ঢাকা

ভারত ও পাকিস্তানের নীরব কূটনৈতিক যোগাযোগ নিয়ে জল্পনা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
দীর্ঘদিনের বৈরিতা, সীমান্ত সংঘাত ও কূটনৈতিক উত্তেজনার পর ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে আবারও সংলাপের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। প্রকাশ্যে দুই দেশ এখনো কঠোর অবস্থান বজায় রাখলেও পর্দার আড়ালে নীরব যোগাযোগ, অনানুষ্ঠানিক বৈঠক এবং রাজনৈতিক বার্তাবিনিময় নতুন এক বাস্তবতার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

চলতি মাসের শুরুতে ২০২৫ সালের মে মাসে সংঘটিত ভারত–পাকিস্তান চার দিনের যুদ্ধের বার্ষিকী ঘিরে ভারতে ছিল জাতীয়তাবাদী আবহ। ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতারা সংঘাতকে ‘কৌশলগত বিজয়’ হিসেবে তুলে ধরেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমেও যুদ্ধজয়ের প্রচারণা দেখা যায়।

কিন্তু এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই ভারতের প্রভাবশালী হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (আরএসএস) সাধারণ সম্পাদক দত্তাত্রেয় হোসবলে এক ব্যতিক্রমী মন্তব্য করে আলোচনার জন্ম দেন। তিনি বলেন, পাকিস্তানের সঙ্গে ভারতের সংলাপের দরজা পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া উচিত নয় এবং আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকা প্রয়োজন।

আরএসএস নেতার মন্তব্যে রাজনৈতিক আলোড়ন

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপির আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে আরএসএসকে বিবেচনা করা হয়। ফলে দত্তাত্রেয় হোসবলরের বক্তব্যকে কেবল ব্যক্তিগত মত হিসেবে দেখছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

হোসবলে একটি ভারতীয় সংবাদ সংস্থাকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেন, “আমাদের আলোচনার দরজা বন্ধ করা উচিত নয়। আলোচনায় বসার জন্য সব সময় প্রস্তুত থাকা উচিত।”

এই বক্তব্য ভারতের রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। বিরোধী দলগুলো দাবি করে, এটি মোদি সরকারের দীর্ঘদিনের অবস্থানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কারণ, মোদি সরকার বারবার বলেছে—“সন্ত্রাস ও আলোচনা একসঙ্গে চলতে পারে না।”

ভারতের অভিযোগ, পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে কাশ্মীরসহ বিভিন্ন অঞ্চলে সক্রিয় সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন দিয়ে আসছে। ইসলামাবাদ অবশ্য এ অভিযোগ বরাবরই অস্বীকার করেছে।

২০২৫ সালের সংঘাতের প্রভাব এখনো স্পষ্ট

দুই দেশের মধ্যে সর্বশেষ বড় সংঘাত হয় ২০২৫ সালের মে মাসে। ভারত-নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরের পেহেলগামে পর্যটকদের ওপর হামলায় ২৬ জন নিহত হওয়ার পর পরিস্থিতি দ্রুত যুদ্ধের দিকে গড়ায়।

চার দিনের ওই সংঘাতে সীমান্তে গোলাবর্ষণ, বিমান হামলা ও সামরিক উত্তেজনা তৈরি হয়। যদিও পরে যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়, তবে উভয় দেশই নিজেদের বিজয়ী দাবি করে।

বিশ্লেষকদের মতে, ওই সংঘাতের পর দুই দেশই উপলব্ধি করেছে যে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের ঝুঁকি অত্যন্ত বিপজ্জনক। বিশেষ করে দুই দেশই পারমাণবিক শক্তিধর হওয়ায় সংঘাতের পরিণতি পুরো অঞ্চলকে অস্থিতিশীল করে তুলতে পারে।

নীরব যোগাযোগের ইঙ্গিত

আরএসএস নেতার মন্তব্যের পর পাকিস্তান ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া জানায়। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তাহির আন্দারাবি বলেন, ভারত সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো ইতিবাচক সংকেত দেয় কি না, সেটি তারা পর্যবেক্ষণ করবে।

এদিকে ভারতের সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল মনোজ নারাভানেও সংলাপের পক্ষে অবস্থান নেন। তিনি বলেন, সাধারণ জনগণের মধ্যে সম্পর্ক উন্নত হলে রাষ্ট্রীয় সম্পর্কও স্বাভাবিক হতে পারে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই বক্তব্যগুলো হঠাৎ করে আসেনি। বরং গত এক বছরে দুই দেশের মধ্যে একাধিক অনানুষ্ঠানিক বৈঠক হয়েছে।

পাকিস্তানের সাবেক কূটনীতিক জওহর সালিম জানিয়েছেন, মাসকাট, দোহা, থাইল্যান্ড ও লন্ডনে “ট্র্যাক-২” ও “ট্র্যাক-১.৫” পর্যায়ের কয়েকটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে। এসব বৈঠকে অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা, কূটনীতিক, সংসদ সদস্য ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

‘ট্র্যাক-২’ কূটনীতি কী?

আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে “ট্র্যাক-২” কূটনীতি বলতে অনানুষ্ঠানিক আলোচনাকে বোঝায়, যেখানে সরাসরি সরকার নয়, বরং সাবেক কর্মকর্তা, বুদ্ধিজীবী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

অন্যদিকে “ট্র্যাক-১.৫” সংলাপে বর্তমান ও সাবেক কর্মকর্তারা একসঙ্গে অংশ নেন। সাধারণত যখন দুই দেশের মধ্যে আনুষ্ঠানিক সংলাপ বন্ধ থাকে, তখন সম্পর্কের বরফ গলাতে এই ধরনের প্রক্রিয়া ব্যবহার করা হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও পাকিস্তানের বর্তমান পরিস্থিতিতে এই অনানুষ্ঠানিক সংলাপই ভবিষ্যতের সম্ভাব্য কূটনৈতিক যোগাযোগের ভিত্তি তৈরি করছে।

কেন এখন সংলাপের আলোচনা?

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে একাধিক ভূরাজনৈতিক কারণ রয়েছে।

১. বদলে যাওয়া আন্তর্জাতিক সমীকরণ

২০২৫ সালের সংঘাতের পর পাকিস্তান আবারও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কৌশলগত গুরুত্ব ফিরে পেয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মধ্যস্থতায় পাকিস্তানের সেনাপ্রধান আসিম মুনিরের ভূমিকা আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছে।

অন্যদিকে বাণিজ্য, অভিবাসন ও ভূরাজনৈতিক নানা কারণে ভারত-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক আগের তুলনায় কিছুটা চাপের মুখে পড়েছে।

জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইরফান নুরউদ্দিনের মতে, আগে যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ সমর্থন পাওয়ার কারণে ভারত পাকিস্তানকে অনেকটাই উপেক্ষা করতে পারত। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় সেই সুযোগ আগের মতো নেই।

২. যুদ্ধের ঝুঁকি

দুই দেশের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনা এখন আগের চেয়ে বেশি বিপজ্জনক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সীমান্ত সংঘাত দ্রুত বড় আকার ধারণ করতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এ কারণেই উভয় পক্ষ অন্তত যোগাযোগের পথ পুরোপুরি বন্ধ রাখতে চাইছে না।

তবু গভীর অবিশ্বাস রয়ে গেছে

যদিও সংলাপের ইঙ্গিত মিলছে, তবু দুই দেশের মধ্যে অবিশ্বাস এখনো গভীর।

সম্প্রতি ভারতের সেনাপ্রধান জেনারেল উপেন্দ্র দ্বিবেদী পাকিস্তানকে হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “সন্ত্রাসীদের আশ্রয় দেওয়া অব্যাহত থাকলে পাকিস্তানকে সিদ্ধান্ত নিতে হবে তারা ভূগোলের অংশ থাকবে, নাকি ইতিহাসের অংশ হয়ে যাবে।”

এর জবাবে পাকিস্তানের আন্তবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) ভারতের বক্তব্যকে “যুদ্ধোন্মাদ” বলে আখ্যা দেয়।

এ ছাড়া সিন্ধু নদের পানিবণ্টন চুক্তি নিয়েও দুই দেশের মধ্যে নতুন বিরোধ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক আদালতের একটি রায় পাকিস্তান স্বাগত জানালেও ভারত তা প্রত্যাখ্যান করেছে।

রাজনৈতিক সদিচ্ছার অভাব

বিশ্লেষকদের মতে, ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশেই এখনো এমন রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি হয়নি, যেখানে সরকারগুলো সহজে আনুষ্ঠানিক সংলাপে ফিরতে পারে।

ভারতে পাকিস্তানবিরোধী অবস্থান বিজেপির রাজনৈতিক কৌশলের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে পাকিস্তানেও ভারতবিরোধী মনোভাব এখনো শক্তিশালী।

ফলে দুই দেশ হয়তো আপাতত প্রকাশ্য আলোচনায় না গিয়ে “নীরব যোগাযোগ” বজায় রাখার পথই বেছে নিচ্ছে।

ভবিষ্যৎ কী হতে পারে?

বিশ্লেষকদের ধারণা, খুব দ্রুত পূর্ণাঙ্গ শান্তি আলোচনা শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে যোগাযোগের ছোট ছোট পথ খোলা রাখা হতে পারে বড় সংঘাত এড়ানোর একটি কৌশল।

পর্দার আড়ালের বৈঠক, সাবেক কর্মকর্তাদের বক্তব্য এবং আরএসএসের মতো প্রভাবশালী সংগঠনের সংলাপপন্থী অবস্থান—সব মিলিয়ে ভারত ও পাকিস্তান হয়তো ধীরে ধীরে নতুন বাস্তবতার দিকে এগোচ্ছে।

তবে সেই পথ কতটা টেকসই হবে, তা নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সীমান্ত পরিস্থিতি এবং দুই দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স