ঢাকা

বৈশ্বিক রাজনীতি–৪: বসনিয়ার গণহত্যা অস্বীকারের কৌশল

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং

জেনোসাইড বা গোষ্ঠীনিধনের মতো অপরাধের বিচার, ঐতিহাসিক স্বীকৃতি এবং স্মৃতিরক্ষা আধুনিক সভ্যতার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ। আমাদের ধারাবাহিক এই পর্বে বসনিয়ার প্রেক্ষাপটে জেনোসাইড–পরবর্তী অস্বীকারের বহুমাত্রিক রাজনীতি, তার রাষ্ট্রীয় ও ভূরাজনৈতিক ব্যবহার এবং স্মৃতিরক্ষার লড়াই বিশ্লেষণ করা হলো।


ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: যুদ্ধ, অবরোধ ও স্রেব্রেনিৎসা

আশির দশকের মাঝামাঝি থেকে যুগোস্লাভিয়ার পতন এবং ১৯৯০ সালের নির্বাচনে চরমপন্থী জাতীয়তাবাদের উত্থান বলকান অঞ্চলে রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ভিত্তি তৈরি করে। বহুজাতিক বৈচিত্র্যের দেশ বসনিয়া-হার্জেগোভিনায় ১৯৯২ সালের ৬ এপ্রিল গণভোটের পর স্বাধীনতার ঘোষণা দিলে যুদ্ধ শুরু হয়। বসনিয়ান সার্বরা গণভোট বর্জন করে এবং সার্বিয়ার সহায়তায় রাজধানী সারায়েভো অবরুদ্ধ করে। প্রায় চার বছর ধরে চলা অবরোধে খাদ্যাভাব, গোলাবর্ষণ ও স্নাইপারের গুলিতে প্রায় ১১ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়।

পূর্ব বসনিয়ায় একই সময়ে জাতিগত নিধনের ভয়াবহতা দেখা দেয়। এর চূড়ান্ত রূপ ঘটে ১৯৯৫ সালের জুলাইয়ে, যখন জেনারেল রাতকো ম্লাদিচ–এর নেতৃত্বাধীন বসনিয়ান সার্ব বাহিনী জাতিসংঘ ঘোষিত ‘সেফ হ্যাভেন’ স্রেব্রেনিৎসা দখল করে। নারী ও শিশুদের আলাদা করে ১৬ থেকে ৬০ বছর বয়সী প্রায় ৮ হাজার বসনিয়াক পুরুষ ও বালককে হত্যা করা হয়। গণকবর খুঁড়ে লাশ সরিয়ে ফেলার মাধ্যমে অপরাধের প্রমাণ গোপনের চেষ্টা চলে।

১৯৯৫ সালের ডেইটন শান্তিচুক্তি যুদ্ধের অবসান ঘটালেও দেশকে দুটি সত্তায় বিভক্ত করে: রেপাবলিকা স্রপস্কা এবং বসনিয়াক-ক্রোয়াট ফেডারেশন। যুদ্ধে প্রায় ৯৭ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হন, যাদের বড় অংশই ছিলেন বসনিয়াক।


আন্তর্জাতিক আইনি স্বীকৃতি

২০০১ সালে International Criminal Tribunal for the former Yugoslavia (আইসিটিওয়াই) এবং ২০০৭ সালে International Court of Justice (আইসিজে) স্রেব্রেনিৎসার হত্যাযজ্ঞকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। আইসিজে সার্বিয়াকে সরাসরি জেনোসাইডের নির্দেশদাতা না বললেও প্রতিরোধে ব্যর্থতার জন্য দায়ী করে।

এই স্বীকৃতি বসনিয়াকদের কাছে নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে—তারা যুক্তি দেয়, জেনোসাইডের শিকার জনগোষ্ঠী হিসেবে রাষ্ট্র কাঠামোতে তাদের অধিকতর নিয়ন্ত্রণ থাকা উচিত। তাদের মতে, ডেইটন চুক্তি স্রেব্রেনিৎসাকে সার্ব রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রেখে অন্যায় করেছে।


রেপাবলিকা স্রপস্কায় অস্বীকারের রাজনীতি

রেপাবলিকা স্রপস্কায় জেনোসাইড অস্বীকার রাষ্ট্রীয় কৌশলের অংশ। ২০০২ সালের এক প্রতিবেদনে সেখানে নিহতের সংখ্যা দুই হাজার বলে দাবি করা হয় এবং বলা হয়, সবাই সৈন্য ছিল। আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০০৪ সালে কমিশন সাত হাজারের বেশি নিহত স্বীকার করলেও ২০১৮ সালে সেই প্রতিবেদন বাতিল করা হয়।

এই অস্বীকারের প্রধান মুখ মিলোরাদ দোদিক। তিনি স্রেব্রেনিৎসাকে “বানোয়াট মিথ” বলে আখ্যা দেন। স্কুলপাঠ্যবইয়ে জেনোসাইডের উল্লেখ নেই; দণ্ডিত যুদ্ধাপরাধী রাদোভান কারাদজিক ও রাতকো ম্লাদিচকে বীরের মর্যাদা দেওয়া হয়। লক্ষ্য—নিজেদের ভাবমূর্তি পরিষ্কার রেখে ভবিষ্যতে বিচ্ছিন্নতার যৌক্তিকতা তৈরি।


সার্বিয়ায় ব্যাখ্যামূলক অস্বীকার

সার্বিয়া আনুষ্ঠানিকভাবে ‘জেনোসাইড’ শব্দ এড়িয়ে চলে। ২০১০ সালে পার্লামেন্ট দুঃখপ্রকাশ করলেও জেনোসাইড শব্দ ব্যবহার করেনি। সাবেক প্রেসিডেন্ট তোমিস্লাভ নিকোলিচ এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী আনা ব্রনাবিচ প্রকাশ্যে জেনোসাইড অস্বীকার করেছেন।

সার্বিয়া ‘অপারেশন স্টর্ম’–এ সার্বদের ভুক্তভোগিতা তুলে ধরে ‘অপরাধের সমতা’ আখ্যান গড়ে তোলে। এতে রাষ্ট্রীয় সম্পৃক্ততাকে ‘কয়েকজন বিপথগামী ব্যক্তির অপরাধ’ হিসেবে দেখানো হয়।


বৈশ্বিক মাত্রা: ভূরাজনীতি ও মতাদর্শ

২০১৫ সালে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে স্রেব্রেনিৎসাকে জেনোসাইড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার প্রস্তাবে রাশিয়া ভেটো দেয়। প্যান-স্লাভিক ঐক্যের দোহাই দিয়ে সার্বিয়ার পক্ষে অবস্থান নেয়।

পশ্চিমেও দ্বৈত প্রবণতা দেখা যায়। চরম ডানপন্থীরা যুদ্ধাপরাধীদের ‘খ্রিষ্টান ইউরোপের রক্ষক’ হিসেবে তুলে ধরে। আবার সাম্রাজ্যবাদবিরোধী কিছু বুদ্ধিজীবী ন্যাটো হস্তক্ষেপের বিরোধিতা করতে গিয়ে নিহতের সংখ্যা ও আইনি সংজ্ঞা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন।

২০১৯ সালে অস্ট্রিয়ান লেখক পিটার হ্যান্ডকে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পর বিতর্ক তীব্র হয়; তিনি প্রকাশ্যে স্রেব্রেনিৎসা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন।


স্মৃতিরক্ষা বনাম বিকৃতি

বসনিয়ান পরিচালক ইয়াসমিলা জাবানিচ–এর চলচ্চিত্র Quo Vadis, Aida? এবং ড্যানিস তানোভিচ–এর No Man's Land জেনোসাইডের সত্য তুলে ধরেছে। সাংবাদিক জো সাকো–র গ্রাফিক নভেল Safe Area Goražde অবরুদ্ধ মানুষের কণ্ঠকে বিশ্বে পৌঁছে দেয়।

ফরেনসিক ডিএনএ প্রমাণ হাজারো গণকবর শনাক্ত করে অস্বীকারের মিথ ভেঙেছে। স্মৃতিস্তম্ভ, গবেষণা ও শিল্প—সব মিলিয়ে সত্য রক্ষার সংগ্রাম চলমান।

বসনিয়ার জেনোসাইড অস্বীকার কেবল অতীত বিকৃতি নয়; এটি ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রকাঠামো ও রাজনৈতিক বৈধতা নির্মাণের হাতিয়ার। সার্ব নেতারা অস্বীকারের মাধ্যমে বিচ্ছিন্নতার স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন, বসনিয়াক নেতারা জেনোসাইডের স্বীকৃতি দিয়ে সাংবিধানিক পুনর্গঠনের দাবি জোরদার করেন। ফলে অস্বীকার ও স্বীকৃতির এই দ্বন্দ্ব বলকান অঞ্চলে এখনো অমীমাংসিত রাজনৈতিক বাস্তবতা।

ইতিহাসের এই লড়াই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—জেনোসাইড অস্বীকার কেবল নৈতিক প্রশ্ন নয়, এটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা, ভূরাজনীতি ও পরিচয়ের রাজনীতির গভীরতম স্তরে প্রোথিত এক দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত।


নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স