ঢাকা

গুহার জীবন থেকে বিশ্বমঞ্চে—প্রেসিডেন্ট সিরের বিস্ময়কর উত্থান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
বিস্ময়কর যাত্রা

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক ঐতিহাসিক বেইজিং সফরের সময় বিশ্বের দৃষ্টি ছিল গ্রেট হল অব দ্য পিপল–এর দিকে। আলোচনার টেবিলে এক পাশে বসেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আর অন্য পাশে চীনের সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর নেতা Xi Jinping।

তিনিই আজ বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির রাষ্ট্রপ্রধান, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সর্বোচ্চ নেতা এবং সামরিক বাহিনীর প্রধান—একই সঙ্গে তিনটি শীর্ষ পদে অধিষ্ঠিত। কিন্তু এই ক্ষমতার শিখরে পৌঁছানোর গল্প শুরু হয়েছিল রাজকীয় প্রাসাদে নয়, বরং এক পাহাড়ি গ্রামের কাদা-মাটি আর গুহার অন্ধকার থেকে।

ক্ষমতার কেন্দ্রে জন্ম, কিন্তু নিরাপদ শৈশব নয়

১৯৫৩ সালের ১৫ জুন বেইজিংয়ে জন্মগ্রহণ করেন সি চিন পিং। তাঁর বাবা Xi Zhongxun ছিলেন কমিউনিস্ট বিপ্লবের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা এবং মাও সে-তুংয়ের ঘনিষ্ঠ সহযোদ্ধা।

শৈশবে তিনি বেড়ে ওঠেন বেইজিংয়ের ক্ষমতাকেন্দ্র ঝংনানহাইয়ে—যেখানে উচ্চপদস্থ নেতাদের জন্য ছিল বিশেষ নিরাপত্তা, গাড়ি, রাশিয়ান প্রযুক্তির সুবিধা ও বিলাসবহুল পরিবেশ। তবে বাবার কঠোর নিয়ন্ত্রণে তিনি অতিরিক্ত বিলাসিতা থেকে দূরে ছিলেন।

ক্ষমতার ভাঙন: পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা

১৯৬২ সালে সির জীবনে আসে বড় ধাক্কা। রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের অভিযোগে তার বাবাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয় এবং কারাবন্দি করা হয়। এরপর পুরো পরিবারকে ঝংনানহাই থেকে বের করে দেওয়া হয়।

শিশু সি হঠাৎই ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা জীবন থেকে ছিটকে পড়েন বাস্তবতার কঠিন পৃথিবীতে। এরপর সাংস্কৃতিক বিপ্লবের সময় পরিবারের ওপর নেমে আসে আরও কঠোর দমন-পীড়ন। তার মা শ্রম শিবিরে পাঠানো হন এবং পরিবারের জীবন সম্পূর্ণভাবে ভেঙে পড়ে।

‘রেড গার্ড’ যুগের অস্থিরতা

১৯৬৬ সালে সাংস্কৃতিক বিপ্লব শুরু হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। রেড গার্ডদের আক্রমণ ও রাজনৈতিক শুদ্ধিকরণে সি পরিবার চরম ভোগান্তির শিকার হয়। পরিবারকে “বাবার অপরাধের” দায় বহন করতে হয়।

এই সময়ই সি চিন পিং নিরাপদ শিক্ষা জীবন হারান এবং শুরু হয় এক অনিশ্চিত ভবিষ্যতের যাত্রা।

হলুদ পাহাড়ের গুহা: জীবন বদলে দেওয়া তিন বছর

১৯৬৯ সালে ১৫ বছর বয়সে সি চিন পিং পাঠানো হন শানসি প্রদেশের লিয়াংজিয়াহ গ্রামে। সেখানে তিনি টানা কয়েক বছর কাটান পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা গুহায় বসবাস করে।

এই গ্রাম, যেখানে মানুষ থাকত মাটির গুহায়, ছিল দারিদ্র্য ও কষ্টে পরিপূর্ণ। খাবার ছিল সীমিত, জীবন ছিল কঠোর শ্রমনির্ভর।

শুরুতে তিনি কষ্ট সহ্য করতে পারেননি, এমনকি কিছু সময় পালিয়ে বেইজিং যাওয়ার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরে আবার ফিরে আসেন সেই গ্রামে।

ধীরে ধীরে তিনি কৃষিকাজে অভ্যস্ত হন—গমের বস্তা কাঁধে বহন, সেচের নালা খনন, পাহাড়ি রাস্তা মেরামত—এসবই হয়ে ওঠে তার দৈনন্দিন জীবন।

এই সময়েই তিনি পড়াশোনা ও আত্মগঠনের মাধ্যমে নিজের ভবিষ্যৎ তৈরি করতে শুরু করেন।

পার্টিতে প্রবেশের দীর্ঘ লড়াই

সি চিন পিংয়ের রাজনৈতিক যাত্রা ছিল অত্যন্ত কঠিন। কমিউনিস্ট ইয়ুথ লিগ ও পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য তাকে বহুবার প্রত্যাখ্যাত হতে হয়—কারণ ছিল তার পারিবারিক পটভূমি।

অনেকবার ব্যর্থ হওয়ার পর অবশেষে তিনি পার্টিতে যোগ দেওয়ার সুযোগ পান। ১৯৭৪ সালে তিনি চীনা কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন।

এরপর শুরু হয় স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্বের ধাপে ধাপে উত্থান।

ধাপে ধাপে ক্ষমতার শীর্ষে

১৯৭০–৮০ দশকে তিনি বিভিন্ন প্রদেশে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করেন। ফুজিয়ান, ঝেজিয়াং ও সাংহাই—এই তিন অঞ্চলে কাজ করে তিনি প্রশাসনিক দক্ষতা ও রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করেন।

২০০২ সালে তিনি কেন্দ্রীয় কমিটির পূর্ণ সদস্য হন। ২০০৭ সালে প্রবেশ করেন পলিটব্যুরো স্ট্যান্ডিং কমিটিতে, যা চীনের সর্বোচ্চ ক্ষমতার কেন্দ্র।

২০১২ সালে তিনি হন কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক এবং পরের বছর ২০১৩ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হন।

‘বৈপরীত্যের মানুষ’ সি চিন পিং

বিশ্লেষকদের মতে, সি চিন পিং এক বৈপরীত্যপূর্ণ ব্যক্তিত্ব। তিনি একদিকে কমিউনিস্ট পার্টির উত্তরাধিকার বহন করেন, অন্যদিকে সেই ব্যবস্থারই ভুক্তভোগী ছিলেন।

তিনি কঠোর বাস্তবতা ও দারিদ্র্যের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন, আবার বিশ্ব রাজনীতির সর্বোচ্চ মঞ্চে দাঁড়িয়ে যুক্তরাষ্ট্রের মতো শক্তির সঙ্গে আলোচনায় অংশ নিচ্ছেন।

অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন, তার রাজনৈতিক দর্শন মূলত “সংঘাত থেকে টিকে থাকা ও নিয়ন্ত্রণ”–এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে।

গুহা এখন ইতিহাসের তীর্থস্থান

লিয়াংজিয়াহ গ্রাম এখন আর শুধু একটি দরিদ্র গ্রাম নয়। এটি পরিণত হয়েছে একটি রাষ্ট্রীয় “দেশপ্রেমিক শিক্ষা কেন্দ্র”-এ।

হাজার হাজার মানুষ এখন সেখানে যান সেই গুহা দেখতে, যেখানে সি চিন পিং কাটিয়েছিলেন তার জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময়।

গুহা থেকে গ্রেট হল: এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা

আজ যখন তিনি গ্রেট হলে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে আলোচনায় বসেন, তখন তার অতীতের গুহা-জীবন এক প্রতীকী ইতিহাস হয়ে ওঠে।

একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট, অন্যদিকে একজন নেতা যিনি ক্ষমতায় উঠেছেন রাজনৈতিক বিপর্যয়, শ্রমশিবির এবং গ্রামীণ জীবনের মধ্য দিয়ে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ব্যক্তিগত ইতিহাসই তাকে একজন কৌশলী ও কঠোর রাষ্ট্রনায়কে পরিণত করেছে।

গুহা থেকে গ্রেট হল—সি চিন পিংয়ের এই যাত্রা শুধু ব্যক্তিগত সাফল্যের গল্প নয়, বরং আধুনিক চীনের রাজনৈতিক ক্ষমতার বিবর্তনেরও প্রতিচ্ছবি।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স