ফ্রান্স ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাইরের শিক্ষার্থীদের জন্য টিউশন ফি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর ফলে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষার ব্যয় বাড়বে। দেশটির সরকার বলছে, আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি নীতিকে আরও কৌশলগত ও আর্থিকভাবে টেকসই করতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন নিয়ম অনুযায়ী নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের ব্যাচেলর পর্যায়ে বছরে ২ হাজার ৮৯৫ ইউরো এবং মাস্টার্স পর্যায়ে ৩ হাজার ৯৪১ ইউরো টিউশন ফি দিতে হবে। বাংলাদেশি মুদ্রায় যা প্রায় ৪ লাখ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকার সমপরিমাণ।
কোন দেশের শিক্ষার্থীরা নতুন ফি কাঠামোর আওতায় পড়বেন
নতুন এই ফি কাঠামো ইউরোপীয় ইউনিয়ন, ইউরোপিয়ান ইকোনমিক এরিয়া (ইইএ) ও সুইজারল্যান্ডের বাইরের সব দেশের শিক্ষার্থীদের জন্য প্রযোজ্য হবে। অর্থাৎ বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, চীন, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, ব্রাজিল, নাইজেরিয়া, মিসরসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী এই সিদ্ধান্তের আওতায় পড়বেন।
অন্যদিকে ফ্রান্স, ইইউভুক্ত দেশসমূহ, নরওয়ে, আইসল্যান্ড, লিচেনস্টাইন ও সুইজারল্যান্ডের শিক্ষার্থীরা আগের মতোই তুলনামূলক কম ফিতে পড়াশোনার সুযোগ পাবেন।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাড় দেওয়ার ক্ষমতা সীমিত
এর আগে ফরাসি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চাইলে নন-ইইউ শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত ফি আংশিক বা পুরোপুরি মওকুফ করতে পারত। ফলে অনেক আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী স্থানীয় শিক্ষার্থীদের সমপরিমাণ কম খরচে পড়াশোনার সুযোগ পেতেন।
কিন্তু নতুন নীতিতে এই নমনীয়তা অনেকটাই সীমিত করা হয়েছে। এখন থেকে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ নন-ইইউ শিক্ষার্থী ফি ছাড়ের সুযোগ পাবেন। অর্থাৎ অধিকাংশ শিক্ষার্থীকে পূর্ণ নির্ধারিত ফি পরিশোধ করতে হবে।
কৌশলগত বিষয়ে বৃত্তির অগ্রাধিকার
ফ্রান্স সরকার জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বৃত্তির প্রায় ৬০ শতাংশ বরাদ্দ দেওয়া হবে এমন সব বিষয়ে, যেগুলোকে জাতীয় উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে—
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)
ডিজিটাল প্রযুক্তি
কোয়ান্টাম বিজ্ঞান
বায়োটেকনোলজি
উন্নত প্রকৌশল ও উদ্ভাবন
সরকারের মতে, এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক শিক্ষাব্যবস্থাকে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রযুক্তিগত লক্ষ্যগুলোর সঙ্গে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা সম্ভব হবে।
সরকারের অবস্থান
ফ্রান্সের উচ্চশিক্ষামন্ত্রী ফিলিপ ব্যাপটাইজ বলেন, “ডিফারেনশিয়েটেড ফি এখন নিয়ম; ছাড় হবে ব্যতিক্রম।”
সরকারের ভাষ্য, এই নীতির ফলে একদিকে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অতিরিক্ত অর্থ পাবে, অন্যদিকে বৃত্তি ও ভর্তি প্রক্রিয়ায় আরও কৌশলগত সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্বেগ
তবে এই সিদ্ধান্তে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে France Universités। সংগঠনটির মতে, নতুন ফি কাঠামো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্বায়ত্তশাসন কমিয়ে দেবে এবং আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রান্সের আকর্ষণ কমাতে পারে।
তাদের আশঙ্কা, উচ্চ টিউশন ফি নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশের অনেক মেধাবী শিক্ষার্থীর জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়াবে। একই সঙ্গে বৃত্তি ব্যবস্থাপনা ও ফি ছাড়ের সীমাবদ্ধতা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক চাপ বাড়াবে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের ওপর সম্ভাব্য প্রভাব
ফ্রান্স দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলক কম খরচে উচ্চশিক্ষার জন্য বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের কাছে জনপ্রিয় গন্তব্য। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে—
মোট শিক্ষাব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে;
স্বল্প আয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ সীমিত হতে পারে;
বৃত্তি পাওয়া আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে;
অনেক শিক্ষার্থী জার্মানি, ইতালি বা অন্যান্য ইউরোপীয় দেশে বিকল্প খুঁজতে পারেন।
বর্তমানে আবেদনকারীদের করণীয়
যাঁরা ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষে ফ্রান্সে পড়তে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য এখনই কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা জরুরি—
সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের সর্বশেষ টিউশন ফি যাচাই করা।
বৃত্তি ও ফি মওকুফের সুযোগ সম্পর্কে খোঁজ নেওয়া।
সম্ভাব্য জীবনযাত্রার ব্যয়সহ পূর্ণ বাজেট পরিকল্পনা করা।
বিকল্প দেশ ও বিশ্ববিদ্যালয় বিবেচনায় রাখা।
আন্তর্জাতিক শিক্ষাবাজারে নতুন প্রতিযোগিতা
বিশ্লেষকদের মতে, ফ্রান্সের এই পদক্ষেপ ইউরোপের উচ্চশিক্ষা খাতে নতুন প্রতিযোগিতার জন্ম দিতে পারে। যদিও ফ্রান্স এখনো বিশ্বমানের শিক্ষা, গবেষণা সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার গঠনের জন্য আকর্ষণীয় গন্তব্য, তবুও বাড়তি খরচ অনেক শিক্ষার্থীর সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে।
বিশেষ করে যারা সীমিত বাজেটে বিদেশে পড়াশোনার পরিকল্পনা করছেন, তাঁদের জন্য বৃত্তি ও অর্থায়নের সুযোগ আগের চেয়ে আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক