যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনা বা যুদ্ধ পরিস্থিতি শেষ করতে চীনের কোনো সহায়তার প্রয়োজন নেই। এমন মন্তব্য তিনি এমন এক সময় করলেন, যখন তেহরানের সঙ্গে স্থায়ী শান্তিচুক্তির সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে আসছে এবং একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হয়েছে বলে বিভিন্ন সূত্র দাবি করছে।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Reuters জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত জলপথ হরমুজ এখন ক্রমশই উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
‘চীনের প্রয়োজন নেই’—ট্রাম্পের কড়া অবস্থান
হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ট্রাম্প বলেন, ইরান সংকট সমাধানে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিং–এর সহায়তা নেওয়ার কোনো প্রয়োজন তিনি দেখছেন না।
তিনি বলেন, “ইরান বিষয়ে আমাদের কোনো সাহায্যের প্রয়োজন নেই বলে আমি মনে করি। শান্তিপূর্ণ উপায়ে হোক বা অন্য কোনোভাবে, আমরাই এই যুদ্ধে জয়ী হব।”
ট্রাম্পের এই মন্তব্য এমন সময় আসে, যখন তিনি বেইজিংয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনের আগে আসন্ন কূটনৈতিক আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।
হরমুজ প্রণালি ঘিরে উত্তেজনা
প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতির এক মাসেরও বেশি সময় পার হলেও স্থায়ী শান্তিচুক্তির অগ্রগতি হয়নি। এই অবস্থায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হচ্ছে বলে কূটনৈতিক সূত্রগুলো দাবি করছে।
বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এখানে কোনো ধরনের নিয়ন্ত্রণ বা অস্থিরতা বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
ইরানের সঙ্গে জ্বালানি চুক্তির দাবি
সূত্রের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ইরান ইতিমধ্যে ইরাক ও পাকিস্তানের সঙ্গে পৃথক চুক্তির মাধ্যমে হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) পরিবহন নিশ্চিত করেছে।
এ বিষয়ে দাবি করা হয়, ইরাক ও পাকিস্তানের পাশাপাশি আরও কিছু দেশ এখন ইরানের সঙ্গে অনুরূপ চুক্তি করার পথ খুঁজছে। এতে হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের নিয়ন্ত্রণ আরও প্রাতিষ্ঠানিক ও দীর্ঘস্থায়ী রূপ নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন কূটনৈতিক টানাপোড়েন
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, সম্প্রতি মার্কিন ও চীনা কর্মকর্তারা একটি বিষয়ে একমত হয়েছেন—কোনো দেশেরই হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী নৌযানের ওপর শুল্ক বা টোল আরোপের অধিকার থাকা উচিত নয়।
চীন, যা ইরানের অন্যতম প্রধান তেল ক্রেতা, এই ইস্যুতে সরাসরি কোনো বিরোধিতা করেনি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কূটনৈতিক সমাধানের চেষ্টা ও চীনের ভূমিকা
আগামী বৈঠকে ট্রাম্প ও সি চিন পিং–এর মধ্যে ইরান সংকট নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, ওয়াশিংটন চীনকে তেহরানের ওপর কূটনৈতিক চাপ প্রয়োগের আহ্বান জানাতে পারে।
তবে ট্রাম্প স্পষ্ট করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র এককভাবেই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সক্ষম বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
যুক্তরাষ্ট্রের শর্ত ও ইরানের পাল্টা অবস্থান
প্রতিবেদনে বলা হয়, সম্ভাব্য চুক্তির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান শর্তগুলোর মধ্যে রয়েছে—
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সীমিত বা বন্ধ করা
হরমুজ প্রণালির ওপর তেহরানের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ কমানো
অন্যদিকে ইরান পাল্টা শর্ত হিসেবে যুদ্ধক্ষয়ক্ষতির ক্ষতিপূরণ, নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং আঞ্চলিক সংঘাত বন্ধের দাবি জানিয়েছে বলে সূত্রের বরাতে জানানো হয়।
আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপট
ইরান সমর্থিত হিজবুল্লাহ ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদের মধ্যে লেবাননসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সংঘাত চলমান রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে মধ্যপ্রাচ্যে বড় শক্তিগুলোর কূটনৈতিক অবস্থান আরও জটিল হয়ে উঠেছে।
ট্রাম্প অবশ্য ইরানের এসব দাবিকে “অগ্রহণযোগ্য” বলে মন্তব্য করেছেন।
বিশ্লেষণ: কৌশলগত জলপথে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য
বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালি ঘিরে ইরানের ক্রমবর্ধমান নিয়ন্ত্রণ এবং যুক্তরাষ্ট্র–চীন–ইরান ত্রিমুখী কূটনৈতিক টানাপোড়েন বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তাকে নতুন অনিশ্চয়তার মুখে ফেলছে।
একদিকে সামরিক ও কূটনৈতিক চাপ, অন্যদিকে জ্বালানি সরবরাহ নির্ভরতা—এই দুইয়ের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ শক্তির ভারসাম্য দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে বলে পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন।