বিএনপি সরকারে এসে জনগণের অধিকার ও মানবাধিকার হরণ করছে এবং গণতন্ত্রকে ধ্বংস করছে—এমন অভিযোগ করেছেন বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, অতীতে যারা গণতন্ত্র ধ্বংস করেছে, তাদের স্থান ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে ঠিক করতে হবে, তিনি কীভাবে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেবেন।
শনিবার সকালে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১১–দলীয় ঐক্যের ঢাকা থেকে রংপুরমুখী লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশে বক্তব্য দেওয়ার সময় নাহিদ ইসলাম এসব কথা বলেন। তাঁর বক্তব্যে সরকারের মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক কর্মকাণ্ডের সমালোচনার পাশাপাশি লংমার্চের দাবিগুলো বাস্তবায়নে আন্দোলন আরও জোরদার করার ইঙ্গিতও উঠে আসে।
‘ক্ষমতা ছাড়ার পথ তাঁকেই ঠিক করতে হবে’
তারেক রহমানকে উদ্দেশ করে নাহিদ ইসলাম বলেন, তিনি হেলিকপ্টারে করে দেশ থেকে পালিয়ে যাবেন, নাকি সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করবেন—সেই সিদ্ধান্ত তাঁকেই নিতে হবে।
তিনি বলেন, ‘এরশাদও সম্মানের সঙ্গে পদত্যাগ করেছিলেন। তারেক রহমানকে তাঁর যাওয়ার রাস্তা নিজেকে বাছাই করে নিতে হবে।’
নাহিদ ইসলামের এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে সরকারবিরোধী আন্দোলনের সম্ভাব্য পরবর্তী ধাপের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সমাবেশে তিনি বলেন, লংমার্চের দাবির সংখ্যা বাড়ছে এবং শেষ পর্যন্ত এসব দাবি এক দফায় গিয়ে ঠেকবে। এ জন্য ১১–দলীয় ঐক্যের নেতা-কর্মীদের প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
মানবাধিকার ও গণতন্ত্র নিয়ে সরকারের সমালোচনা
নাহিদ ইসলাম বলেন, গত ১৬ বছর তাঁরা মানবাধিকার ও গণতন্ত্রের জন্য আন্দোলন করেছেন। বিএনপি তখন তাঁদের সঙ্গে ছিল। কিন্তু বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর জনগণের মানবাধিকার হরণ ও গণতন্ত্র ধ্বংস করছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সরকারের বিভিন্ন আইন ও প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম নিয়েও প্রশ্ন তোলেন এনসিপির আহ্বায়ক। তাঁর অভিযোগ, শেখ হাসিনার সরকার যেসব আইন ও প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনগণের অধিকার হরণ করেছিল, বর্তমান সরকারও সেসব আইন ও প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করা শুরু করেছে।
তিনি বলেন, সরকারের দায়িত্ব ছিল মানবাধিকারের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু বর্তমান সরকার মানবাধিকার হরণের সব ধরনের প্রেক্ষাপট তৈরি করছে।
নাহিদ ইসলাম আরও বলেন, সংসদের সর্বশেষ অধিবেশনে সরকার গুম আইন ও মানবাধিকার আইন পাস করেছে এবং র্যাবের নাম পরিবর্তন করে এসআরবি করেছে। এসব পদক্ষেপের মধ্য দিয়ে সরকারের কর্মকাণ্ড নিয়ে তিনি প্রশ্ন তোলেন।
‘ব্যানার-ফেস্টুন ছিঁড়ে গণজোয়ার ঠেকানো যাবে না’
লংমার্চকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে জনসমাগম ও সমর্থন তৈরি হয়েছে বলে দাবি করেন নাহিদ ইসলাম। একই সঙ্গে কর্মসূচি বাধাগ্রস্ত করার অভিযোগও তোলেন তিনি।
নাহিদ ইসলাম বলেন, লংমার্চের পক্ষে যে ‘গণজোয়ার’ তৈরি হয়েছে, তা প্রতিরোধ করতে শুক্রবার রাত থেকে কর্মসূচির পথে ১১–দলীয় ঐক্যের ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে ফেলা হচ্ছে। এ কাজে বিএনপির নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি সিটি করপোরেশনও যুক্ত হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তবে ব্যানার ও ফেস্টুন ছিঁড়ে লংমার্চের জনসমাগম বন্ধ করা যাবে না বলে মন্তব্য করেন এনসিপির আহ্বায়ক।
তাঁর ভাষায়, লংমার্চের পক্ষে যে জনসমর্থন তৈরি হয়েছে, তা কেবল প্রচারসামগ্রী সরিয়ে থামানো সম্ভব নয়। বরং কর্মসূচিকে আরও বিস্তৃত করার প্রস্তুতি নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।
আট দফা থেকে এক দফার ইঙ্গিত
ঢাকা–রংপুর লংমার্চ ১১–দলীয় ঐক্যের আট দফা দাবিকে সামনে রেখে আয়োজন করা হয়েছে। এসব দাবির মধ্যে রয়েছে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ-তেল-গ্যাস ও সার সংকটের সমাধান, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি-চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধ এবং তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন।
নাহিদ ইসলাম বলেন, বিরোধী দলগুলোর লংমার্চে দফার সংখ্যা বাড়ছে। তবে শেষ পর্যন্ত সব দফা এক দফায় গিয়ে ঠেকবে। এ জন্য ১১–দলীয় ঐক্যের নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানান তিনি।
এর আগে ৫ সেপ্টেম্বর ঢাকা–চট্টগ্রাম লংমার্চে ছয় দফা দাবি সামনে রেখেছিল ১১–দলীয় ঐক্য। পরবর্তী সময়ে ঢাকা–রংপুর কর্মসূচিতে আরও দুটি দাবি যুক্ত হওয়ায় তা আট দফায় পরিণত হয়।
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউ থেকে রংপুরের পথে
শনিবার সকাল ৭টার দিকে রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ১১–দলীয় ঐক্যের ঢাকা–রংপুর লংমার্চের উদ্বোধনী সমাবেশ শুরু হয়। পরে সেখান থেকে রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চ যাত্রা করে। পথে বিভিন্ন স্থানে পথসভা ও সমাবেশের আয়োজন করা হয়।
সিরাজগঞ্জের হাটিকুমরুলসহ বিভিন্ন স্থানে অনুষ্ঠিত পথসভায় জোটের নেতারা শান্তিপূর্ণ ও গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান।
লংমার্চের সমাপনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয় রাতে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে। সেখানে প্রধান অতিথির বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। তাঁর বক্তব্যেও আট দফা দাবি বাস্তবায়ন এবং আন্দোলন অব্যাহত রাখার কথা উঠে আসে।
উদ্বোধনী সমাবেশে বিভিন্ন দলের নেতারা
মানিক মিয়া অ্যাভিনিউয়ের উদ্বোধনী সমাবেশে নাহিদ ইসলাম ছাড়াও ১১–দলীয় ঐক্যের শরিক দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বক্তব্য দেন।
সমাবেশের সঞ্চালনা করেন জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর উত্তরের সেক্রেটারি রেজাউল করিম এবং ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
বক্তব্য দেন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আমির নূরুল ইসলাম বুলবুল, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য সাইফুল আলম খান (মিলন), এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান মঞ্জু এবং বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম।
এ ছাড়া বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান (ইরান), বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির ভারপ্রাপ্ত আমির আবদুল কাইয়ুম সুবহানী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব জালালুদ্দিন আহমদ, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টির (জাগপা) মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব ফখরুল ইসলাম, এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম এবং ডাকসুর ভিপি মো. আবু সাদিক (সাদিক কায়েম) বক্তব্য দেন।
সমাবেশের সমাপনী বক্তব্য দেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান।
ঢাকা–রংপুর লংমার্চের মধ্য দিয়ে ১১–দলীয় ঐক্য আট দফা দাবিতে তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করার বার্তা দিয়েছে। উদ্বোধনী সমাবেশে নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে দাবিগুলোকে ভবিষ্যতে এক দফার আন্দোলনে রূপ দেওয়ার যে ইঙ্গিত এসেছে, তা কর্মসূচিটির রাজনৈতিক গতিপথ নিয়ে নতুন আলোচনারও জন্ম দিয়েছে।