ঢাকা

কূটনৈতিক আলোচনায় স্থবিরতা, যুক্তরাষ্ট্র–ইরান নতুন করে যুদ্ধের ইঙ্গিত

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের চলমান যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে যুদ্ধের শঙ্কা তীব্র আকার ধারণ করেছে। গত সোমবার দুই দেশই একে অপরকে কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যার ফলে শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এ পরিস্থিতিতে পাকিস্তানের ইসলামাবাদে প্রস্তাবিত দ্বিতীয় দফা শান্তি আলোচনা কার্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

এএফপির প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প জানিয়েছিলেন, ইসলামাবাদে নতুন করে শান্তি আলোচনা শুরু হবে এবং সেখানে উচ্চপর্যায়ের মার্কিন প্রতিনিধিদল অংশ নেবে, যার নেতৃত্বে থাকবেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তবে ইরানের পক্ষ থেকে এখনো এই আলোচনায় অংশগ্রহণের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।

যুদ্ধবিরতির শেষ মুহূর্তে উত্তেজনা বৃদ্ধি

বর্তমান যুদ্ধবিরতির সময়সীমা শেষ হওয়ার প্রাক্কালে উভয় পক্ষের পাল্টাপাল্টি অভিযোগ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। ইসলামাবাদে দ্বিতীয় দফা আলোচনা শুরুর প্রস্তুতি চললেও ইরানের অনীহা এবং যুক্তরাষ্ট্রের কঠোর অবস্থান পুরো প্রক্রিয়াকে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিয়েছে।

বিশ্ববাজারেও এই উত্তেজনার প্রভাব পড়েছে। বিশেষ করে জ্বালানি তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, কারণ হরমুজ প্রণালির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।

ইরানের অভিযোগ ও পাল্টা অবস্থান

তেহরান অভিযোগ করেছে, যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে। তাদের দাবি, ইরানি বন্দরে অবরোধ আরোপ এবং জাহাজ জব্দের মাধ্যমে ওয়াশিংটন শান্তি প্রক্রিয়াকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।

ইরানের পার্লামেন্ট স্পিকার মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্র আলোচনাকে “আত্মসমর্পণের প্ল্যাটফর্মে” পরিণত করতে চাইছে এবং পরিস্থিতিকে নিজের সুবিধামতো ব্যবহার করছে।

তিনি আরও দাবি করেন, ইরান “হুমকির মধ্যে কোনো আলোচনায় বসবে না” এবং দেশটি সম্ভাব্য নতুন সংঘাতের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা

ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) সতর্ক করে দিয়েছে, অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি দিয়ে কোনো জাহাজ চলাচল করলে সেটিকে লক্ষ্যবস্তু করা হবে।

অন্যদিকে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প অভিযোগ করেছেন, ইরান এই গুরুত্বপূর্ণ জলপথে জাহাজ চলাচলে বাধা দিয়ে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করছে।

বিশ্বের মোট তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ এই হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়, ফলে এখানে কোনো ধরনের উত্তেজনা সরাসরি বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে প্রভাব ফেলে।

ট্রাম্পের কঠোর অবস্থান

ট্রাম্প তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ লিখেছেন, ইরানের ওপর অবরোধ অব্যাহত থাকবে এবং একটি চুক্তি না হওয়া পর্যন্ত তা প্রত্যাহার করা হবে না। তাঁর দাবি, এই চাপ ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য জরুরি।

তিনি আরও বলেন, যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হলে “আবারও বড় পরিসরে হামলা শুরু হতে পারে”।

ব্লুমবার্গকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুদ্ধবিরতির সময়সীমা বাড়ানোর সম্ভাবনা খুবই কম। তার ভাষায়, বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক এবং যেকোনো সময় সংঘাত পুনরায় শুরু হতে পারে।

যুদ্ধবিরতির সময়সীমা নিয়ে বিভ্রান্তি

যুদ্ধবিরতির মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে অসঙ্গতি দেখা দিয়েছে। ইরানের স্থানীয় সময় অনুযায়ী যুদ্ধবিরতি মঙ্গলবার মধ্যরাতে শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ট্রাম্প দাবি করেছেন, এটি ওয়াশিংটন সময় অনুযায়ী বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।

এই ভিন্ন ব্যাখ্যা কূটনৈতিক জটিলতাকে আরও বাড়িয়ে তুলেছে।

তেলের বাজারে অস্থিরতা ও অর্থনৈতিক প্রভাব

হরমুজ প্রণালি নিয়ে অনিশ্চয়তার কারণে বিশ্ববাজারে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে গেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে নতুন চাপ সৃষ্টি হতে পারে।

জ্বালানি বাজারে এই অস্থিরতা ইতোমধ্যে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

সাধারণ মানুষের উদ্বেগ

ইরানের অভ্যন্তরে পরিস্থিতি আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক মনে হলেও বাস্তবতা ভিন্ন বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তেহরান ও অন্যান্য শহরের বাসিন্দারা জানান, যুদ্ধ ও অর্থনৈতিক সংকট তাদের জীবনকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে।

৩০ বছর বয়সী এক চিকিৎসক এএফপিকে বলেন, “এই যুদ্ধ শুধু ধ্বংস এনেছে, কিন্তু সাধারণ মানুষের কথা কেউ ভাবছে না।”

৩৯ বছর বয়সী আরেক বাসিন্দা সাগর বলেন, “অর্থনীতি ভয়াবহ অবস্থায় রয়েছে, মানুষকে অযথা আটকে রাখা হচ্ছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে কোনো নিশ্চয়তা নেই।”


যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি, হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা এবং যুদ্ধবিরতির অনিশ্চয়তা—সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের পরিস্থিতি আবারও এক জটিল ও বিপজ্জনক মোড়ে দাঁড়িয়েছে।

পাকিস্তানে প্রস্তাবিত শান্তি আলোচনার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত, আর বৈশ্বিক শক্তিগুলো কার্যকর সমাধানে কতটা এগোতে পারবে, তা নিয়েও তৈরি হয়েছে বড় প্রশ্ন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স