ঢাকা

জাপানে শক্তিশালী ভূমিকম্প: নিহত ১৩, বিপণিবিতানের ধ্বংসস্তূপে চলছে অনুসন্ধান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
জাপানের দক্ষিণাঞ্চলীয় কুমামোতো শহরের কাছে আঘাত হানা শক্তিশালী ৭ দশমিক ১ মাত্রার ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস, পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যরা দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছেন।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানী টোকিওতে নিজ কার্যালয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি হতাহতের সংখ্যা ও উদ্ধার কার্যক্রমের তথ্য জানান।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এখনো অনেক মানুষ ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকা পড়ে আছেন। তাদের উদ্ধারে সময়ের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে কাজ করছে উদ্ধারকারী দল। তিনি বলেন, যত বেশি সম্ভব মানুষকে জীবিত উদ্ধার করতে সরকার মাঠপর্যায়ে সব ধরনের সম্পদ ও সক্ষমতা কাজে লাগাচ্ছে।

বিপণিবিতানের ধ্বংসস্তূপে উদ্ধার অভিযান

ভূমিকম্পের সবচেয়ে বড় ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলোর একটি কুমামোতো অঞ্চলের একটি বিপণিবিতান। সেখানে আংশিক ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে বুধবার ভোরে আটজনকে জীবিত উদ্ধার করেছেন উদ্ধারকর্মীরা।

উদ্ধার অভিযান চলার সময় ভবনটিতে বিস্ফোরণের ঘটনাও ঘটে। ভূমিকম্প আঘাত হানার প্রায় এক ঘণ্টা পর ওই বিপণিবিতানে শক্তিশালী বিস্ফোরণ হয়। এতে ২০ বছর বয়সী দুই নারী নিহত হন।

স্থানীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, গ্যাসলাইনে বিস্ফোরণের কারণে এ ঘটনা ঘটে থাকতে পারে বলে ধারণা করছে কর্তৃপক্ষ। বর্তমানে উদ্ধারকারী দলগুলো ভবনের যেসব অংশ থেকে মানুষের সাহায্যের আওয়াজ পাওয়া যাচ্ছে, সেসব স্থানে বেশি গুরুত্ব দিয়ে অভিযান চালাচ্ছে।

তবে ভূমিকম্প ও বিস্ফোরণে প্রকৃত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ এখনো পুরোপুরি নির্ধারণ করা যায়নি।

নিখোঁজ বহু মানুষ, ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো

সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকের তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার পর্যন্ত ওই বিপণিবিতানে কর্মরত ২০ থেকে ৩০ জন কর্মী নিখোঁজ ছিলেন। এ ছাড়া নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজের একটি কারখানার চিমনি ধসে পড়ার পর আরও সাতজন নিখোঁজ রয়েছেন।

স্থানীয় এক সরকারি কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ভূমিকম্পে অন্তত চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসা নিচ্ছেন আরও কয়েক ডজন মানুষ।

ভূমিকম্পের প্রভাবে কুমামোতো অঞ্চলের হাজার হাজার বাড়িঘরের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা। বিভিন্ন এলাকায় ভূমিধসের আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।

আশ্রয়কেন্দ্রে হাজারো মানুষ

ভূমিকম্পের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বসবাসকারী প্রায় ২ লাখ ৬০ হাজার মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।

ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল কুমামোতো শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দক্ষিণে। মধ্য কিউশু অঞ্চলের অন্যতম বড় এই শহরে প্রায় ৭ লাখ মানুষের বসবাস।

কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ভূমিকম্পের তীব্র ঝাঁকুনি অনুভূত হওয়া এলাকাগুলোর বাসিন্দাদের আগামী এক সপ্তাহ সম্ভাব্য শক্তিশালী ভূমিকম্প ও ভূমিধসের বিষয়ে সতর্ক থাকতে হবে।

বিদ্যুৎহীন ৩৬ হাজারের বেশি পরিবার

ভূমিকম্পের পরও ৩৬ হাজারের বেশি পরিবার বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছে। এদিকে বুধবার কুমামোতো অঞ্চলের তাপমাত্রা প্রায় ৩৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস থাকায় তীব্র গরমে মানুষের হিটস্ট্রোকের ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

বিশেষ করে আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা শিশু, বয়স্ক ও অসুস্থ ব্যক্তিদের জন্য পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠেছে।

চাপের মুখে হাসপাতালের সেবা

ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থলের কাছাকাছি উকি শহরের একটি হাসপাতাল জানিয়েছে, বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের কারণে তাদের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে।

হাসপাতালের প্রশাসনিক বিভাগের প্রধান এনএইচকেকে বলেন, বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটা ফিল্ড হাসপাতাল বা যুদ্ধক্ষেত্রের অস্থায়ী হাসপাতালের মতো হয়ে গেছে।

উকি শহরের আরেকটি হাসপাতাল নতুন রোগী ভর্তি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়েছে। ভূমিকম্পের পর গুরুতর আহত তিনজনসহ মোট ৮৬ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়ার পর হাসপাতালটির পক্ষে নতুন জরুরি রোগী নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।

ট্রেনযাত্রীদেরও আহত হওয়ার খবর

রেল পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো জানিয়েছে, ভূমিকম্পের সময় দ্রুতগতির ট্রেনে থাকা কয়েকজন যাত্রীও আহত হয়েছেন।

তবে সবচেয়ে বড় ক্ষতির চিত্র দেখা গেছে কুমামোতো অঞ্চলের বৃহৎ বিপণিবিতান এইয়ন মলে। টেলিভিশন ফুটেজে দেখা যায়, বিস্ফোরণের তীব্রতায় প্রায় ২০০টি দোকান থাকা বিপণিবিতানের একটি অংশ পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে গেছে। চারদিকে ছড়িয়ে রয়েছে ইস্পাতের বিম ও ধ্বংসস্তূপ।

এইয়ন মলের একজন মুখপাত্র জানিয়েছেন, প্রথম ভূমিকম্পের পরপরই ক্রেতা ও কর্মীদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। তবে পরবর্তী সময়ে ঘটে যাওয়া বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনো জানা যায়নি।

উদ্ধারে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার

জাপান সরকার জানিয়েছে, বর্তমানে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা মানুষদের উদ্ধার করাই সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার। উদ্ধারকারী দলগুলো জীবিত কাউকে উদ্ধারের আশায় ধ্বংসস্তূপের প্রতিটি অংশ সতর্কতার সঙ্গে পরীক্ষা করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জাপান ভূমিকম্পপ্রবণ দেশ হওয়ায় দুর্যোগ মোকাবিলায় তাদের প্রস্তুতি শক্তিশালী হলেও, এবারের মতো শক্তিশালী ভূমিকম্পের পর উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রমে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স