ভারতের পশ্চিমবঙ্গে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে নতুনভাবে আলোচিত হচ্ছে ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’। রাজ্য রাজনীতিতে ক্ষমতার পালাবদল ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এই কঠোর উচ্ছেদ অভিযান এখন রাজনৈতিক আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
একই সঙ্গে রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্ক্সবাদী) বা সিপিএম–এর অভ্যন্তরীণ আলোচনায়ও পরিবর্তনের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে, যেখানে ধর্মীয় সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার বিষয়টি উঠে এসেছে।
‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ চালুর ঘোষণা ও বাস্তবায়ন
বিধানসভা নির্বাচনের আগে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী রাজ্যে অবৈধ দখল উচ্ছেদ, অপরাধ দমন ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উত্তর প্রদেশের মতো ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ চালুর ঘোষণা দেন।
এই সংস্কৃতির সূত্রপাত ঘটে উত্তর প্রদেশে বিজেপি সরকারের সময়, মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ–এর প্রশাসনিক নীতির অংশ হিসেবে, যেখানে অবৈধ স্থাপনা ভাঙার ক্ষেত্রে বুলডোজার ব্যবহারের বিষয়টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়।
পশ্চিমবঙ্গে নির্বাচনের পর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতায় এই নীতি বাস্তবায়নের উদাহরণ দেখা যাচ্ছে বলে স্থানীয় রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মত।
অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে একাধিক অভিযান
সম্প্রতি কলকাতার উপকণ্ঠ তপশিয়া-তিলজলা এলাকায় একটি অবৈধ চামড়ার কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের পর প্রশাসনের উদ্যোগে সেটি বুলডোজার দিয়ে ভেঙে ফেলা হয়। ঘটনায় দুইজনের মৃত্যু হয়েছিল।
এরপর বসিরহাটের হাসনাবাদের তালপুকুর এলাকায় একটি অবৈধ ভবনও ভেঙে দেওয়া হয়। অভিযোগ ছিল, স্থানীয় এক রাজনৈতিক ব্যক্তির বিরুদ্ধে জমি দখল করে নির্মাণের।
এ ছাড়া দক্ষিণ কলকাতার গড়িয়ার একটি মাঠে নির্মিত একটি অবৈধ ওয়াচ টাওয়ারও হাইকোর্টের নির্দেশে বুলডোজার দিয়ে অপসারণ করা হয়।
সবশেষে হাওড়া স্টেশনের আশপাশে অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদে রাতের অভিযানে বুলডোজার ব্যবহার করা হয়। প্রশাসন মাইকিংয়ের মাধ্যমে দোকান সরানোর নির্দেশ দেওয়ার পর পুলিশ ও নিরাপত্তা বাহিনী অভিযান চালায়।
রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক বিতর্ক
এই উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে রাজ্যজুড়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা যাচ্ছে। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, অবৈধ দখল ও ঝুঁকিপূর্ণ স্থাপনা অপসারণে এটি প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ। তবে বিরোধীরা এটিকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলেও সমালোচনা করছে।
সিপিএমের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত
রাজ্য রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে কলকাতায় বৈঠক করেছে সিপিএম–এর রাজ্য কমিটি। বিধানসভা নির্বাচনের পর প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক কৌশল নিয়ে আলোচনা হয়।
বৈঠকে নেতারা মত দেন, বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতায় শুধু ধর্মনিরপেক্ষ অবস্থান বা ধর্মীয় বিষয় এড়িয়ে চলা যথেষ্ট নয়। বরং ধর্মীয় সামাজিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেও সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লড়াই করা প্রয়োজন।
দলের নেতাদের মতে, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মাচরণ এক নয়—এ বিষয়টি পরিষ্কারভাবে আলাদা করে দেখা জরুরি।
সিপিএমের কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক এম এ বেবি–ও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, সাম্প্রদায়িকতা ও ধর্মাচরণের মধ্যে মৌলিক পার্থক্য রয়েছে এবং দলকে সেই পার্থক্য বুঝে কৌশল নির্ধারণ করতে হবে।
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, ভবিষ্যতে স্থানীয় পূজা কমিটি, মন্দির, মসজিদ ও গির্জা কমিটির সঙ্গে আরও সাংগঠনিকভাবে যুক্ত হওয়ার বিষয়েও আলোচনা চলছে।
সীমান্ত সড়ক ব্যবস্থাপনায় বড় পরিবর্তন
এদিকে পশ্চিমবঙ্গের উত্তরাঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ‘চিকেন নেক’ করিডর এলাকায় অবস্থিত সাতটি জাতীয় সড়কের প্রশাসনিক দায়িত্ব কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এই সড়কগুলো নেপাল, ভুটান ও বাংলাদেশের সীমান্ত সংলগ্ন কৌশলগত এলাকায় অবস্থিত, যা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে মূল ভূখণ্ডের যোগাযোগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাজ্য সরকারের পক্ষ থেকে এই দায়িত্ব হস্তান্তরের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছে। কেন্দ্রীয় সরকার এখন এসব সড়কের রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করবে বলে জানা গেছে।
সামগ্রিক চিত্র
সব মিলিয়ে পশ্চিমবঙ্গে একদিকে প্রশাসনিক কঠোরতা ও অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ আলোচনায়, অন্যদিকে বিরোধী রাজনীতিতে কৌশলগত পুনর্বিন্যাসের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি সীমান্ত নিরাপত্তা ও অবকাঠামো নিয়ন্ত্রণেও কেন্দ্রীয় ভূমিকা বাড়ছে—যা রাজ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতায় নতুন সমীকরণ তৈরি করছে।