ঢাকা

ছাত্রশিবিরের সেমিনার: বিএনপির বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে ‘জুলাই সনদ’ বিতর্কিত হতে পারে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে বিতর্কের মধ্যেই রাজধানীর জাতীয় প্রেস ক্লাব–এ সেমিনার করেছে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির। বৃহস্পতিবার দুপুরে আয়োজিত ‘গণভোটের আলোকে জনরায় বাস্তবায়নে গড়িমসি: সরকারের দায় ও জবাবদিহিতা’ শীর্ষক এ সেমিনারে বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করছে এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) গণভোটের আদেশ মানতে অনাগ্রহী অবস্থান নিয়েছে।

বক্তাদের মতে, বিএনপি যেভাবে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করতে চায়, তা অনুসরণ করলে সনদের গ্রহণযোগ্যতা এবং সরকারের এখতিয়ার—উভয় বিষয়েই নতুন করে প্রশ্ন উঠতে পারে।

‘গণভোটের প্রস্তাব বিএনপির, এখন তারাই অস্বীকার করছে’

সেমিনারে বক্তব্য দেন শিশির মনির, যিনি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী–এর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদের সদস্য। তিনি বলেন, সম্প্রতি অনুষ্ঠিত গণভোটের প্রস্তাবকারী ছিল বিএনপি নিজেই। ঐকমত্য কমিশনের এক বৈঠকে জুলাই সনদের বাস্তবায়নপদ্ধতি নিয়ে অচলাবস্থা তৈরি হলে বিএনপি নেতাদের পক্ষ থেকেই গণভোট আয়োজনের প্রস্তাব আসে। অন্য দলগুলো পরে তাতে সম্মতি দেয়।

“এখন সেই প্রস্তাবকারী দল বলছে, তারা গণভোটের আদেশ মানতে বাধ্য নয়—এটা রাজনৈতিকভাবে পরস্পরবিরোধী অবস্থান,” মন্তব্য করেন তিনি।

গুম প্রতিরোধ অধ্যাদেশ নিয়ে সমালোচনা

সরকারের গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার অধ্যাদেশ বাতিলের প্রস্তাবেরও সমালোচনা করেন শিশির মনির। তাঁর দাবি, নিরাপত্তা সংস্থার আপত্তির বাইরে এ ধরনের অধ্যাদেশ বাতিলের যৌক্তিকতা স্পষ্ট নয়। তিনি গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

তাঁর ভাষ্য, “সরকার গণভোটের অর্থ বোঝে, কিন্তু বাস্তবায়নে অনীহা দেখাচ্ছে। হয়তো এমন কোনো দায়বদ্ধতা রয়েছে, যা জনগণের ৭০ শতাংশ মতামতের চেয়েও তাদের কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।”

‘সংবিধান শুধু সংশোধন নয়, সংস্কারও প্রয়োজন’

পাবনা–১ আসনের সংসদ সদস্য নাজিবুর রহমান মোমেন বলেন, জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি একটি পরিকল্পিত প্রক্রিয়ার অংশ। তাঁর মতে, সংবিধান কেবল সংশোধন করলেই হবে না; প্রয়োজন সামগ্রিক সংস্কার।

তিনি অভিযোগ করেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ–বিপক্ষের বিভাজনের মতো এখন সংবিধানের পক্ষ–বিপক্ষের শক্তি তৈরি করে দেশকে আবার বিভক্ত করার পাঁয়তারা চলছে।”

নাজিবুর রহমানের মতে, বিএনপির প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করা হলে সনদ আরও প্রশ্নবিদ্ধ হবে এবং সরকারের এখতিয়ার নিয়েও বিতর্ক বাড়বে।

‘দলীয় স্বার্থ নয়, জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার’

আলোকচিত্রী শহীদুল আলম বলেন, জুলাই সনদ নিয়ে দ্বিমত থাকতে পারে, যা গণতান্ত্রিক বাস্তবতায় স্বাভাবিক। তবে দলীয় আধিপত্যের ভিত্তিতে সবকিছু চাপিয়ে দেওয়া হলে সংসদীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয়তাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তিনি দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে জনস্বার্থে ঐকমত্য গঠনের আহ্বান জানান।

‘সরকার যদি জুলাইয়ের বিরুদ্ধে যায়, রাজপথে নামতে হবে’

জাতীয় নাগরিক পার্টি–এর যুগ্ম আহ্বায়ক জাবেদ রাসিন বলেন, সরকার জুলাই সনদের পক্ষে থাকলে তাদের সহযোগিতা করা হবে; আর বিপক্ষে গেলে অসহযোগিতা করা হবে। “সে ক্ষেত্রে রাজপথ ছাড়া বিকল্প থাকবে না,” মন্তব্য করেন তিনি।

এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক আসাদুজ্জামান ফুয়াদ ১৯৭২ সালের সংবিধান প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর বক্তব্য, জনগণের প্রত্যক্ষ ম্যান্ডেট ছাড়া কোনো সংবিধান টেকসই হতে পারে না।

মূল প্রবন্ধে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠনের প্রস্তাব

ছাত্রশিবির সভাপতি নুরুল ইসলাম সাদ্দাম তাঁর উপস্থাপিত মূল প্রবন্ধে বলেন, গণভোট রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে একটি নতুন সামাজিক চুক্তি। নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের দ্বিতীয় শপথ নিয়ে ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ গঠন করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধন করতে হবে।

সেমিনারে স্বাগত বক্তব্য দেন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক সিবগাতুল্লাহ। তিনি অভিযোগ করেন, গণভোটে জনগণের মতামত উপেক্ষা করে সরকার ভিন্ন পথে হাঁটছে।

অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ছাত্রশিবিরের প্রচার সম্পাদক ও ডাকসুর জিএস এস এম ফরহাদ। এছাড়া বক্তব্য দেন ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক, জকসুর ভিপি রিয়াজুল ইসলাম, জাকসুর জিএস মাজহারুল ইসলাম এবং জাতীয় ছাত্রশক্তির সভাপতি জাহিদ আহসান।

জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সাত দফা দাবি

সেমিনার থেকে জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সাত দফা দাবি উত্থাপন করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে—

কোনো কাটছাঁট ছাড়া অবিলম্বে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন
রাজনৈতিক দলগুলোর ‘নোট অব ডিসেন্ট’ আইনিভাবে অকার্যকর ঘোষণা
নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের ‘সংবিধান সংস্কার পরিষদ’ সদস্য হিসেবে শপথ ও ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন
গণভোটে পাস হওয়া প্রস্তাব বাতিল বা পরিবর্তনের অপচেষ্টা বন্ধ
সংস্কার প্রক্রিয়ায় পূর্ণ স্বচ্ছতা নিশ্চিত
নির্বাচন কমিশন, দুদক, পিএসসি ও মহাহিসাব নিরীক্ষকসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিত
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন না হলে গণভোটের রায়ের ভিত্তিতে স্বয়ংক্রিয় বাস্তবায়নের আইনি ব্যবস্থা সক্রিয় করা

সেমিনারে বক্তারা দ্রুত সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করে জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স