ঢাকা

মিরপুরে যুবদল কর্মী নিহত, বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেন যুবদল নেতা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রাজধানীর মিরপুরে যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ হত্যাকাণ্ডের কারণ নিয়ে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য দিচ্ছে পুলিশ ও বিএনপির সহযোগী সংগঠনের নেতারা। পুলিশ বলছে, স্থানীয় আধিপত্য, ব্যবসা ও চাঁদাবাজি ঘিরে দ্বন্দ্বের জেরে এ হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করা হয়। তবে এ দাবি প্রত্যাখ্যান করে কাফরুল থানা যুবদলের সদস্যসচিব হাফিজুল ইসলাম বাবু বলছেন, এটি কোনো ব্যবসায়িক বিরোধ নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল।

বুধবার (২৯ জুলাই) রাজধানীর বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স ইউনিটির (ক্র্যাব) মিলনায়তনে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব অভিযোগ করেন হাফিজুল ইসলাম। তিনি এ হত্যাকাণ্ডের পেছনে কাফরুল থানা বিএনপির এক নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগ তোলেন। তাঁর দাবি, আসন্ন ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে প্রার্থিতা ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করেই বিরোধ তৈরি হয়।

চায়ের দোকানে গুলিতে নিহত হন ইউসুফ

গত শুক্রবার রাতে মিরপুর-১৩ নম্বরে হাফিজুল ইসলাম বাবুর বাড়ির পাশের একটি চায়ের দোকানে অস্ত্রধারীদের গুলিতে নিহত হন যুবদল কর্মী ইউসুফ আলী পারভেজ। এ ঘটনায় আরও দুজন আহত হন।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, হামলার মূল লক্ষ্য ছিলেন হাফিজুল ইসলাম বাবু। তবে গুলিতে তিনি অক্ষত থাকলেও ঘটনাস্থলে থাকা ইউসুফ আলী নিহত হন।

ঘটনার পর তদন্তে নেমে আটজনকে গ্রেপ্তার করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। গত সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ডিবি) শফিকুল ইসলাম জানান, হত্যাচেষ্টার পেছনে স্থানীয় বিরোধ কাজ করেছে।

পুলিশের দাবি: আধিপত্য ও ব্যবসায়িক বিরোধের জেরে হামলা

ডিএমপির পক্ষ থেকে বলা হয়, কাফরুল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক হাফিজুর রহমান হাফিজ ওরফে ‘সিএনজি হাফিজ’-এর সঙ্গে হাফিজুল ইসলাম বাবুর দীর্ঘদিনের বিরোধ ছিল।

পুলিশের তদন্তে উঠে আসা তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় ময়লার টেন্ডার, ফুটপাতের দোকান, ব্যবসায়িক নিয়ন্ত্রণ এবং একটি টিনশেড বাড়ির দখল নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। সেই বিরোধের জেরেই হাফিজুল ইসলামকে হত্যার পরিকল্পনা করা হয়েছিল বলে জানায় পুলিশ।

যুবদল নেতার অভিযোগ: রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের ষড়যন্ত্র

তবে পুলিশের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন হাফিজুল ইসলাম বাবু। সংবাদ সম্মেলনে তিনি দাবি করেন, ব্যবসা বা চাঁদাবাজির কোনো বিষয় নয়, তাঁকে রাজনৈতিকভাবে সরিয়ে দেওয়ার উদ্দেশ্যেই এই হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

তিনি অভিযোগ করেন, কাফরুল থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক সাব্বির দেওয়ান জনি তাঁকে হত্যার পরিকল্পনার মূল হোতা।

হাফিজুল ইসলাম বলেন, ৪ নম্বর ওয়ার্ডে কাউন্সিলর পদে তাঁর সম্ভাব্য প্রার্থিতা এবং জনপ্রিয়তাকে কেন্দ্র করে প্রতিপক্ষ ক্ষুব্ধ হয়ে তাঁকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে।

তিনি বলেন, “মূল মাস্টারমাইন্ড বা মূল ঘাতক সাব্বির দেওয়ান জনি। সে-ই অর্থদাতা বলে আমার সন্দেহ।” তবে এ অভিযোগের পক্ষে কোনো প্রমাণ উপস্থাপন করেননি তিনি। তাঁর বক্তব্য, বিষয়টি তদন্ত করে প্রমাণ করার দায়িত্ব রাষ্ট্র ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি দেখিয়ে প্রশ্ন

সংবাদ সম্মেলনে হাফিজুল ইসলাম পুলিশ গ্রেপ্তার করা দুই ব্যক্তি জিয়ারুল মোল্লা ও আবির হাওলাদারের সঙ্গে সাব্বির দেওয়ান জনির ছবি দেখান। তিনি প্রশ্ন তোলেন, সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ছবি থাকার পরও কেন সাব্বির দেওয়ানকে জিজ্ঞাসাবাদ বা গ্রেপ্তার করা হচ্ছে না।

পুলিশের বক্তব্যে থাকা ‘সিএনজি হাফিজ’ প্রসঙ্গেও নিজের ব্যাখ্যা দেন হাফিজুল ইসলাম। তিনি বলেন, স্থানীয় একটি মার্কেটের গ্যারেজ অবৈধভাবে ওই ব্যক্তিকে ভাড়া দেওয়া হয়েছিল এবং মার্কেটের সভাপতি হিসেবে সাব্বির দেওয়ান জনি অন্য সদস্যদের মতামত ছাড়াই তাঁকে সেখানে আশ্রয় দিয়েছেন। তাঁর দাবি, ওই স্থান থেকেই হত্যার পরিকল্পনা করা হয়।

২৫ লাখ টাকায় ভাড়াটে খুনির অভিযোগ

সংবাদ সম্মেলনে হাফিজুল ইসলাম আরও দাবি করেন, তাঁকে হত্যার জন্য ঢাকার বাইরে থেকে ২৫ লাখ টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনি ভাড়া করা হয়েছিল। তিনি বলেন, হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ‘সিএনজি হাফিজ’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন।

তাঁর অভিযোগ, প্রকৃত পরিকল্পনাকারীদের আড়াল করতে তদন্ত ভিন্ন দিকে নেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।

অভিযোগ অস্বীকার করলেন সাব্বির দেওয়ান

হাফিজুল ইসলামের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপি নেতা সাব্বির দেওয়ান। তিনি বলেন, হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই।

তিনি আরও বলেন, পুলিশের তদন্তে যদি তাঁর সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায়, তাহলে তিনি নিজেই আত্মসমর্পণ করবেন।

সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি থাকার বিষয়ে সাব্বির দেওয়ান বলেন, কারও সঙ্গে ছবি থাকলেই অপরাধে জড়িত থাকার প্রমাণ হয় না। ছবি তোলার সময় তাঁরা অপরাধের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না বলেও দাবি করেন তিনি।

চাঁদাবাজির অভিযোগ প্রত্যাখ্যান

এদিকে মিরপুর-১৩ এলাকায় স্যাটেলাইট টিভি কেবল, ইন্টারনেট ব্যবসা বা ফুটপাতের চাঁদাবাজির কোনো সিন্ডিকেট থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেন হাফিজুল ইসলাম।

তিনি বলেন, ওই এলাকায় তাঁর বা অন্য কারও এ ধরনের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। এমনকি সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকেও এখনো বর্জ্য সংগ্রহের কোনো দরপত্র আহ্বান করা হয়নি।

পুলিশের তদন্তে পেশাদার শুটারের তথ্য

পুলিশ জানিয়েছে, হাফিজুল ইসলাম বাবুকে হত্যার জন্য ২৫ লাখ টাকার চুক্তিতে মাগুরা ও ঝিনাইদহ থেকে চার পেশাদার শুটার ভাড়া করা হয়েছিল। তবে পরিকল্পিত হামলার সময় লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ইউসুফ আলী পারভেজ নিহত হন।

নিজের ও পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে হাফিজুল ইসলাম বলেন, তাঁকে হত্যার চেষ্টা দীর্ঘদিনের পরিকল্পনার অংশ। রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় নেতাদের সরিয়ে নিজেদের অবস্থান শক্ত করতেই এ হামলার পরিকল্পনা করা হয়েছে।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

সংবাদ সম্মেলন থেকে হাফিজুল ইসলাম আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান। পাশাপাশি হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও নির্দেশদাতাসহ জড়িত সবাইকে দ্রুত গ্রেপ্তারের দাবি করেন তিনি।

মিরপুরের এই হত্যাকাণ্ড ঘিরে এখন পর্যন্ত পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকলেও তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের ওপরই নির্ভর করছে ঘটনার চূড়ান্ত সত্যতা।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স