যুদ্ধবিরতি ও দীর্ঘমেয়াদি শান্তিচুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনায় যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে পাঁচ দফা শর্ত পেশ করেছে বলে জানিয়েছে ইরানের একাধিক সংবাদমাধ্যম। তবে এই শর্তগুলোকে “একতরফা” ও “অগ্রহণযোগ্য” বলে আখ্যা দিয়ে তেহরান আলোচনায় অচলাবস্থার অভিযোগ তুলেছে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, দ্রুত চুক্তিতে রাজি না হলে ইরানকে “গুরুতর পরিণতি” ভোগ করতে হবে।
মধ্যস্থতার চেষ্টা চললেও অগ্রগতি নেই
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ এগিয়ে নিতে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে সক্রিয় রয়েছে শাহবাজ শরিফ–এর নেতৃত্বাধীন পাকিস্তান।
শনিবার ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে দ্বিতীয় দফা সরাসরি বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে তারা আশাবাদী।
এরই অংশ হিসেবে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সৈয়দ মহসিন নাকভি সম্প্রতি তেহরান সফর করেন এবং ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে বৈঠক করেন। তবে প্রথম দফা দীর্ঘ বৈঠক হলেও দুই পক্ষ কোনো চূড়ান্ত সমঝোতায় পৌঁছাতে পারেনি।
নতুন পাঁচ দফা প্রস্তাব যুক্তরাষ্ট্রের
ইরানের আধা-সরকারি সংবাদ সংস্থা ফার্স নিউজের বরাতে জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র সর্বশেষ আলোচনায় পাঁচ দফা শর্ত দিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—
ইরান কেবল একটি পারমাণবিক কেন্দ্র চালু রাখতে পারবে
উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ সব ইউরেনিয়াম যুক্তরাষ্ট্রের কাছে হস্তান্তর করতে হবে
বিদেশে জব্দ ইরানি সম্পদের বড় অংশ (প্রায় ২৫ শতাংশ) ফেরত দেওয়া হবে না
ইরানের যুদ্ধক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্র প্রত্যাখ্যান করেছে
আলোচনা শুরু হলে সব ফ্রন্টে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে
তবে ওয়াশিংটনের পক্ষ থেকে এসব শর্তের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি পাওয়া যায়নি।
ইরানের সংবাদ সংস্থা মেহের নিউজ বলছে, যুক্তরাষ্ট্র এমন দাবি করছে যা “যুদ্ধের মাধ্যমে অর্জন করতে ব্যর্থ হওয়া সুবিধাকে আলোচনার মাধ্যমে আদায় করার চেষ্টা”।
ইরানের পাল্টা অবস্থান
তেহরানের সর্বশেষ প্রস্তাবে বলা হয়েছে, সব ফ্রন্টে তাৎক্ষণিক যুদ্ধবিরতি কার্যকর করতে হবে এবং বিশেষ করে লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযান বন্ধ করতে হবে।
ইরান দাবি করেছে—
মার্কিন নৌ-অবরোধ প্রত্যাহার
ভবিষ্যতে হামলা না চালানোর আন্তর্জাতিক নিশ্চয়তা
বিদেশে জব্দ সম্পদ অবমুক্তকরণ
নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার
যুদ্ধক্ষতির ক্ষতিপূরণ
সবচেয়ে বিতর্কিত দাবি হিসেবে ইরান হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের সার্বভৌম নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে উত্তেজনা
বিশ্ব বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল ও গ্যাস পরিবাহিত হয়। ইরান জানিয়েছে, এই জলপথ ব্যবহারের জন্য নতুন বিধি তৈরি করা হয়েছে এবং টোল আদায়ের পরিকল্পনাও রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র এই পদক্ষেপের কড়া বিরোধিতা করছে, যা দুই দেশের মধ্যে নতুন উত্তেজনা তৈরি করেছে।
সামরিক উত্তেজনা ও হুঁশিয়ারি
ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর মুখপাত্র আবুলফজল শেকারচি বলেছেন, নতুন করে হামলা হলে যুক্তরাষ্ট্রকে “অভূতপূর্ব প্রতিক্রিয়ার” মুখোমুখি হতে হবে।
অন্যদিকে ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “ইরানের সময় ফুরিয়ে আসছে। তারা দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে আর কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না।”
আঞ্চলিক উত্তেজনা ও কূটনৈতিক তৎপরতা
এই উত্তেজনার মধ্যে গতকাল সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি পারমাণবিক স্থাপনায় ড্রোন হামলার ঘটনা ঘটেছে, যেখানে একটি জেনারেটরে আগুন ধরে যায়। যদিও এতে কোনো হতাহতের ঘটনা হয়নি।
একই দিনে কাতার ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা টেলিফোনে আলোচনা করেছেন আঞ্চলিক পরিস্থিতি নিয়ে। এছাড়া ট্রাম্প ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু–এর সঙ্গে প্রায় আধা ঘণ্টা ফোনালাপে ইরান পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা করেন।
মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের ভূমিকা
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে পাকিস্তান। ইসলামাবাদে পূর্বে অনুষ্ঠিত দীর্ঘ ২০ ঘণ্টার আলোচনাতেও অগ্রগতি না এলেও কূটনৈতিক যোগাযোগ অব্যাহত রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, দুই পক্ষের অবস্থান এখনও এতটাই দূরবর্তী যে তাৎক্ষণিক কোনো সমঝোতা সম্ভব নয়। ফলে আলোচনার ভবিষ্যৎ এখনো অনিশ্চিত এবং মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।