জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) দক্ষিণাঞ্চলীয় মুখ্য সংগঠক ও কুমিল্লা-৪ আসনের সংসদ সদস্য হাসনাত আবদুল্লাহ অভিযোগ করেছেন, বর্তমান বিএনপি সরকারও আওয়ামী লীগ সরকারের পথ অনুসরণ করে পুলিশ প্রশাসনকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করছে। একই সঙ্গে বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
সোমবার বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে ঝিনাইদহ শহরের পায়রা চত্বরে জেলা এনসিপি আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন হাসনাত আবদুল্লাহ। সম্প্রতি এনসিপির মুখ্য সমন্বয়ক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর ডিম নিক্ষেপের ঘটনায় ছাত্রদলের মামলাসহ সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে এ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়।
হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, গত কয়েক দিনে আইন বিভাগ ও পুলিশ প্রশাসনের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তাঁদের মনে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে—জুলাই অভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কতটা পরিবর্তন ঘটেছে। তিনি বলেন, “আমরা প্রত্যাশা করেছিলাম দলনিরপেক্ষ, আইনানুগ একটি পুলিশ বাহিনী গড়ে উঠবে। অথচ আমরা দেখছি, পুলিশ সদস্যরা প্রধানমন্ত্রীর সামনেই বক্তব্য দিচ্ছেন যে তাঁরা একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের চেতনায় উজ্জীবিত এবং সেই দলের আদর্শের সঙ্গে কোনো আপস করবেন না। কিন্তু পুলিশ তো কোনো রাজনৈতিক দলের হওয়ার কথা নয়।”
এনসিপির এই নেতা অভিযোগ করেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় যেভাবে স্থানীয় পর্যায়ে সরকারদলীয় সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে পুলিশকে “পেটোয়া বাহিনী” হিসেবে ব্যবহার করা হতো, বর্তমানেও একই ধরনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর ভাষায়, “পুলিশ সদস্যরা আমাদের কাছে বলেন, তাঁদের পদোন্নতি ও পদায়নের ভয় দেখিয়ে দলীয় লাঠিয়াল বাহিনী হিসেবে ব্যবহার করার চেষ্টা করা হচ্ছে।”
পুলিশ সদস্যদের উদ্দেশে সতর্কবার্তা দিয়ে হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, “জুলাইয়ের ঘটনা মনে রাখুন। আওয়ামী লীগের দলদাস হতে গিয়ে পুলিশের যে পরিণতি হয়েছিল, সেই দিকে আবার পুলিশকে ঠেলে দেবেন না।”
বিচার বিভাগ নিয়েও তীব্র সমালোচনা করেন তিনি। হাসনাত আবদুল্লাহ বলেন, বিএনপি সরকার বিচার বিভাগকে পুনরায় দলীয়করণের চেষ্টা করছে। তাঁর অভিযোগ, বিচার বিভাগীয় সচিবালয় বিলুপ্ত করে বিচার বিভাগকে আইন মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণাধীন করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “বিচার বিভাগের স্বাধীনতাকে হরণ করা হয়েছে। পদোন্নতি ও পদায়নকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে বিচারকদের স্বাধীনতাও কেড়ে নেওয়া হচ্ছে।”
আরও কঠোর ভাষায় তিনি বলেন, “আমার মনে হয় না বিচারকের রায় আদালতে নির্ধারিত হয়। সেটাও ঢাকা থেকে রিমোট কন্ট্রোলে পরিচালিত হয়। আইনমন্ত্রী যেমন রায় লিখে দেন, বিচারকেরা সেটাই আদালতে পড়ে শোনান।”
ঝিনাইদহে এনসিপি ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে সংঘর্ষ ও হামলার ঘটনাকে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিকল্পিত বলে দাবি করেন হাসনাত আবদুল্লাহ। তিনি বলেন, “এটা শুধু ঝিনাইদহের বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করলে ভুল হবে। কেন্দ্র থেকেই নির্দেশনা এসেছে।”
এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজা ও যুবশক্তির দুই নেতাকে গ্রেপ্তার এবং আদালতে পাঠানোর প্রক্রিয়া নিয়েও পুলিশের ভূমিকার সমালোচনা করেন তিনি। একই সঙ্গে নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারীর ওপর হামলার ঘটনায় মামলা নিতে পুলিশের দীর্ঘসূত্রতার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন। তাঁর অভিযোগ, প্রায় আট ঘণ্টা ধরে পুলিশ মামলা নেয়নি।
আসন্ন ঈদুল আজহা উপলক্ষে পশুর হাটের ইজারা নিয়েও মন্তব্য করেন এই সংসদ সদস্য। তিনি অভিযোগ করেন, “পশুর বাজারগুলো টেন্ডার ছাড়াই ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়েছে। ‘আমি, আমরা আর মামুরা’—এই সংস্কৃতির মাধ্যমে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে।”
সংবাদ সম্মেলনে আরও বক্তব্য দেন কেন্দ্রীয় যুবশক্তির সাংগঠনিক সম্পাদক রিফাত রশিদ, এনসিপির যুগ্ম সদস্যসচিব তারেক রেজাসহ দলটির কেন্দ্রীয় নেতারা। অনুষ্ঠান শেষে এনসিপি ও যুবশক্তির নেতা-কর্মীরা ঝিনাইদহ শহরে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের করেন।