চট্টগ্রাম বন্দর–এর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ চালু কনটেইনার টার্মিনাল চিটাগং কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) পরিচালনার দায়িত্ব পেতে এবার তীব্র প্রতিযোগিতায় নেমেছে দেশি–বিদেশি তিনটি বড় প্রতিষ্ঠান। মধ্যপ্রাচ্যের দুই শক্তিশালী অর্থনৈতিক কেন্দ্র সংযুক্ত আরব আমিরাত ও সৌদি আরবের পাশাপাশি দেশীয় বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানও এই প্রতিযোগিতায় সক্রিয় হয়েছে।
দুবাইভিত্তিক DP World, সৌদি আরবের Red Sea Gateway Terminal (আরএসজিটি) এবং বাংলাদেশের এমজিএইচ গ্রুপ একই টার্মিনাল দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনার প্রস্তাব দিয়ে এখন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে।
একই টার্মিনালে তিন পক্ষের কৌশলগত আগ্রহ
সূত্র অনুযায়ী, ৮ এপ্রিল দুবাইয়ে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ–দুবাই প্ল্যাটফর্ম বৈঠকে সিসিটি পরিচালনার প্রস্তাব দেয় ডিপি ওয়ার্ল্ড। এর মাত্র দুই সপ্তাহ পর ২২ এপ্রিল সৌদি আরবের আরএসজিটি একই টার্মিনাল পরিচালনার জন্য আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব জমা দেয়।
অন্যদিকে দেশীয় বহুজাতিক MGH Group–ও সিসিটি পরিচালনার পাশাপাশি নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল নিয়েও আলাদা প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি শুধু বন্দর ব্যবস্থাপনার প্রতিযোগিতা নয়, বরং দক্ষিণ এশিয়ার লজিস্টিক ও বাণিজ্যিক নিয়ন্ত্রণে প্রভাব বিস্তারের একটি বড় কৌশলগত লড়াই।
সৌদি–আমিরাত প্রতিদ্বন্দ্বিতার ছায়া বন্দরে
চট্টগ্রাম বন্দরের এই প্রতিযোগিতা মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সঙ্গেও মিল খুঁজে পাচ্ছেন পর্যবেক্ষকরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাত বিভিন্ন কৌশলগত অর্থনৈতিক খাতে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে।
বন্দরসংশ্লিষ্টদের মতে, চালু টার্মিনাল পরিচালনার সুযোগ পেলে তাৎক্ষণিক আয় নিশ্চিত হয় এবং দীর্ঘমেয়াদে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ পাওয়া যায়। ফলে সিসিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ টার্মিনালের প্রতি তাদের আগ্রহ বাড়ছে।
চালু টার্মিনালেই মূল আগ্রহ বিনিয়োগকারীদের
বর্তমানে চট্টগ্রাম বন্দরে চারটি কনটেইনার টার্মিনাল চালু রয়েছে। এর মধ্যে পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে আরএসজিটি। অন্য তিনটি টার্মিনাল—এনসিটি, জিসিবি ও সিসিটি—এখনো দেশীয় ব্যবস্থাপনায় চলছে।
বন্দর বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন টার্মিনাল নির্মাণে দীর্ঘ সময় ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন। কিন্তু চালু টার্মিনাল পেলে বিনিয়োগকারীরা দ্রুত রিটার্ন পায়। এ কারণেই বর্তমানে সক্রিয় টার্মিনালগুলো নিয়েই মূল প্রতিযোগিতা তৈরি হয়েছে।
সিসিটি নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত হিসাব
ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিকল্পনায় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও সিসিটিকে একীভূত করে বড় অপারেশনাল ইউনিট গঠনের প্রস্তাব রয়েছে। অন্যদিকে আরএসজিটি চায় সিসিটি ও জেনারেল কার্গো বার্থ (জিসিবি) একীভূত করে দীর্ঘমেয়াদে পরিচালনা করতে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, সিসিটি যেই পক্ষ পাবে, তারাই কার্যত বন্দরের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে, কারণ এটি কৌশলগতভাবে এনসিটি ও জিসিবির মাঝামাঝি অবস্থিত।
কনটেইনার প্রবাহে সম্ভাব্য নিয়ন্ত্রণ
বন্দর তথ্য অনুযায়ী, গত বছরে মোট কনটেইনারের প্রায় ৪৪ শতাংশ এনসিটিতে, ৩৬ শতাংশ জিসিবিতে, ১৬ শতাংশ সিসিটিতে এবং বাকিটা পতেঙ্গা টার্মিনালে ওঠানো–নামানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের হিসাব অনুযায়ী—
এনসিটি–সিসিটি একীভূত হলে ডিপি ওয়ার্ল্ড প্রায় ৬০ শতাংশ কনটেইনার নিয়ন্ত্রণে নিতে পারে
সিসিটি–জিসিবি একীভূত হলে আরএসজিটি প্রায় ৫৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রণে আসতে পারে
ফলে প্রতিযোগিতা কার্যত বন্দরের মূল লজিস্টিক নিয়ন্ত্রণকে ঘিরেই আবর্তিত হচ্ছে।
দেশীয় এমজিএইচের পাল্টা প্রস্তাব
দেশীয় প্রতিষ্ঠান এমজিএইচ গ্রুপও প্রতিযোগিতায় শক্ত অবস্থান নিয়েছে। তাদের প্রস্তাবে বলা হয়েছে, তারা বন্দরকে তুলনামূলক বেশি রাজস্ব দিতে সক্ষম।
এমজিএইচের দাবি, তাদের মডেলে ১৫ বছরে প্রায় ১৬৮ কোটি ডলার আয় সম্ভব হবে। পাশাপাশি তারা প্রতি কনটেইনারে উচ্চ রাজস্ব ভাগাভাগির প্রস্তাব দিয়েছে।
গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক আনিস আহমেদ বলেন, তারা বন্দরকে সর্বোচ্চ রাজস্ব দেওয়ার সক্ষমতা রাখে এবং দেশীয় প্রতিষ্ঠান হওয়ায় অর্থ দেশের ভেতরেই থাকবে।
সরকারের অবস্থান ও সিদ্ধান্ত প্রক্রিয়া
চট্টগ্রাম বন্দরের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রস্তাব এখন মূল্যায়ন পর্যায়ে রয়েছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সরকার।
নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়–এর মাধ্যমে প্রস্তাবগুলো যাচাই–বাছাই করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
কৌশলগত গুরুত্ব ও ভবিষ্যৎ প্রভাব
চট্টগ্রাম বন্দর শুধু বাংলাদেশের আমদানি–রপ্তানির কেন্দ্র নয়, এটি দক্ষিণ এশিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট হাব হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। ফলে সিসিটির মতো টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ অর্থনৈতিক দিকের পাশাপাশি কৌশলগত প্রভাবও তৈরি করবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চালু টার্মিনাল ঘিরে অতিরিক্ত প্রতিযোগিতা নতুন অবকাঠামো প্রকল্পে বিনিয়োগ কমিয়ে দিতে পারে, যা দীর্ঘমেয়াদে বন্দর সম্প্রসারণ পরিকল্পনায় প্রভাব ফেলতে পারে।
বন্দর খাতের একজন সাবেক পরিচালক বলেন, বর্তমান প্রতিযোগিতা দ্রুত আয় নিশ্চিত করার সুযোগ তৈরি করলেও ভবিষ্যতের বড় প্রকল্পগুলোর বিনিয়োগ কাঠামো ঝুঁকিতে ফেলতে পারে।
চট্টগ্রাম বন্দরের সিসিটি এখন তাই শুধু একটি টার্মিনাল নয়; এটি হয়ে উঠেছে দেশি–বিদেশি শক্তির কৌশলগত অর্থনৈতিক লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দু—যার ফলাফল নির্ধারণ করবে বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের ভবিষ্যৎ গতিপথ।