কানাডার শ্রমবাজারে তরুণদের জন্য এক অনিশ্চিত সময় তৈরি হয়েছে। সর্বশেষ সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সী তরুণদের বেকারত্বের হার বেড়ে ১৪.১ শতাংশে দাঁড়িয়েছে—যা জাতীয় গড় ৬.৭ শতাংশের তুলনায় দ্বিগুণেরও বেশি। এই পরিস্থিতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলছে দক্ষিণ এশীয় ও অভিবাসী শিক্ষার্থীদের ওপর, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া শিক্ষার্থীরাও রয়েছেন।
তথ্য প্রকাশ করেছে Statistics Canada, যা দেশটির শ্রমবাজারে গভীর কাঠামোগত সমস্যার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
জাতিগত বৈষম্যের স্পষ্ট চিত্র
প্রতিবেদন অনুযায়ী, কানাডার শ্রমবাজারে জাতিগত বৈষম্য এখন আরও প্রকট হয়ে উঠছে। বিভিন্ন গোষ্ঠীর তরুণদের বেকারত্বের হার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—
কৃষ্ণাঙ্গ তরুণদের বেকারত্ব: ২৩.২%
চীনা বংশোদ্ভূত তরুণদের বেকারত্ব: ১৭.৪%
দক্ষিণ এশীয় (বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান) তরুণদের বেকারত্ব: ১৩%
শ্বেতাঙ্গ বা স্থানীয় তরুণদের বেকারত্ব: ১১.২%
এই পরিসংখ্যান থেকে স্পষ্ট, অভিবাসী ও সংখ্যালঘু তরুণেরা স্থানীয়দের তুলনায় বেশি বাধার সম্মুখীন হচ্ছেন।
কেন বাড়ছে বেকারত্ব?
বিশ্লেষকরা কয়েকটি মূল কারণ চিহ্নিত করেছেন, যা তরুণদের চাকরি সংকটকে তীব্র করছে—
১. উচ্চ সুদের হার ও বিনিয়োগে স্থবিরতা
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সুদের হার দীর্ঘ সময় উচ্চ পর্যায়ে থাকায় ব্যবসায়িক বিনিয়োগ কমে গেছে। ২০২৬ সালে তা কিছুটা কমে এলেও নতুন নিয়োগে প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সতর্ক।
২. অভিজ্ঞ কর্মীর চাহিদা বৃদ্ধি
অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তায় প্রতিষ্ঠানগুলো নতুনদের বদলে অভিজ্ঞ কর্মীদের নিয়োগে ঝুঁকছে। ফলে নতুন গ্র্যাজুয়েটরা চাকরির বাজারে পিছিয়ে পড়ছে।
৩. নেটওয়ার্কিং ঘাটতি ও বৈষম্য
দক্ষিণ এশীয় বা নতুন অভিবাসীদের পেশাগত যোগাযোগ (নেটওয়ার্ক) দুর্বল হওয়ায় তারা অনেক সময় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও সুযোগ পাচ্ছেন না। অন্যদিকে স্থানীয় তরুণদের রেফারেন্স ও যোগাযোগ বেশি থাকায় তারা তুলনামূলক এগিয়ে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা
University of Manitoba-এ অধ্যয়নরত বাংলাদেশি শিক্ষার্থী আশিক জামান বলেন, কানাডায় আসার আগে ধারণা ছিল পড়াশোনার পাশাপাশি সহজেই খণ্ডকালীন কাজ পাওয়া যাবে। বাস্তবে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ভিন্ন।
তার ভাষায়,
“শ্বেতাঙ্গ সহপাঠীরা রেফারেন্সের মাধ্যমে দ্রুত কাজ পেয়ে যাচ্ছে। কিন্তু আমরা দক্ষিণ এশীয়রা শত শত জায়গায় আবেদন করেও সাড়া পাচ্ছি না। একটি সাধারণ গ্রোসারি দোকানের চাকরির জন্যও এখন শত শত আবেদন জমা পড়ে।”
এই অভিজ্ঞতা অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থীর বাস্তবতার প্রতিফলন বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বছরের শুরুতেই কর্মসংস্থান বড় ধাক্কা
২০২৬ সালের প্রথম দুই মাসেই কানাডায় প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার কর্মসংস্থান হারিয়েছে, যার বড় অংশই ফুল-টাইম চাকরি। এর মধ্যে শুধু তরুণদের ক্ষেত্রেই কমেছে প্রায় ৬৪ হাজার চাকরি।
বিশ্লেষকদের মতে, কোভিড-১৯ মহামারি বাদ দিলে গত ১৫ বছরের মধ্যে এটি তরুণদের জন্য সবচেয়ে কঠিন সময়।
বড় শহরে প্রতিযোগিতা, ছোট শহরে সুযোগ সংকট
Toronto, Montreal, Vancouver, Calgary ও Edmonton—এর মতো বড় শহরগুলোতে অভিবাসীর সংখ্যা বেশি হওয়ায় চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতা তীব্র হয়ে উঠেছে।
অন্যদিকে ছোট শহরগুলোতে চাকরির সুযোগ সীমিত, ফলে শিক্ষার্থীরা বিকল্প খুঁজতেও হিমশিম খাচ্ছেন।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে কানাডা আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের কাছে আকর্ষণ হারাতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষার্থীরা বিকল্প হিসেবে অন্য দেশ বেছে নেওয়ার প্রবণতা বাড়াতে পারে।
সব মিলিয়ে, কানাডার শ্রমবাজারে বর্তমান সংকট শুধু অর্থনৈতিক নয়—এটি সামাজিক ও নীতিগত চ্যালেঞ্জ হিসেবেও সামনে আসছে, যার প্রভাব পড়ছে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে বিদেশে যাওয়া বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের জীবনে।