাধীনতা নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলোর বক্তব্য ইতিমধ্যে প্রকাশ্যে এসেছে, আর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের ওপরই নিষেধাজ্ঞাটির বাস্তব প্রভাব অনেকটা নির্ভর করবে।