ঢাকা

হরমুজের টোল ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রস্তাব, ইরানের সঙ্গে আলোচনায় ওমান

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
হরমুজ প্রণালির নিরাপদ পরিচালনা, আঞ্চলিক ব্যবস্থাপনা এবং জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছায় টোল আদায়ের বিষয়ে ইরানকে একটি নতুন প্রস্তাব দিয়েছে ওমান। মঙ্গলবার (২৮ জুলাই) আরব উপসাগরীয় একটি সূত্রের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স এ তথ্য জানিয়েছে।

সূত্রটি জানিয়েছে, ওমানের প্রস্তাবের প্রতি উপসাগরীয় দেশগুলো সমর্থন জানিয়েছে। পরিকল্পনাটি গত শনিবার ইরানের কাছে পাঠানো হয়েছে।

প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকবে না। একই সঙ্গে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক টোল আরোপের ব্যবস্থাও থাকবে না।

মালাক্কা প্রণালির মডেলে ব্যবস্থাপনার প্রস্তাব

ওমানের পরিকল্পনাটি মূলত এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ মালাক্কা প্রণালির ব্যবস্থাপনা কাঠামোর আদলে তৈরি করা হয়েছে। ভারত মহাসাগর ও প্রশান্ত মহাসাগরকে সংযুক্তকারী মালাক্কা প্রণালি ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুর যৌথভাবে পরিচালনা করে।

এই ব্যবস্থায় জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছ থেকে স্বেচ্ছাভিত্তিতে অর্থ নেওয়া হয়। সংগৃহীত অর্থ ব্যয় করা হয় নৌ নিরাপত্তা, পরিবেশ সুরক্ষা, অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রমে।

ওমানের প্রস্তাবেও হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, নৌ চলাচলের স্বাভাবিকতা এবং আঞ্চলিক সহযোগিতা নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

ইরান, সৌদি ও ওমানের মধ্যে আলোচনা

হরমুজ প্রণালি ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের প্রস্তাবের বিষয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি সোমবার সৌদি আরব ও ওমানের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, আলোচনায় আরাগচি মধ্যপ্রাচ্যে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং হরমুজ প্রণালিতে তৈরি হওয়া নিরাপত্তাহীনতা দূর করতে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও যৌথ কূটনৈতিক প্রচেষ্টার ওপর গুরুত্ব দেন।

বিবৃতিতে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের কারণে সৃষ্ট উত্তেজনা কমাতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি। বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই সরু নৌপথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে প্রণালিতে যেকোনো ধরনের অস্থিরতা আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার ও বৈশ্বিক বাণিজ্যে বড় প্রভাব ফেলে।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর তেহরান হরমুজ প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ করে দেয়। পরে যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা হলে প্রণালিটি আংশিকভাবে চালু হয়।

তবে হরমুজ প্রণালিতে ইরান জাহাজে হামলা চালিয়েছে—এমন অভিযোগ তুলে চলতি মাসের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্র আবার সামরিক অভিযান শুরু করে। এর ফলে আগের সমঝোতা ভেস্তে যায় এবং হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচল আবারও সীমিত হয়ে পড়ে।

ইরানে টানা ১৩ দিন হামলার পর শুক্রবার থেকে সামরিক কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। এর মধ্যেই হরমুজ প্রণালির ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের নতুন উদ্যোগের বিষয়টি সামনে এসেছে।

প্রস্তাব নিয়ে আশাবাদ ও সংশয়

ওমানের এই উদ্যোগকে ইতিবাচক পদক্ষেপ হিসেবে দেখছেন অনেক বিশ্লেষক। তবে ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে।

কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক পল মাসগ্রেভ আল–জাজিরাকে বলেন, প্রস্তাবটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—ইরান এতে সম্মত হবে কি না।

তিনি বলেন, এমন একটি ব্যবস্থাপনা কাঠামো ইরানের অর্থনীতির ওপর থাকা চাপ কমাতে পারে। দীর্ঘদিন হরমুজ প্রণালি বন্ধ বা সীমিত থাকায় সাধারণ ইরানিরা বড় ধরনের ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। তাই প্রণালিটি আবার স্বাভাবিক করা প্রয়োজন বলে দেশটির জনগণের মধ্যেও চাহিদা রয়েছে।

তবে ইরান সরকারের কট্টরপন্থী অংশ এই ধরনের আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাপনায় কতটা আগ্রহী হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন বলে মন্তব্য করেন পল মাসগ্রেভ।

আঞ্চলিক উত্তেজনা কমানোর কূটনৈতিক উদ্যোগ

বিশ্লেষকদের মতে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওমানের উদ্যোগ কেবল নৌ চলাচল স্বাভাবিক করার বিষয় নয়, বরং উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা কমানোর একটি কূটনৈতিক প্রচেষ্টাও। ইরান, উপসাগরীয় দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমঝোতা হলে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুটে স্থিতিশীলতা ফিরতে পারে।

তবে এ পরিকল্পনার সফলতা অনেকাংশেই নির্ভর করবে ইরানের অবস্থান এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে পারস্পরিক আস্থার ওপর।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স