নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সঙ্গে বৈঠক করে ৯ দফা দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল, এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা এবং নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ না দেওয়াসহ বিভিন্ন দাবি জানিয়েছে দলটি।
বুধবার (২৯ জুলাই) জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠক করে। বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি তাঁদের দাবিগুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সক্ষমতা ও স্বাধীন ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি।
বৈঠকে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ছাড়াও নির্বাচন কমিশনার আবদুর রহমানেল মাছউদ, তাহমিদা আহমদ এবং নির্বাচন কমিশনের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
সামসুল আলমের নিয়োগ বাতিলের দাবি
বৈঠকে আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ। জামায়াতের দাবি, একজন রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া নিরপেক্ষ নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রশ্ন তৈরি করে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সামসুল আলম বিএনপির নির্বাচনী আসন পুনর্নির্ধারণ কমিটির সদস্য ছিলেন। এ কারণে তাঁর মতো রাজনৈতিক সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ইসিতে দায়িত্ব পালন করা নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। এখানে রাজনৈতিক পরিচয় বা সংশ্লিষ্টতা থাকা ব্যক্তির নিয়োগ নির্বাচন পরিচালনার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই তাঁর চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করার দাবি জানানো হয়েছে।
জামায়াতের এই নেতা বলেন, ইসি তাঁদের জানিয়েছে, সামসুল আলমের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি তারা জানত না এবং সরকার চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়েছে। এর জবাবে জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, নিয়োগের বিষয়ে ইসি আপত্তি জানাতে পারত।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ইসির বক্তব্যে প্রতিষ্ঠানটির অসহায়ত্ব ও অক্ষমতার বিষয়টি ফুটে উঠেছে।
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে আপত্তি
স্থানীয় সরকার নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রার্থী হওয়ার অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব নিয়েও আপত্তি জানিয়েছে জামায়াত।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, দেশের স্থানীয় সরকার নির্বাচনের দীর্ঘ ইতিহাসে স্কুল-কলেজের শিক্ষকরা অংশ নিয়ে আসছেন। জাতীয় নির্বাচনে এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে এমন বিধিনিষেধ নেই। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তাঁদের অংশগ্রহণ বন্ধ করা বৈষম্যমূলক হবে।
তিনি বলেন, একই নাগরিকের জন্য এক ধরনের নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ থাকবে, অন্য ধরনের নির্বাচনে থাকবে না—এটি সংবিধান প্রদত্ত নাগরিক অধিকারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
জামায়াতের আপত্তির বিষয়টি ইসি আলোচনা করে দেখবে বলে জানিয়েছে বলেও জানান তিনি।
নিষিদ্ধ দলের পদধারীদের নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণার দাবি
জামায়াত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দলের পদধারী নেতাদের অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করার দাবিও জানিয়েছে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নির্বাচনে অংশগ্রহণ করাও একটি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। তাই নিষিদ্ধ দলের পদ-পদবিধারী ব্যক্তিদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
এ ছাড়া বিভিন্ন স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে বর্তমানে দায়িত্ব পালন করা রাজনৈতিক ব্যক্তিদেরও নির্বাচনে অযোগ্য ঘোষণা করার দাবি জানিয়েছে দলটি।
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেলের ভাষ্য, প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করে পরে নির্বাচনে প্রার্থী হলে নির্বাচন নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়। তাঁর মতে, প্রশাসক পদে থেকে কয়েক মাস দায়িত্ব পালন করে নির্বাচনে অংশ নেওয়া প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
ইসির নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন মন্ত্রীর বক্তব্য এবং চট্টগ্রাম-২ আসনে বিএনপির প্রার্থী সরোয়ার আলমগীরের গেজেট প্রকাশের বিষয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়েছে বলে জানান মিয়া গোলাম পরওয়ার।
তিনি অভিযোগ করেন, সর্বোচ্চ আদালতের রায় ঘোষণার দিনই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে এবং স্বাক্ষর করা আদেশের জন্য অপেক্ষা করেনি নির্বাচন কমিশন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এ ধরনের ঘটনায় মনে হয়েছে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক চাপের মধ্যে ছিল।
তিনি বলেন, ইসি সরাসরি এ কথা স্বীকার করবে না, তবে তাদের আচরণ ও বক্তব্যে চাপের বিষয়টি বোঝা যায়।
‘স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দায়িত্ব পালনের দাবি’
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, নির্বাচন কমিশন দেশের একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান। নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য সংবিধান অনুযায়ী কমিশনকে বড় ধরনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।
তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে কমিশন সেই দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে পারছে না বলে দাবি করেন তিনি।
জামায়াতের ৯ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে
জামায়াতের পক্ষ থেকে বৈঠকে উত্থাপিত দাবিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য—
ইসি সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব মো. সামসুল আলমের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল;
এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণার প্রস্তাব পুনর্বিবেচনা;
কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের পদধারী নেতাদের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ বাতিল;
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক প্রশাসকদের নির্বাচনে অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা;
নির্বাচন কমিশনের স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা।
বৈঠকে জামায়াতের প্রতিনিধিদলে আরও উপস্থিত ছিলেন দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ, কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য জসিম উদ্দীন সরকার, শিশির মোহাম্মদ মনিরসহ অন্য নেতারা।
নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জামায়াতের দাবিগুলো পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে।