ভারতের মধ্যপ্রদেশের রাজধানী ভোপালে মডেল ও অভিনেত্রী Tisha Sharma–র মৃত্যু ঘিরে দেশজুড়ে তীব্র বিতর্ক ও রহস্য তৈরি হয়েছে। ১২ মে শ্বশুরবাড়ি থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধারের পর প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি যৌতুক নির্যাতনের জেরে পরিকল্পিত হত্যা, নাকি আত্মহত্যা?
৩৩ বছর বয়সী এই অভিনেত্রীর মৃত্যু এখন শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়, বরং ভারতজুড়ে আলোচিত একটি উচ্চপ্রোফাইল ফৌজদারি তদন্তে পরিণত হয়েছে।
পাঁচ মাসের সংসার, তারপর মৃত্যু
তিশা শর্মার বিয়ে হয়েছিল ভোপালের আইনজীবী Samarth Singh–এর সঙ্গে। বিয়ের মাত্র পাঁচ মাসের মাথায় তিনি শ্বশুরবাড়ি থেকেই মৃত অবস্থায় পাওয়া যান।
ঘটনার পরপরই তিশার পরিবার অভিযোগ করে, যৌতুকের দাবিতে তাঁকে দীর্ঘদিন ধরে মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন করা হতো এবং শেষ পর্যন্ত পরিকল্পিতভাবে হত্যা করা হয়েছে।
অন্যদিকে শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, তিশা মানসিকভাবে অসুস্থ ছিলেন এবং এটি আত্মহত্যার ঘটনা।
তদন্তে সিবিআই, ডিজিটাল ফরেনসিক বিশ্লেষণ
ঘটনাটি গুরুত্ব বিবেচনায় তদন্তে যুক্ত হয়েছে ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা Central Bureau of Investigation (সিবিআই)।
তদন্তে ব্যবহার করা হচ্ছে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পদ্ধতি, যার মধ্যে রয়েছে—
সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ
মোবাইল কল ডাটা রেকর্ড
ওয়াই-ফাই ও ইন্টারনেট লগ
স্মার্ট ডিভাইস ফরেনসিক
ঘটনাস্থলের ডিজিটাল ম্যাপিং ও ‘টানেল ভিউ টেকনিক’
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, সিবিআই ভোপালের শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে সম্পূর্ণ ডিজিটাল রিকনস্ট্রাকশন সম্পন্ন করেছে।
গ্রেপ্তার স্বামী ও সাবেক বিচারক শাশুড়ি
তদন্তে ইতোমধ্যে বড় অগ্রগতি এসেছে। পুলিশ জানিয়েছে—
সমর্থ সিং গ্রেপ্তার হয়েছেন
তাঁর মা, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক Giribala Singh–কে গ্রেপ্তার করা হয়েছে
আদালত থেকে গিরিবালার আগাম জামিন মিললেও সমর্থের জামিন আবেদন খারিজ করা হয়েছে
তদন্ত কর্মকর্তাদের মতে, যৌতুক নির্যাতন ও পারিবারিক চাপের অভিযোগ কেন্দ্র করেই মামলা এগোচ্ছে।
পরিবারের অভিযোগ: “জীবন্ত নরক হয়ে উঠেছিল জীবন”
তিশার পরিবার দাবি করেছে, বিয়ের পর থেকেই নির্যাতনের মাত্রা বাড়তে থাকে। তাঁদের অভিযোগ অনুযায়ী—
যৌতুক নিয়ে নিয়মিত অপমান
চরিত্র নিয়ে সন্দেহ ও অপবাদ
গর্ভধারণ ও গর্ভপাত ঘিরে চাপ
মানসিক ও শারীরিক নির্যাতন
একটি হোয়াটসঅ্যাপ বার্তায় তিশা লিখেছিলেন—“আমার জীবনটা জীবন্ত নরক হয়ে গেছে।”
পরিবার আরও দাবি করেছে, তিশাকে গর্ভপাত করতে বাধ্য করা হয়েছিল। যদিও শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে এসব অভিযোগ অস্বীকার করা হয়েছে।
মৃত্যু ঘিরে শেষ মুহূর্তের রহস্য
তিশার বাবা নবনিধি শর্মার মতে, মৃত্যুর দিন রাত ৯টা ৪১ মিনিটে তিশা শেষবার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন। এরপর হঠাৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
২০ মিনিট পর শাশুড়ি ফোন ধরে জানান, তিশা আর বেঁচে নেই—এই সময় ব্যবধান নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে পরিবার।
ময়নাতদন্ত রিপোর্ট বনাম পরিবারের সন্দেহ
প্রাথমিক ময়নাতদন্তে বলা হয়েছে, গলায় ফাঁসের কারণে মৃত্যু হয়েছে। তবে শরীরে আঘাতের চিহ্ন পাওয়ায় নতুন সন্দেহ তৈরি হয়।
পরিবারের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে আদালত দ্বিতীয় ময়নাতদন্তের নির্দেশ দিয়েছে।
“আত্মহত্যা” দাবি বনাম “হত্যা” অভিযোগ
শ্বশুরবাড়ির পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, তিশা মানসিক সমস্যায় ভুগছিলেন এবং আত্মহত্যা করেছেন।
তবে পরিবারের অভিযোগ, এটি পরিকল্পিত হত্যা এবং প্রভাবশালী সামাজিক অবস্থানের কারণে তদন্ত প্রভাবিত করার চেষ্টা চলছে।
পুলিশের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে আত্মহত্যার সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে, তবে তদন্ত এখনো চলমান।
সামাজিক মর্যাদা ও জনমনে আগ্রহ
তিশা শর্মা ২০১২ সালে ‘মিস পুনে’ খেতাব জিতেছিলেন। তিনি বিজ্ঞাপন ও আঞ্চলিক চলচ্চিত্রে কাজ করেছেন এবং পরে করপোরেট চাকরিতেও যুক্ত ছিলেন।
অন্যদিকে তাঁর শ্বশুর পরিবার বিচার বিভাগে উচ্চ মর্যাদার সঙ্গে যুক্ত থাকায় ঘটনাটি আরও বেশি আলোচিত হয়েছে।
গিরিবালা সিংয়ের মন্তব্যে বিতর্ক
সাবেক বিচারক গিরিবালা সিং একাধিক সংবাদমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়ে দাবি করেন, তিশার মানসিক সমস্যা ছিল। পরে তাঁর কিছু মন্তব্যকে ঘিরে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়, যেখানে তাঁকে তিশার চরিত্র নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
পরিবার এসব বক্তব্যকে “মৃত ব্যক্তির চরিত্রহনন” বলে আখ্যা দিয়েছে।
তদন্তের মোড় ঘোরাতে সিবিআইয়ের প্রবেশ
মধ্যপ্রদেশ সরকার মামলাটি এখন সিবিআইয়ের হাতে তুলে দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন, তদন্তে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতেই কেন্দ্রীয় সংস্থার সহায়তা নেওয়া হয়েছে।
পরিবারের পক্ষ থেকে আশা করা হচ্ছে, এবার প্রকৃত সত্য সামনে আসবে।
বিচার না রহস্য—প্রশ্ন রয়ে গেছে
যৌতুক নির্যাতনের অভিযোগ, পারিবারিক মর্যাদা, ডিজিটাল ফরেনসিক তদন্ত এবং একাধিক পরস্পরবিরোধী বক্তব্য—সব মিলিয়ে Tisha Sharma–র মৃত্যু এখনো সম্পূর্ণ অমীমাংসিত।
এটি আত্মহত্যা, নাকি পরিকল্পিত হত্যা—এই প্রশ্নের উত্তর এখনো ঝুলে আছে তদন্তের হাতে। সিবিআইয়ের চূড়ান্ত রিপোর্টই হয়তো নির্ধারণ করবে এই মৃত্যু একটি ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি, নাকি একটি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের ফলাফল।