ক্যারিবীয় ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে মাদক পাচারকারী সন্দেহে যুক্তরাষ্ট্রের নৌযানে পরিচালিত সামরিক হামলায় নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত করেছে একটি আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক দল। পাঁচ মাসব্যাপী যৌথ অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই তথ্য, যা ঘটনার মানবিক ও আইনি দিক নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি করেছে।
এই অনুসন্ধান পরিচালনা করেছে লাতিন আমেরিকান সেন্টার ফর ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিজম (CLIP) এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক বিভিন্ন মানবাধিকার ও সাংবাদিকতা সংস্থার সহযোগিতায় গঠিত ২০ জন সাংবাদিকের একটি যৌথ দল।
নিহত ১৩ জনের পরিচয় শনাক্ত, পেছনে চরম দারিদ্র্যের চিত্র
অনুসন্ধানে শনাক্ত ১৩ জন ভুক্তভোগী মূলত ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগো ও সেন্ট লুসিয়ার নাগরিক। তাঁদের মধ্যে কয়েকজন ছিলেন জেলে, গাড়িচালক ও স্বল্প আয়ের শ্রমজীবী মানুষ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নিহতদের অনেকের বিরুদ্ধে মাদক পাচারের সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বরং অধিকাংশই চরম দারিদ্র্যপীড়িত অঞ্চলের বাসিন্দা, যারা জীবিকার তাগিদে অনিশ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যুক্ত ছিলেন।
এই অঞ্চলে গত কয়েক মাসে যুক্তরাষ্ট্রের এ ধরনের অভিযানগুলোতে প্রায় ২০০ জন নিহত হয়েছেন বলে অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়।
“মাদক সন্ত্রাসী” অভিযোগ ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান
যুক্তরাষ্ট্র প্রশাসন এসব হামলাকে “মাদক-সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান” হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের দাবি, লক্ষ্যবস্তু করা নৌযানগুলো মাদক পাচারের সঙ্গে যুক্ত ছিল।
তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৯৪ জন নিহত ব্যক্তির মধ্যে অনেকেরই পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা হয়নি। এমনকি হামলার আগে তাদের অপরাধমূলক সম্পৃক্ততার সুনির্দিষ্ট প্রমাণ প্রকাশ করা হয়নি।
হোয়াইট হাউসের বিরুদ্ধে নিহতদের পরিবার আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পর মাত্র তিনজনের পরিচয় প্রকাশ্যে আনা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
“তারা রক্তমাংসের মানুষ”—মানবিক বাস্তবতা
প্রতিবেদনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে বলা হয়েছে, নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় সমাজ মনে করে—তাঁরা অপরাধী নন, বরং জীবিকার জন্য সংগ্রাম করা সাধারণ মানুষ।
CLIP–এর পরিচালক মারিয়া তেরেসা রন্দেরোস বলেন, “যেসব যুবককে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, তারা কোনো বড় মাদক সম্রাট নয়। তারা চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বেঁচে থাকা মানুষ, যারা পরিবার চালানোর জন্য যেকোনো কাজ করতে বাধ্য হয়েছেন।”
তিনি আরও বলেন, “বড় মাদক সম্রাটদের পরিবর্তে বাস্তবে লক্ষ্যবস্তু হচ্ছে দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী।”
অনুসন্ধান চালানো ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ
২০ সাংবাদিকের এই যৌথ অনুসন্ধানে অংশ নেয় কলম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ত্রিনিদাদ অ্যান্ড টোবাগোসহ বিভিন্ন দেশের সংবাদমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, ভয়ভীতি ও রাজনৈতিক চাপের কারণে তথ্য সংগ্রহ ছিল অত্যন্ত কঠিন। স্থানীয় প্রশাসন এবং সরকারি কৌঁসুলির কার্যালয় অনেক ক্ষেত্রেই মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানায়।
হামলার প্রেক্ষাপট ও সামরিক অভিযানের বিস্তার
গত বছর ভেনেজুয়েলার কাছাকাছি এলাকায় মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ার পর এসব নৌযান লক্ষ্য করে হামলা শুরু হয়। তখন থেকেই ধারাবাহিকভাবে সন্দেহভিত্তিক অভিযানে প্রাণহানি ঘটে আসছে।
নৌযানগুলোকে “মাদক পাচারকারী নেটওয়ার্ক” হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও অনুসন্ধান বলছে, বহু ক্ষেত্রে এই অভিযোগের পক্ষে দৃশ্যমান প্রমাণ অনুপস্থিত।
পরিবারগুলোর অভিযোগ: ন্যায়বিচার নেই
নিহতদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেছেন, তাঁদের স্বজনদের কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া ছাড়াই হত্যা করা হয়েছে।
অনেক পরিবার দাবি করছে, নিহতদের “অপরাধী” হিসেবে চিহ্নিত করার ফলে সামাজিকভাবে তাঁদের আরও নিঃসঙ্গ ও কলঙ্কিত অবস্থায় ফেলে দেওয়া হয়েছে।
একজন পরিবারের সদস্য বলেন, “তারা অপরাধী কি না, তা পরে তদন্ত হতে পারত। কিন্তু আগে গুলি করে পরে পরিচয় খোঁজা—এটা গ্রহণযোগ্য নয়।”
আন্তর্জাতিক আইনি ও মানবাধিকার উদ্বেগ
মানবাধিকার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সন্দেহভিত্তিক সামরিক হামলায় প্রাণহানি হলে তা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের “আনুপাতিকতা ও প্রয়োজনীয়তা” নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হতে পারে।
তাঁদের মতে, মাদকবিরোধী অভিযান হলেও মৃত্যুদণ্ড ছাড়া সরাসরি প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিক্রিয়া
মার্কিন সামরিক বাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড জানিয়েছে, সব অভিযান ছিল “পরিকল্পিত, বৈধ এবং নির্ভুল”। তাদের দাবি, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতেই এসব হামলা চালানো হয়েছে।
তবে অনুসন্ধানী দল বলছে, এই দাবি স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করার মতো পর্যাপ্ত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিশেষজ্ঞদের বিশ্লেষণ: “প্রদর্শনমূলক যুদ্ধনীতি”
সাবেক মার্কিন আইনজীবী ও ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, এই অভিযানগুলো মূলত রাজনৈতিক বার্তা প্রদর্শনের অংশ হতে পারে, কার্যকর মাদকবিরোধী কৌশল নয়।
তাঁর মতে, এর মাধ্যমে প্রশাসন “কঠোর অবস্থান” দেখাতে চাইলেও বাস্তবে তা স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ভয়াবহ প্রভাব ফেলছে।
বড় প্রশ্ন: নিরাপত্তা নাকি বিচারবহির্ভূত হত্যা?
জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা এই ধরনের হামলাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড হিসেবে চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষকদের মতে, সবচেয়ে বড় উদ্বেগ হলো—এই ধরনের ঘটনাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
২০ সাংবাদিকের এই যৌথ অনুসন্ধান শুধু ১৩ জন নিহতের পরিচয় উন্মোচন করেনি; বরং একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে—রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে পরিচালিত অভিযানে কতটা মানবিক ও আইনি সীমা বজায় রাখা হচ্ছে।
প্রতিবেদনটির মূল বার্তা, নিহতরা শুধুই কোনো পরিসংখ্যান নয়—তাঁরা এমন মানুষ, যাদের পেছনে আছে পরিবার, দারিদ্র্য ও বেঁচে থাকার সংগ্রামের বাস্তব গল্প।