মক্কার উপকণ্ঠে বিস্তৃত ঐতিহাসিক আরাফাতের ময়দানে আজ এক অভূতপূর্ব আধ্যাত্মিক দৃশ্যের জন্ম দিয়েছে বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে আগত লাখো মুসলিম। পবিত্র হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন—জিলহজের নবম দিনে—সকাল থেকেই মিনার তাঁবু নগর থেকে দলে দলে হজযাত্রীরা আরাফাতের দিকে অগ্রসর হতে থাকেন। পার্থিব সব সম্পর্ক, ভোগ ও পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে তাঁরা একমাত্র স্রষ্টার দরবারে ক্ষমা ও রহমতের আশায় সমবেত হন।
সৌদি প্রেস এজেন্সির তথ্যমতে, এবার ১৬ লাখেরও বেশি হজযাত্রী আরাফাতের ময়দানে অবস্থান করছেন। সূর্যোদয়ের পর থেকেই শুরু হওয়া এই সমাগম ধীরে ধীরে এক বিশাল মানবসমুদ্রে রূপ নেয়, যেখানে জাতি–বর্ণ–ভাষার কোনো ভেদ নেই—শুধু আছে একটাই পরিচয়, তা হলো “আল্লাহর বান্দা”।
হাজিরা একযোগে উচ্চারণ করছেন—
“লাব্বাইক আল্লাহুম্মা লাব্বাইক…”
যার অর্থ, “আমি হাজির, হে আল্লাহ আমি হাজির, তোমার কোনো শরিক নেই, সব প্রশংসা ও নিয়ামত তোমারই।”
এই দিনটি ইসলামী বিশ্বাসে হজের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ ‘ওকুফে আরাফাহ’র দিন। নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন—“হজ হলো আরাফাহ”, যা এই দিনের অপরিহার্য গুরুত্বকে চূড়ান্তভাবে তুলে ধরে।
আধ্যাত্মিকতার শিখরে আরাফাত
ইসলামী ইতিহাস অনুযায়ী, ৬৩২ খ্রিষ্টাব্দে বিদায় হজের সময় মহানবী (সা.) এই আরাফাত ময়দানেই তাঁর ঐতিহাসিক ভাষণ প্রদান করেন। সেখানে তিনি ন্যায়বিচার, মানবসমতা, জীবন ও সম্পদের পবিত্রতা এবং সামাজিক ন্যায়ের ভিত্তি স্থাপনের আহ্বান জানান।
ইসলামি চিন্তাবিদদের মতে, এই দিনটি শুধু আনুষ্ঠানিক ইবাদত নয়; বরং এটি আত্মশুদ্ধি, আত্মসমালোচনা এবং নতুন করে জীবনের পথে ফিরে আসার এক বিরল সুযোগ। বিশ্বাস করা হয়, এই দিনে আল্লাহ তাঁর বান্দাদের সবচেয়ে বেশি ক্ষমা করেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন।
একটি হাদিসে বলা হয়েছে—
“আরাফাহর দিনে আল্লাহ যত মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন, তা অন্য কোনো দিনে দেন না।” (সহিহ মুসলিম)
দোয়া, কান্না ও আত্মসমর্পণের দিন
আরাফাতের বিস্তীর্ণ প্রান্তরে হাজিরা সারাদিন কাটান দোয়া, কোরআন তিলাওয়াত, জিকির ও কান্নার মধ্য দিয়ে। অনেকেই দুই হাত তুলে আল্লাহর কাছে জীবনের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করছেন, কেউ নীরবে চোখের পানি ফেলছেন, আবার কেউ গভীর আত্মসমর্পণে মগ্ন।
মক্কার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত এই উন্মুক্ত প্রান্তরের মধ্যে ‘জাবাল আল-রাহমাহ’ বা রহমতের পাহাড় বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। অনেক হাজি সেখানে গিয়ে ইবাদত করেন। ইসলামি ঐতিহ্য অনুযায়ী, এই স্থানটি আদম (আ.) ও হাওয়া (আ.)-এর পুনর্মিলনের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত।
দুপুরে মসজিদে নামিরা থেকে খুতবা প্রদান করা হবে, যেখানে ধর্মীয় দিকনির্দেশনা ও হজের তাৎপর্য তুলে ধরা হবে। এরপর হাজিরা জোহর ও আসরের নামাজ একত্রে কসর আদায় করবেন—নবী (সা.)-এর সুন্নাহ অনুসরণে।
সৌদি কর্তৃপক্ষের কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা
তীব্র গরম ও জনসমাগম নিয়ন্ত্রণে সৌদি কর্তৃপক্ষ ব্যাপক নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করেছে। ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি তাপমাত্রায় হিটস্ট্রোক প্রতিরোধে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বিশেষ সতর্কতা জারি করেছে। হাজিদের ছাতা ব্যবহার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং দীর্ঘ সময় রোদে না থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
ভিড় নিয়ন্ত্রণ, জরুরি চিকিৎসা সেবা, পরিবহন ব্যবস্থা এবং উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য বিশেষ বাহিনী মোতায়েন রয়েছে। পবিত্র স্থানগুলোর মধ্যে যাতায়াত সহজ করতে আধুনিক ট্রান্সপোর্ট নেটওয়ার্কও চালু রাখা হয়েছে।
আরাফাত থেকে মুজদালিফা ও পরবর্তী ধাপ
সূর্যাস্তের পর হাজিরা আরাফাত থেকে মুজদালিফার উদ্দেশে যাত্রা করবেন। সেখানে তারা মাগরিব ও এশার নামাজ একত্রে আদায় করবেন এবং খোলা আকাশের নিচে রাত যাপন করবেন—যা হজের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
পরদিন ফজরের নামাজ শেষে হাজিরা শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য সাতটি পাথর সংগ্রহ করবেন। এরপর তারা মিনায় ফিরে বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ, পশু কোরবানি, মাথা মুণ্ডন এবং ইহরাম থেকে মুক্ত হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করবেন।
হজের আধ্যাত্মিক পরিণতি
আরাফাতের এই দিনকে ইসলামে আত্মিক পুনর্জন্মের দিন হিসেবে দেখা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত মুসলমানরা এখানে একত্রিত হয়ে যে অভিজ্ঞতা লাভ করেন, তা তাঁদের জীবনের অন্যতম গভীর ও স্মরণীয় মুহূর্ত হয়ে থাকে।
পার্থিব জীবনের সব ভেদাভেদ ভুলে একমাত্র আল্লাহর দিকে মুখ ফেরানোর এই দিনটি মুসলিম উম্মাহর জন্য ঐক্য, ভ্রাতৃত্ব ও আত্মশুদ্ধির এক অনন্য প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়।