ধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র, সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও বেড়েছে। ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে ইরাকে যৌথ হামলা চালিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরব। ওয়াশিংটন ও রিয়াদের দাবি, মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন বাহিনী এবং সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় ইরান-সমর্থিত হামলার জবাব হিসেবেই এ অভিযান চালানো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, গত ৭২ ঘণ্টায় ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) নির্দেশনায় চালানো ৩০টির বেশি ড্রোন হামলার জবাবে ইরাকের পূর্বাঞ্চলে ইরানপন্থী গোষ্ঠীগুলোর একাধিক অস্ত্র ও রসদভান্ডারে হামলা চালানো হয়েছে।
এর আগে যুক্তরাষ্ট্র অভিযোগ করে, মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে মার্কিন ঘাঁটি ও সেনাদের লক্ষ্য করে ইরান আকস্মিক ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়েছে। তবে মার্কিন সামরিক বাহিনী দাবি করেছে, এসব ক্ষেপণাস্ত্র সফলভাবে প্রতিহত করা হয়েছে।
সৌদি জ্বালানি স্থাপনায় ড্রোন হামলার অভিযোগ
সৌদি আরব জানিয়েছে, দেশটির পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশ ও রিয়াদ অঞ্চলের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার জন্য পাঠানো কয়েকটি ড্রোন ধ্বংস করেছে তাদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা।
সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র তুর্কি আল–মালিকি বলেন, এসব ড্রোন ইরান থেকে নয়, বরং ইরাকের ভূখণ্ড থেকে ইরানপন্থী মিলিশিয়ারা পাঠিয়েছিল।
তিনি জানান, জ্বালানি অবকাঠামো রক্ষায় সৌদি বাহিনী যুক্তরাষ্ট্রের সেন্টকমের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করেছে এবং হামলার জবাব হিসেবে ইরাকে থাকা সংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হয়েছে।
তবে সৌদি আরবে কোনো ধরনের হামলায় ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তেহরান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া এক বক্তব্যে দেশটির এক সামরিক কর্মকর্তা বলেন, সৌদি আরবের লক্ষ্যবস্তুতে হামলার সঙ্গে ইরানের সম্পৃক্ততার অভিযোগ ‘দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান’ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, এ অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থের বিরুদ্ধে সংঘটিত যেকোনো পদক্ষেপের দায় ইরানের ওপর চাপানো একটি বড় ভুল। তাঁর মতে, আঞ্চলিক পরিস্থিতি সম্পর্কে যথাযথ ধারণার অভাব থেকেই এমন অভিযোগ করা হচ্ছে।
ইরানের সতর্কবার্তা: হরমুজ নিয়ন্ত্রণে ‘যেকোনো পদক্ষেপ’
এদিকে ইরানের উপপররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম ঘারিবাবাদি সতর্ক করে বলেছেন, হরমুজ প্রণালির ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে তেহরান প্রয়োজন হলে যুদ্ধ আবার শুরু করাসহ ‘যেকোনো ধরনের পদক্ষেপ’ নিতে পারে।
বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহন পথ হরমুজ প্রণালি দিয়ে বৈশ্বিক জ্বালানি বাণিজ্যের বড় একটি অংশ পরিচালিত হয়। এই নৌপথে অস্থিতিশীলতা তৈরি হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
সেন্টকমের দাবি: ৬০০টির বেশি হামলার চেষ্টা
সেন্টকমের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইরাকের ইরানপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো মার্কিন নাগরিক ও স্থাপনা লক্ষ্য করে ৬০০টির বেশি হামলার চেষ্টা করেছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনী এসব হামলাকে ‘অযৌক্তিক’ ও ‘ব্যর্থ’ বলে উল্লেখ করেছে। একই সঙ্গে আইআরজিসি ও তাদের আঞ্চলিক সহযোগীদের এসব কার্যক্রম বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছে।
সেন্টকমের ভাষ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের সামরিক অভিযান ছিল আত্মরক্ষামূলক পদক্ষেপ এবং এর উদ্দেশ্য ছিল ভবিষ্যৎ হামলা প্রতিহত করা।
ইরাকে পিএমএফ সদর দপ্তরে বিস্ফোরণ
এদিকে ইরাকের দক্ষিণাঞ্চলীয় বসরা প্রদেশে ইরানপন্থী সশস্ত্র জোট পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের (পিএমএফ) সদর দপ্তরে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
একটি নিরাপত্তা সূত্র আল–জাজিরাকে জানিয়েছে, বিস্ঘটনার কারণ ও হতাহতের বিষয়ে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি।
তবে ইরাকের স্থানীয় সংবাদমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, ওই বিমান হামলায় পিএমএফের দুই সদস্য আহত হয়েছেন।
পিএমএফ, যা হাশদ আল–শাবি নামেও পরিচিত, ইরাকের বিভিন্ন সশস্ত্র গোষ্ঠীর একটি জোট। এর অনেক সদস্য ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখে।
আঞ্চলিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়ছে
বিশ্লেষকদের মতে, ইরাকের মাটিতে যুক্তরাষ্ট্র ও সৌদি আরবের যৌথ হামলা এবং এর পাল্টা প্রতিক্রিয়া মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা বাড়াতে পারে।
ইরান দীর্ঘদিন ধরে ইরাক, সিরিয়া, লেবানন ও ইয়েমেনে নিজেদের ঘনিষ্ঠ সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে আঞ্চলিক প্রভাব ধরে রেখেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা এসব গোষ্ঠীকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো এমন এক সময়ে ঘটছে, যখন হরমুজ প্রণালির নিরাপত্তা, ইরানের সামরিক সক্ষমতা এবং যুক্তরাষ্ট্র–ইরান উত্তেজনা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ফলে সামনের দিনগুলোতে কূটনৈতিক উদ্যোগের পাশাপাশি সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত থাকার আশঙ্কা করছেন পর্যবেক্ষকেরা।