ঢাকা

কিচেন কেবিনেটের অস্তিত্ব স্বীকার, সদস্য না থাকার দাবি আসিফ মাহমুদের

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারে একটি ‘কিচেন কেবিনেট’ সক্রিয় ছিল বলে মন্তব্য করেছেন সেই সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও বর্তমানে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখপাত্র আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। তবে তিনি নিজে ওই কিচেন কেবিনেটের সদস্য ছিলেন না বলেও স্পষ্ট করেছেন।

মঙ্গলবার বিকেলে রাজধানীর বাংলামোটরে এনসিপির অস্থায়ী কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ কথা বলেন। ঝিনাইদহে এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় দলের অবস্থান তুলে ধরতে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। একই সঙ্গে সমসাময়িক রাজনৈতিক নানা বিষয়েও কথা বলেন দলটির নেতারা।

সংবাদ সম্মেলনের শেষ দিকে এক সাংবাদিক আসিফ মাহমুদের কাছে জানতে চান, তিনি অন্তর্বর্তী সরকারের কথিত ‘কিচেন কেবিনেটের’ সদস্য ছিলেন কি না। জবাবে তিনি বলেন, “কিচেন কেবিনেট ছিল। কিন্তু আমি সেটার সদস্য ছিলাম না।”

রাষ্ট্র পরিচালনায় ‘কিচেন কেবিনেট’ বলতে সাধারণত সরকারপ্রধানের ঘনিষ্ঠ ও অনানুষ্ঠানিক একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়, যারা গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী বিষয়ে পরামর্শ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণে ভূমিকা রাখে। যদিও এটি কোনো সাংবিধানিক বা আনুষ্ঠানিক কাঠামো নয়।

সম্প্রতি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেনের এক সাক্ষাৎকারের পর বিষয়টি নতুন করে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনায় আসে। একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দাবি করেন, অন্তর্বর্তী সরকার পরিচালনায় সাত সদস্যের একটি কিচেন কেবিনেট সক্রিয় ছিল এবং গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো মূলত সেখান থেকেই আসত। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মঙ্গলবার যমুনায়—সাবেক প্রধান উপদেষ্টার সরকারি বাসভবনে—তাঁদের বৈঠক হতো।

তৌহিদ হোসেন আরও অভিযোগ করেন, ওই গোষ্ঠীর অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ ও বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের কাজে প্রভাব বিস্তারের কারণে তিনি তিনবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। তবে সরকারের অস্বস্তির কথা বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তা বাস্তবায়ন করেননি।

২০২৪ সালের জুলাইয়ে ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হয়। সেই সরকারে ছাত্র-তরুণদের প্রতিনিধি হিসেবে উপদেষ্টা হিসেবে যোগ দেন আসিফ মাহমুদ সজীব ভুঁইয়া। প্রথমদিকে তিনি ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকলেও পরে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বও পালন করেন।

২০২৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে তিনি ও আরেক উপদেষ্টা মাহফুজ আলম অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সরে দাঁড়ান। পরে এনসিপির মুখপাত্রের দায়িত্ব নেন আসিফ মাহমুদ।

বাণিজ্যচুক্তি নিয়ে বিএনপির দিকে আঙুল

সংবাদ সম্মেলনে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে সই হওয়া বাণিজ্যচুক্তি নিয়েও কথা বলেন আসিফ মাহমুদ। তিনি দাবি করেন, ওই চুক্তির বিষয়ে এনসিপির কোনো মতামত নেওয়া হয়নি এবং প্রকৃতপক্ষে এটি বিএনপির সম্মতিতেই সম্পন্ন হয়েছিল।

তিনি বলেন, “আমরা মনে করি, এই চুক্তিটা বিএনপিই করেছে। কিন্তু সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে তাদেরই বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দিয়ে তারা এটা অন্তর্বর্তী সরকারের ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছে। এখন একটা রাজনৈতিক ব্লেম গেম চলছে।”

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন দিন আগে, অর্থাৎ ৯ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ওই বাণিজ্যচুক্তি সই করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। সে সময় জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান। চুক্তির নেপথ্যে তাঁর ভূমিকা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনা হয়।

এ বিষয়ে খলিলুর রহমান গত ৪ মার্চ সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি নির্বাচনের আগেই দেশের প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করেছিলেন এবং তাঁরাও এতে সম্মতি দিয়েছিলেন।

তবে জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দাবি করেন, এ ধরনের কোনো চুক্তি নিয়ে তাঁদের সঙ্গে আলোচনা হয়নি। পরবর্তী সময় রংপুরে এক অনুষ্ঠানে তিনি একই অভিযোগ পুনর্ব্যক্ত করেন।

এ প্রসঙ্গে আসিফ মাহমুদ বলেন, “যখন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি হয়, তখন আমি এনসিপির মুখপাত্র ছিলাম। ফলে আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানার সুযোগ ছিল না।”

তিনি আরও বলেন, “অনেকেই বলছেন, সব দলকে জানানো হয়েছিল। কিন্তু আমি দলের আহ্বায়কসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছি, চুক্তি নিয়ে এনসিপির মতামত নেওয়া হয়নি।”

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, “যদি চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী কোনো ধারা থাকে, তাহলে তা পর্যালোচনা করতে হবে। প্রয়োজন হলে বাতিল কিংবা সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।”

পশুর হাট, ঈদযাত্রা ও বিসিবি নিয়ে সমালোচনা

সংবাদ সম্মেলনে ঈদুল আজহা উপলক্ষে সারা দেশে পশুর হাটের ইজারা নিয়েও সমালোচনা করেন এনসিপির মুখপাত্র। তাঁর অভিযোগ, এবারের অধিকাংশ পশুর হাট বিএনপির স্থানীয় নেতা-কর্মীদের নিয়ন্ত্রণে গেছে।

তিনি বলেন, “যাঁরা হাটের ইজারা পাননি, তাঁরাও বিভিন্ন এলাকায় ছোট ছোট হাট বসিয়ে হাসিল আদায় করছেন। এমনকি মেট্রোস্টেশনের নিচেও হাটের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।”

ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও পরিবহন অব্যবস্থাপনার অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, সাধারণ মানুষ ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন।

বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডে (বিসিবি) পরিবারতন্ত্রের প্রভাব নিয়েও সমালোচনা করেন সাবেক ক্রীড়া উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ। তিনি বলেন, “মনে হচ্ছে আমরা একটা রাজতন্ত্রে বসবাস করছি। বিএনপির নেতারা বলেছিলেন, তাঁরা ক্রীড়াক্ষেত্রকে দলীয়করণ করবেন না। তাঁরা আসলে দলীয়করণ নয়, পরিবারকরণ করেছেন।”

সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী। এ সময় দলের যুগ্ম সদস্যসচিব আলাউদ্দীন মোহাম্মদ, এস এম সাইফ মোস্তাফিজসহ অন্য নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স