ঢাকা

মহাসচিব কে হবেন, তৃতীয় দফা ভোটেও ঐকমত্যে পৌঁছাতে পারেনি জাতিসংঘ

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
এএফপি

জাতিসংঘের বার্ষিক সাধারণ অধিবেশনকে সামনে রেখে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের নেতারা নিউইয়র্কে জড়ো হচ্ছেন। এরই মধ্যে শুরু হয়েছে জাতিসংঘের পরবর্তী মহাসচিব নির্বাচনের প্রক্রিয়া। তবে তৃতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটির পরও কে সংস্থাটির পরবর্তী মহাসচিব হতে যাচ্ছেন, তা স্পষ্ট হয়নি।

গতকাল শুক্রবার নতুন মহাসচিব বাছাইয়ে তৃতীয় দফায় গোপন ভোটাভুটি করেছে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ। এক ঘণ্টার বেশি সময় ধরে চলা এই ভোটে কোনো প্রার্থীই স্পষ্ট ব্যবধানে এগিয়ে যেতে পারেননি বলে কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে।

নিরাপত্তা পরিষদের এই ভোটাভুটির আনুষ্ঠানিক ফল প্রকাশ করা হয়নি। বৈঠক শেষে পরিষদের বর্তমান সভাপতি এবং জাতিসংঘে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জেরোম বোনাফন্ট শুধু জানান, তৃতীয় দফার ‘খসড়া ভোটাভুটি’ সম্পন্ন হয়েছে।

আট প্রার্থীর লড়াই

বর্তমান মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হওয়ার কথা। তাঁর উত্তরসূরি হতে বর্তমানে আটজন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। এর আগে প্রথম ও দ্বিতীয় দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটেও কোনো প্রার্থী নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের মধ্যে সুস্পষ্ট সমর্থন আদায় করতে পারেননি।

দ্বিতীয় দফার গোপন ভোটে সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন গায়ানার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ক্যারোলিন রদ্রিগেজ-বার্কেট। দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান। আর তৃতীয় অবস্থানে ছিলেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি, যিনি আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক।

মহাসচিব পদের অন্য প্রার্থীরা হলেন সেনেগালের সাবেক প্রেসিডেন্ট ম্যাকি স্যাল, ইকুয়েডরের ইভন এ-বাকি ও মারিয়া ফার্নান্দা এস্পিনোসা, চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাসেলেট এবং উগান্ডার ওলারা ওতুন্নু।

তবে তৃতীয় দফার ভোটের পর প্রার্থীদের অবস্থান সম্পর্কে নিরাপত্তা পরিষদ আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো তথ্য প্রকাশ করেনি।

নারী মহাসচিবের পক্ষে কয়েকটি দেশ

বিভিন্ন সংকটে থাকা জাতিসংঘের নেতৃত্বে এবার একজন নারীকে দেখতে চায় নিরাপত্তা পরিষদের কয়েকটি সদস্যদেশ। তারা ইতিমধ্যে এ বিষয়ে নিজেদের পছন্দের কথা প্রকাশ করেছে।

প্রার্থীদের মধ্যে রদ্রিগেজ-বার্কেট, গ্রিনস্প্যান, এস্পিনোসা ও ব্যাসেলেটসহ কয়েকজন নারী প্রার্থী রয়েছেন। ফলে নির্বাচনের প্রক্রিয়ায় লিঙ্গ-প্রতিনিধিত্বের বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে।

তবে শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থী নিরাপত্তা পরিষদের প্রয়োজনীয় সমর্থন পাবেন, তা নির্ভর করবে সদস্যদেশগুলোর মধ্যে কূটনৈতিক সমঝোতার ওপর।

পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে পাঁচটি দেশ—যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়া—স্থায়ী সদস্য এবং তাদের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। মহাসচিব নির্বাচনের ক্ষেত্রে এই পাঁচ দেশের অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে, শেষ পর্যন্ত এই পাঁচ শক্তিধর দেশের সমঝোতার ভিত্তিতে নতুন কোনো প্রার্থীকে সামনে আনা হতে পারে। তবে এ ধরনের সম্ভাবনা নিয়ে নিরাপত্তা পরিষদের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া হয়নি।

বিষয়টি সংবেদনশীল হওয়ায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কূটনীতিক বলেন, অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় শেষ মুহূর্তে কোনো সমঝোতার প্রার্থীকে সামনে আনা হলে তা বড় ধরনের সংকট তৈরি করতে পারে।

প্রয়োজন অন্তত ৯ ভোট, ভেটো নয়

জাতিসংঘের মহাসচিব হওয়ার প্রক্রিয়ায় প্রথম বড় বাধা নিরাপত্তা পরিষদ। একজন প্রার্থীকে পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত ৯টি ভোট পেতে হবে। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ফ্রান্স ও রাশিয়ার মতো পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কোনো একটি দেশের ভেটোও পাওয়া যাবে না।

বর্তমানে এসব শক্তিধর দেশের মধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ইস্যুতে গভীর মতবিরোধ রয়েছে। ফলে কোনো প্রার্থীকে ঘিরে প্রয়োজনীয় সমঝোতা তৈরি করা এবারের নির্বাচনে গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।

নিরাপত্তা পরিষদে কোনো প্রার্থী প্রয়োজনীয় সমর্থন পেলে তাঁর নাম চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে পাঠানো হবে। সাধারণ পরিষদের অনুমোদনের পরই নতুন মহাসচিব আনুষ্ঠানিকভাবে দায়িত্ব নেবেন।

যুক্তরাষ্ট্রের সংস্কারের বার্তা

নির্দিষ্ট কোনো প্রার্থীকে সমর্থনের কথা না জানিয়ে বৃহস্পতিবার বক্তব্য দিয়েছেন মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের এক কর্মকর্তা। তিনি বলেন, পরবর্তী মহাসচিবকে জাতিসংঘকে তার মূল লক্ষ্য ও দায়িত্বের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়ে প্রকাশ্যে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে।

ওই কর্মকর্তা জাতিসংঘের কার্যকারিতা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমালোচনার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য, ‘অযৌক্তিক, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ এবং তথাকথিত ‘ওক’ বা অতিসচেতন প্রগতিশীল মতাদর্শ সংস্থাটির কার্যকারিতা ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। নতুন মহাসচিবকে এসব বিষয় থেকে সরে এসে বিশ্বশান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষার মূল দায়িত্বে জাতিসংঘকে ফিরিয়ে নিতে হবে।

কীভাবে এগোবে ভোটের প্রক্রিয়া

নিরাপত্তা পরিষদের অনানুষ্ঠানিক ভোটাভুটিতে ১৫ সদস্য গোপন ব্যালটে প্রার্থীদের বিষয়ে নিজেদের অবস্থান জানায়। প্রতিটি ব্যালটে তিনটি বিকল্প থাকে—‘উৎসাহিত করা’, ‘নিরুৎসাহিত করা’ এবং ‘মতামত নেই’।

এ প্রক্রিয়ায় কয়েক দফা ভোটের পর নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের জন্য ভিন্ন রঙের ব্যালট ব্যবহার করা হবে। এর মাধ্যমে বোঝার সুযোগ থাকবে কোনো স্থায়ী সদস্য কোনো প্রার্থীকে ভেটো দিয়েছে কি না। তবে কোন দেশ ভেটো দিয়েছে, তা প্রকাশ করা হবে না।

ঠিক কত দফা অনানুষ্ঠানিক ভোটের পর এই পৃথক ব্যালট ব্যবহৃত হবে, তার নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা নেই। ফলে নির্বাচন প্রক্রিয়া আরও কয়েক দফা ভোটের দিকে গড়াতে পারে।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের বার্ষিক অধিবেশন সামনে রেখে বিশ্বনেতাদের নিউইয়র্কে সমাগমের মধ্যেই মহাসচিব নির্বাচন নিয়ে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ছে। তবে তৃতীয় দফার ভোটের পরও কোনো প্রার্থী স্পষ্টভাবে এগিয়ে না থাকায় গুতেরেসের উত্তরসূরি কে হবেন, সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো অনিশ্চিত।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স