ভোট এলে রাজনৈতিক নেতারা ‘বেশি ইসলামি’ হয়ে যান মন্তব্য করে আলেমদের নিজস্ব রাজনীতি, গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গড়ে তোলার আহ্বান; অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্বারোপ
ভোট এলে দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা সাধারণ সময়ের তুলনায় বেশি ইসলামি পরিচয় তুলে ধরার চেষ্টা করেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেছেন, দীর্ঘ মেয়াদে আলেমদের নিজস্ব রাজনৈতিক ধারা গড়ে তুলতে হবে, যাতে তাঁরা অন্যের রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হন; বরং নিজেদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সক্রিয় খেলোয়াড় হতে পারেন।
শুক্রবার সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে চলমান ইসলামি বইমেলার মঞ্চে এক অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা আমির আল্লামা শাহ আহমদ শফী ও তাঁর পরবর্তী আমির আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর স্মরণে এনসিপির সহযোগী সংগঠন ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের উদ্যোগে প্রকাশিত পত্রিকা ‘তুরাস’-এর প্রথম সংখ্যা ‘উত্তরাধিকার, পর্ব–১’-এর মোড়ক উন্মোচন উপলক্ষে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, নির্বাচনের সময় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেদের কৃষক ও আলেমদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে তুলে ধরতে চান। তাঁর ভাষায়, ‘ভোট এলে সবাই একটু বেশি কৃষক হয়ে যান, একটু বেশি আলেম হয়ে যান।’ এ ধরনের আচরণের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক দলগুলো একটি বিশেষ বার্তা দেওয়ার চেষ্টা করে বলে মনে করেন তিনি।
তরুণ আলেমদের উদ্দেশে হাসনাত বলেন, ‘দীর্ঘ মেয়াদে আমাদের নিজস্ব রাজনীতি নির্মাণ করতে হবে। আমরা যেন আরেকজনের রাজনীতির ঘুঁটি হিসেবে ব্যবহৃত না হই, আরেকজনের গেমের (খেলা) ঘুঁটি যেন আমরা না হই। বরং আমরা যেন নিজস্ব গেমের প্লেয়ার (খেলোয়াড়) হতে পারি।’
আলেমদের মূলধারার পেশায় অংশগ্রহণের আহ্বান
আলেমদের পেশাগতভাবে বহুমুখী হওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, কওমি মাদ্রাসার সনদের কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের মাধ্যমে রাষ্ট্রের বিভিন্ন মূলধারার পেশায় আলেমদের প্রবেশের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে তাঁরা জাতীয় পর্যায়ে যথাযথ ভূমিকা রাখতে পারেন।
তিনি বলেন, জুলাইয়ের ঘটনাপ্রবাহ আলেমদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি করেছে। সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সেই সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এ ক্ষেত্রে বিভাজিত না হয়ে আলেমদের ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
হাসনাত আবদুল্লাহ আরও বলেন, ২০০৮ সালের নির্বাচনের পরবর্তী সময়ে আলেম-ওলামাদের ওপর রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নির্মম নির্যাতন চালানো হয়েছিল বলে তিনি মনে করেন। তবে এসব ঘটনা নিয়ে উল্লেখযোগ্য একাডেমিক গবেষণা হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি। তাঁর মতে, ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের প্রকাশিত ‘তুরাস’ এ বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার তাগিদ
দেশে অন্য ধর্মাবলম্বীদের নিরাপত্তা নিয়ে রাজনৈতিক বক্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, আওয়ামী লীগ দীর্ঘদিন ধরে এমন একটি বক্তব্য প্রচার করেছে যে দলটি ক্ষমতায় না থাকলে অন্য ধর্মের মানুষেরা নিরাপদ থাকবেন না। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন ধর্মের উপাসনালয় পাহারা দেওয়ার ঘটনাকে সামনে এনে তিনি এ বক্তব্যের বিরোধিতা করেন।
হাসনাত বলেন, ‘আওয়ামী লীগ সব সময় একটা কার্ড খেলত যে তারা যদি না থাকে, তাহলে বাংলাদেশে থাকা অন্য ধর্মাবলম্বীরা অন্যদের কাছে, অর্থাৎ আমাদের কাছে অনিরাপদ। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সারা দেশে অন্য ধর্মের উপাসনালয়গুলো রাত জেগে পাহারা দিয়ে আমাদের আলেম-ওলামা ভাইয়েরা প্রমাণ করে দিয়েছেন আওয়ামী লীগ মিথ্যার ওপর রাজনীতি করেছে।’
দেশের মাদ্রাসাশিক্ষাব্যবস্থা ও আলেম-ওলামাদের উগ্রবাদী, প্রতিক্রিয়াশীল কিংবা বাংলাদেশের জন্য অনিরাপদ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা হচ্ছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি। এ ধরনের ধারণা ভুল প্রমাণ করতে আলেমদের নিজেদের কাজ ও আচরণের মাধ্যমে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানান হাসনাত।
তিনি বলেন, ‘এটা যে মিথ্যা, তা আমাদের কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে। আপনাদের ১ নম্বর দায়িত্ব হচ্ছে, অন্য ধর্মের যাঁরা আছেন, তাঁদের ধর্মীয় আচার-আচরণ, কালচার-কৃষ্টি যেন তাঁরা যথাযথভাবে পালন করতে পারেন, সেদিকে লক্ষ রাখা।’
আসন্ন দুর্গাপূজাসহ অন্যান্য ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক আয়োজনের প্রসঙ্গ উল্লেখ করে হাসনাত বলেন, এসব ক্ষেত্রে আলেমদের দায়িত্বশীল ভূমিকা অব্যাহত রাখতে হবে। অন্য ধর্মের মানুষেরা যেন তাঁদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান ও সংস্কৃতি নির্বিঘ্নে পালন করতে পারেন, তা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
পরমতসহিষ্ণুতা ও নিজস্ব গণমাধ্যম গড়ার পরামর্শ
আলেমদের প্রতি হাসনাত আবদুল্লাহর আরেকটি পরামর্শ হলো, ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার চর্চা নিজেদের কার্যক্রমের মাধ্যমে তুলে ধরা। তাঁর মতে, আলেমরা পরমতসহিষ্ণু নন—এমন অভিযোগের সুযোগ যেন কেউ না পান, সে জন্য মতপার্থক্য থাকলেও আলোচনার পরিবেশ বজায় রাখা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক ও সামাজিক নানা বিষয়ে ভিন্নমতের সঙ্গে বিতর্ক ও আলোচনা হবে। তবে সেই মতপার্থক্য যেন অসহিষ্ণুতা বা সংঘাতের দিকে না যায়, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। এ বিষয়ে নিজেদের আচরণ ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে দৃষ্টান্ত স্থাপনের আহ্বান জানান তিনি।
আলেমদের নিজস্ব গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যম গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তাঁর মতে, নিজেদের ইতিহাস, অভিজ্ঞতা ও চিন্তাভাবনা তুলে ধরতে গবেষণা এবং তথ্যভিত্তিক আলোচনার পরিসর তৈরি করা জরুরি। একই সঙ্গে নিজস্ব গণমাধ্যম থাকলে তাঁদের বক্তব্য ও অবস্থান নিজেরাই তুলে ধরতে পারবেন।
‘তুরাস’-এর প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন
অনুষ্ঠানের বক্তব্য পর্ব শেষে হাসনাত আবদুল্লাহ এবং এনসিপি ও ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের নেতারা ‘তুরাস’-এর প্রথম সংখ্যার মোড়ক উন্মোচন করেন।
অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে বক্তব্য দেন প্রয়াত আল্লামা জুনায়েদ বাবুনগরীর ব্যক্তিগত সহকারী এনামুল হাসান, তাকওয়া চ্যারিটি ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান গাজী ইয়াকুব, হেফাজতে ইসলামের পল্টন জোনের সাধারণ সম্পাদক মুফতি ইমরানুল বারী সিরাজী, প্রথম আলোর ধর্ম বিভাগের জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক মনযূরুল হক, ন্যাশনাল ওলামা অ্যালায়েন্সের আহ্বায়ক আশরাফ উদ্দিন মাহদী এবং সদস্যসচিব সানাউল্লাহ খান।
অনুষ্ঠানে বক্তারা আলেমদের ঐক্য, পেশাগত সক্ষমতা বৃদ্ধি, গবেষণা এবং সমাজে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের বিষয়ে আলোচনা করেন।