বিশ্বজুড়ে গবাদিপশুর খামারে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার আগামী ১৫ বছরে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বৃদ্ধি পেতে পারে। সরকার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে এর প্রভাব শুধু প্রাণিসম্পদ খাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং মানুষের চিকিৎসাব্যবস্থার জন্যও বড় ধরনের হুমকি হয়ে উঠতে পারে। নতুন এক বৈশ্বিক গবেষণায় এমন সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (FAO)–এর প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গবাদিপশু পালনে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের অতিরিক্ত ব্যবহার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (এএমআর) বা ওষুধ-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তারকে ত্বরান্বিত করছে। এর ফলে এমন এক পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, যেখানে বহু সংক্রমণের বিরুদ্ধে প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিক আর কার্যকর থাকবে না।
অ্যান্টিবায়োটিক কেন এত বেশি ব্যবহার করা হয়?
বিশ্বব্যাপী ব্যবহৃত অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধের প্রায় ৭৫ শতাংশই গবাদিপশু খাতে ব্যবহৃত হয়। অনেক দেশে এ ব্যবহারের ওপর পর্যাপ্ত নজরদারি নেই। ফলে খামারগুলোতে রোগ প্রতিরোধ, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ এবং অনেক ক্ষেত্রে পশুর দ্রুত বৃদ্ধি নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগ করা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পশুর স্বাভাবিক বৃদ্ধির পরিবর্তে উৎপাদন বাড়াতে ও দ্রুত বাজারজাত করার জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের প্রবণতা দীর্ঘদিন ধরে জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে আছে।
মানুষের দেহে কী প্রভাব পড়তে পারে?
গবেষকদের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হলো অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স বা এএমআর। যখন কোনো জীবাণু বারবার অ্যান্টিবায়োটিকের সংস্পর্শে আসে, তখন ধীরে ধীরে সেটি ওষুধের বিরুদ্ধে প্রতিরোধক্ষমতা অর্জন করে। ফলে একসময় সেই জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রচলিত ওষুধ আর কাজ করে না।
বিশেষজ্ঞদের ভাষায়, এর ফলে ‘সুপারবাগ’ নামে পরিচিত এমন সব জীবাণুর বিস্তার ঘটে, যেগুলোকে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন। এর প্রভাব শুধু সংক্রামক রোগেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অস্ত্রোপচার, ক্যানসারের চিকিৎসা, অঙ্গ প্রতিস্থাপনসহ আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থার অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশ ঝুঁকির মুখে পড়ে।
গবেষকরা সতর্ক করে বলেছেন, যদি এ প্রবণতা অব্যাহত থাকে, তাহলে ভবিষ্যতে সাধারণ সংক্রমণও প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। এমনকি বর্তমানে নিয়মিতভাবে করা হিপ রিপ্লেসমেন্ট বা অন্যান্য অস্ত্রোপচারও উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়বে।
অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণও বিশাল
এএমআরের প্রভাব শুধু স্বাস্থ্যখাতেই নয়, অর্থনীতিতেও পড়ছে। গবেষণা অনুযায়ী, বর্তমানে শুধু ইউরোপেই অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্সের কারণে বছরে প্রায় ১ হাজার ১০০ কোটি ইউরো ক্ষতি হচ্ছে।
বিশ্বব্যাপী এই ক্ষতির পরিমাণ ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। উৎপাদনশীলতা হ্রাস, চিকিৎসা ব্যয় বৃদ্ধি এবং খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ বৃদ্ধির কারণে এই ক্ষতি আরও বাড়তে পারে।
২০৪০ সালে ব্যবহার পৌঁছাতে পারে রেকর্ড পর্যায়ে
এফএওর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে ২০৪০ সালের মধ্যে গবাদিপশু খাতে বছরে ১ লাখ ৪৩ হাজার টনের বেশি অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল ওষুধ ব্যবহার করা হবে। এটি ২০১৯ সালের তুলনায় প্রায় ৩০ শতাংশ বেশি।
এমনকি এই পরিমাণ ২০১৩ সালের সর্বোচ্চ ব্যবহারের রেকর্ডকেও ছাড়িয়ে যাবে। যদিও গত এক দশকে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারে কিছুটা নিয়ন্ত্রণ আনা সম্ভব হয়েছিল, কিন্তু মাংসের বৈশ্বিক চাহিদা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন দেশে আইনের শিথিল প্রয়োগ সেই অগ্রগতিকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
সমাধান কী?
গবেষকদের মতে, পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়নি। খামার ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, পশুর স্বাস্থ্যসেবা জোরদার করা এবং রোগ প্রতিরোধে কার্যকর পদ্ধতি অনুসরণ করলে অ্যান্টিবায়োটিকের ওপর নির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
Alliance to Save Our Antibiotics–এর প্রতিনিধি কোইলিন নুনান বলেন, পশুর বৃদ্ধির জন্য অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার সবচেয়ে ক্ষতিকর অপব্যবহারগুলোর একটি। তাঁর মতে, স্বাস্থ্যসম্মত ও কম ঘনত্বের খামারব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলে অ্যান্টিবায়োটিকের প্রয়োজন স্বাভাবিকভাবেই কমে আসবে।
তিনি সতর্ক করে বলেন, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণুর বিস্তার শুধু চিকিৎসা সংকট তৈরি করবে না, বরং খাদ্য উৎপাদন কমিয়ে খাদ্যের দামও বাড়িয়ে দিতে পারে।
কঠোর হচ্ছে আন্তর্জাতিক নীতিমালা
ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং যুক্তরাজ্য ২০০৬ সাল থেকেই পশুর বৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। তবে আমদানিকৃত কিছু পণ্যের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল।
এখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন আরও কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে। আগামী সেপ্টেম্বর থেকে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করে উৎপাদিত মাংস, দুগ্ধজাত পণ্য ও ডিম আমদানির ওপর পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের পদক্ষেপ অন্যান্য দেশকেও তাদের মানদণ্ড উন্নত করতে উৎসাহিত করবে। ইতোমধ্যে ব্রাজিল–সহ কয়েকটি দেশ অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারের নিয়ম আরও কঠোর করার উদ্যোগ নিয়েছে।
অ্যান্টিবায়োটিককে ‘বৈশ্বিক জনসম্পদ’ হিসেবে দেখার আহ্বান
এফএওর গবেষকরা মনে করেন, অ্যান্টিবায়োটিকের কার্যকারিতা একটি বৈশ্বিক জনসম্পদ। তাই এই ওষুধের অপব্যবহার রোধে সরকার, খামারমালিক, খাদ্য উৎপাদক এবং আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এখনই কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়া হলে আগামী কয়েক দশকে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী জীবাণু মানবস্বাস্থ্যের জন্য অন্যতম বড় বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হতে পারে। আর সেই সংকট মোকাবিলার ব্যয় ও ক্ষতি আজকের প্রতিরোধমূলক পদক্ষেপের তুলনায় বহুগুণ বেশি হবে।