তুরস্কের রাজধানী আঙ্কারায় ন্যাটো সম্মেলনে যোগ দেওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ইরানের সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টা থেকে নিরাপদে সরিয়ে নিতে নজিরবিহীন এক গোপন অভিযান চালানো হয়েছিল। তবে এ অভিযানের পেছনে যে গোয়েন্দা তথ্য কাজ করেছিল, সেটি নিয়ে শুরু থেকেই মার্কিন গোয়েন্দা মহলে সংশয় ছিল বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
পত্রিকাটির প্রতিবেদনে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক কয়েকজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, ট্রাম্পকে হত্যার সম্ভাব্য ইরানি পরিকল্পনা সম্পর্কে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রকে যে গোয়েন্দা তথ্য দিয়েছিল, সেটিকে সিআইএর বিশ্লেষকেরা খুব শক্তিশালী বা নির্ভরযোগ্য মনে করেননি। বরং সংস্থাটির একাংশ ওই তথ্যকে নিম্নমানের বা দুর্বল গোয়েন্দা তথ্য হিসেবে বিবেচনা করেছিল এবং নিজেদের সন্দেহ ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদেরও জানিয়েছিল।
তারপরও মার্কিন সিক্রেট সার্ভিস কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি। সম্ভাব্য হুমকির কথা মাথায় রেখে ট্রাম্পের নিয়মিত উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে তাঁকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হয় অন্য একটি বিশেষ উড়োজাহাজে। শেষ পর্যন্ত এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের পাহারায় সেই উড়োজাহাজে করে ট্রাম্পকে তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে নেওয়া হয়।
ঘটনাটি প্রকাশ্যে আসার পর এখন মূল প্রশ্ন উঠেছে—গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে মার্কিন গোয়েন্দাদেরই যখন সংশয় ছিল, তখন কেন ট্রাম্পকে এভাবে গোপনে সরিয়ে নেওয়া হলো? আর ইসরায়েল যে তথ্য দিয়েছিল, তার পেছনে শুধুই নিরাপত্তা সতর্কতা ছিল, নাকি মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে ওয়াশিংটনের নীতিতে প্রভাব বিস্তারের কোনো কৌশলও কাজ করেছিল?
ইসরায়েলের তথ্য নিয়ে সিআইএর সংশয়
দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার গোয়েন্দা তথ্য ইসরায়েল সরকারের পক্ষ থেকে সিআইএর কাছে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু মার্কিন গোয়েন্দা বিশ্লেষকেরা ওই তথ্যকে খুব বেশি জোরালো বলে মনে করেননি।
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক কর্মকর্তা জানান, তথ্যটি মূলত ইসরায়েল-ভিত্তিক গোয়েন্দা উৎস থেকে পাওয়া। যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কোনো সূত্র থেকে এর সমর্থন পাওয়া যায়নি। ফলে মার্কিন গোয়েন্দা মহলে তথ্যটির নির্ভরযোগ্যতার মাত্রা খুবই কম হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল।
অন্য এক কর্মকর্তা জানান, সিআইএ তাদের বিশ্লেষণ ও সংশয়ের বিষয়টি ট্রাম্প প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্পষ্টভাবে জানিয়েছিল।
অর্থাৎ, ট্রাম্পের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সম্ভাব্য হুমকিটি পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া হয়নি, কিন্তু সেটিকে এমন একটি নির্ভরযোগ্য ও নিশ্চিত গোয়েন্দা তথ্য হিসেবেও দেখা হয়নি, যার ভিত্তিতে অবধারিত হামলার আশঙ্কা করা যায়।
তারপরও সিক্রেট সার্ভিসের সিদ্ধান্ত ছিল—ঝুঁকি নেওয়া যাবে না।
এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে নেমে গোপন উড়োজাহাজে
৮ জুলাই আঙ্কারায় ন্যাটো শীর্ষ সম্মেলন শেষে তুরস্ক ছাড়ার সময় ট্রাম্পের গতিবিধি কঠোরভাবে গোপন রাখার সিদ্ধান্ত নেয় হোয়াইট হাউস। এর আগে ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছিল, ট্রাম্পকে কীভাবে তুরস্ক থেকে সরিয়ে নেওয়া হবে, তা নিয়ে নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর মধ্যে বিশেষ পরিকল্পনা করা হয়েছিল।
প্রথমে ট্রাম্প তাঁর নিয়মিত উড়োজাহাজ এয়ারফোর্স ওয়ানে ওঠেন। কিন্তু এরপর ঘটে অপ্রত্যাশিত ঘটনা।
ট্রাম্প এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে নেমে আসেন এবং বিমানবন্দরের একটি ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে থেকে অন্য একটি উড়োজাহাজে চলে যান। সেই বিকল্প উড়োজাহাজটি ছিল এয়ারফোর্স সি-৩২এ—মার্কিন প্রেসিডেন্ট ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের পরিবহনে ব্যবহৃত বিশেষ সামরিক উড়োজাহাজ।
ট্রাম্প এবং তাঁর অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ কয়েকজন সহযোগীকে নিয়ে সি-৩২এ গোপনে আঙ্কারা ত্যাগ করে যুক্তরাজ্যের উদ্দেশে রওনা হয়।
পরে যুক্তরাষ্ট্রের দুই কর্মকর্তা এবং ওয়াশিংটন পোস্ট কর্তৃক পর্যালোচনা করা নথিপত্রের তথ্য অনুযায়ী, তুরস্ক থেকে যুক্তরাজ্যের মিলডেনহল বিমানঘাঁটিতে যাওয়ার সময় ওই বিশেষ উড়োজাহাজকে এফ–১৬ যুদ্ধবিমান দিয়ে পাহারা দেওয়া হয়েছিল।
ফলে প্রেসিডেন্টকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার পুরো প্রক্রিয়াটি ছিল একাধিক স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থায় ঘেরা।
কেন এত গোপনীয়তা?
ট্রাম্প প্রশাসনের এই পদক্ষেপের সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো এর মাত্রা। শুধু বিকল্প উড়োজাহাজ ব্যবহার নয়, বরং ট্রাম্পের প্রকৃত অবস্থান গোপন রাখা, তাঁকে এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে নামিয়ে অন্য উড়োজাহাজে স্থানান্তর এবং যুদ্ধবিমান দিয়ে পাহারা দেওয়ার মতো ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
এমনকি প্রেসিডেন্টের নিয়মিত সফরপদ্ধতিও পরিবর্তন করা হয়েছিল।
মঙ্গলবার রাতে প্রথমবারের মতো এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কথা বলেন ট্রাম্প। তিনি জানান, বিকল্প উড়োজাহাজে ভ্রমণের সিদ্ধান্ত তাঁর নিজের ছিল না; সিক্রেট সার্ভিসই তাঁকে এভাবে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, সিক্রেট সার্ভিস যেভাবে কাজ করতে চেয়েছে, তিনি সেটিই অনুসরণ করেছেন। নিরাপত্তার স্বার্থে এয়ারফোর্স ওয়ানের মতো নিরাপদ অন্য একটি উড়োজাহাজে তাঁকে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলেও জানান তিনি।
৭৪৭-৮ নিয়েও নিরাপত্তা সংশয়
ট্রাম্পের নিরাপত্তা পরিকল্পনার সঙ্গে আরেকটি বিষয়ও জড়িয়ে আছে—কাতার থেকে উপহার হিসেবে পাওয়া নতুন বোয়িং ৭৪৭-৮ উড়োজাহাজ।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সম্ভাব্য বৈরী পরিবেশ থেকে প্রেসিডেন্টকে দ্রুত সরিয়ে নেওয়ার জন্য ওই নতুন উড়োজাহাজে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যাপ্ত কি না, তা নিয়ে সংশয় ছিল।
এই পরিস্থিতিতে পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল। কিন্তু একই সঙ্গে যদি এয়ারফোর্স ওয়ানই সম্ভাব্য হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
এই দ্বৈত ঝুঁকির মধ্যেই সিক্রেট সার্ভিস বিকল্প উড়োজাহাজ ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়।
ইরানি হামলার আশঙ্কার পেছনে দীর্ঘ ইতিহাস
ট্রাম্পকে ঘিরে ইরানের সম্ভাব্য হত্যাচেষ্টার আশঙ্কা নতুন নয়। ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ড্রোন হামলায় ইরানের কুদস ফোর্সের প্রধান কাসেম সোলাইমানি নিহত হওয়ার পর থেকেই ট্রাম্প এবং তাঁর প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার আশঙ্কা ওয়াশিংটনের নিরাপত্তা মহলে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
এরপর মধ্যপ্রাচ্যের সাম্প্রতিক যুদ্ধ ও সংঘাতে ইরানের শীর্ষ পর্যায়ের বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা নিহত হওয়ার পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ট্রাম্প নিজেও বিভিন্ন সময় ইরানসহ একাধিক পক্ষের কাছ থেকে হুমকি পাওয়ার কথা বলেছেন।
তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৪ সালের মার্কিন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রচারণা থেকে এখন পর্যন্ত ট্রাম্পকে লক্ষ্য করে অন্তত তিনটি বহুল আলোচিত হত্যাচেষ্টা বা হামলার ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার সন্দেহভাজনদের সঙ্গে ইরানের সরাসরি সম্পৃক্ততা বা যোগাযোগের প্রমাণ এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে আসেনি।
‘ইরান যে ট্রাম্পকে সরাতে চায়, তাতে সন্দেহ নেই’
ইসরায়েলের গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে মার্কিন রাজনীতিতেও প্রশ্ন উঠেছে।
মেরিল্যান্ডের ডেমোক্র্যাট সিনেটর ক্রিস ভ্যান হলেন ওয়াশিংটন পোস্ট-কে বলেন, ইরান যে মার্কিন প্রেসিডেন্টকে হত্যার চেষ্টা করতে চাইতে পারে, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ নেই। কিন্তু আঙ্কারায় যে নির্দিষ্ট পরিস্থিতির কথা বলা হয়েছে, সেটিকে তাঁর কাছে কিছুটা অবিশ্বাস্য ও কাল্পনিক মনে হয়েছে।
তিনি জানতে চেয়েছেন, ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল এবং যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব সংস্থাগুলো স্বাধীনভাবে সেটি যাচাই করতে পেরেছিল কি না।
এই প্রশ্নটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে কারণ গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকার পরও প্রেসিডেন্টকে নজিরবিহীন নিরাপত্তাব্যবস্থায় সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল।
ইসরায়েলের উদ্দেশ্য নিয়েও প্রশ্ন
গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয়ের পাশাপাশি আরও একটি বিতর্কিত বিষয় উঠে এসেছে—ইসরায়েল কেন এই তথ্য যুক্তরাষ্ট্রকে দিয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান ও সাবেক দুজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের একাংশ মনে করেন, তথ্যটি শুধু ট্রাম্পকে সতর্ক করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়নি। বরং মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ে তাঁর সিদ্ধান্ত এবং ওই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের নীতিকে প্রভাবিত করার বিষয়টিও ইসরায়েলের বিবেচনায় থাকতে পারে।
সংশ্লিষ্ট এক সাবেক মার্কিন কর্মকর্তা মনে করেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য দেওয়ার ক্ষেত্রে এমন কৌশল অতীতেও দেখা গেছে—যেখানে কোনো তথ্য সরবরাহের উদ্দেশ্য শুধু সংশ্লিষ্ট দেশকে অবহিত করা নয়, বরং নীতিনির্ধারকদের সিদ্ধান্ত গ্রহণেও প্রভাব ফেলা।
তবে এটি মার্কিন কর্মকর্তাদের একটি অংশের মূল্যায়ন; ইসরায়েল এ ধরনের উদ্দেশ্যের কথা স্বীকার করেছে—এমন কোনো তথ্য প্রতিবেদনে নেই।
ইরান-ইসরায়েল ছাড়িয়ে তুরস্ক প্রসঙ্গ
গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে এই বিতর্কের সঙ্গে তুরস্কের বিষয়টিও যুক্ত হয়েছে।
ইসরায়েল ইরানকে তাদের অন্যতম প্রধান নিরাপত্তা হুমকি হিসেবে বিবেচনা করে। একই সঙ্গে তুরস্কের ক্রমবর্ধমান আঞ্চলিক প্রভাব নিয়েও ইসরায়েলের উদ্বেগ রয়েছে বলে কয়েকজন মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
বিশেষ করে ট্রাম্পের সঙ্গে তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ানের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং ওয়াশিংটন-আঙ্কারা সম্পর্কের ঘনিষ্ঠতা ইসরায়েলের কাছে উদ্বেগের কারণ হতে পারে বলে ওই কর্মকর্তাদের একজন মনে করেন।
তবে এ ধরনের মূল্যায়নও মার্কিন কর্মকর্তাদের বক্তব্যের ওপর নির্ভরশীল এবং ইসরায়েল এ বিষয়ে প্রকাশ্যে কোনো মন্তব্য করেনি।
রুবিওকে সতর্ক করা হয়েছিল
বিষয়টির সঙ্গে পরিচিত এক সাবেক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকেও ইসরায়েলের দেওয়া ট্রাম্পের বিরুদ্ধে সম্ভাব্য হুমকির তথ্য এবং সিক্রেট সার্ভিসের গোপন নিরাপত্তা পরিকল্পনা সম্পর্কে অবহিত করা হয়েছিল।
তবে এত সতর্কতার মধ্যেও রুবিও পুরোনো এয়ারফোর্স ওয়ানেই ওঠেন বলে ওই কর্মকর্তা জানান।
এখানে নিরাপত্তা পরিকল্পনার একটি জটিলতা স্পষ্ট হয়। একদিকে সিক্রেট সার্ভিস সম্ভাব্য হুমকি এড়াতে প্রেসিডেন্টকে বিকল্প উড়োজাহাজে সরিয়ে নেয়, অন্যদিকে গোয়েন্দা তথ্যের গুরুত্ব নিয়ে মার্কিন সংস্থাগুলোর মধ্যেই মতভেদ ছিল।
‘কোনো ঝুঁকি নিতে চায়নি সিক্রেট সার্ভিস’
এক মার্কিন কর্মকর্তা ওয়াশিংটন পোস্ট-কে বলেছেন, ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও সিক্রেট সার্ভিস প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তায় কোনো ধরনের ঝুঁকি নিতে চায়নি।
এর পেছনে ট্রাম্পকে ঘিরে আগের নিরাপত্তা ঘটনাগুলোও গুরুত্বপূর্ণ বলে তিনি উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, ট্রাম্পের ক্ষেত্রে এর আগেও অন্তত তিনবার বড় ধরনের বিপদ খুব কাছ থেকে এড়ানো হয়েছে। ফলে এবার সংস্থাটি সম্ভাব্য হুমকিকে গুরুত্ব দিয়েই প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নিয়েছে।
এই ব্যাখ্যা থেকে বোঝা যায়, সিক্রেট সার্ভিসের কাছে গোয়েন্দা তথ্যের শতভাগ নিশ্চিত হওয়া হয়তো প্রয়োজনীয় ছিল না। প্রেসিডেন্টের জীবনের সম্ভাব্য ঝুঁকি থাকলে সতর্কতার মাত্রা সর্বোচ্চ পর্যায়ে নেওয়াই ছিল তাদের নীতি।
হোয়াইট হাউসের সরাসরি জবাব নেই
ইসরায়েলের দেওয়া গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে সিআইএ কী মূল্যায়ন করেছিল এবং হোয়াইট হাউস সেই মূল্যায়ন কীভাবে বিবেচনা করেছিল—এসব বিষয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেনি মার্কিন প্রশাসন।
সিআইএ এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ওয়াশিংটনে ইসরায়েলি দূতাবাসের কাছেও বিস্তারিত জানতে চাওয়া হলেও তাৎক্ষণিক কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
হোয়াইট হাউসের এক কর্মকর্তা অবশ্য প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা উল্লেখ করে বলেছেন, ট্রাম্প বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে হুমকির মুখোমুখি হয়েছেন এবং তাঁকে নিরাপদ রাখতে সব সময় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। সিক্রেট সার্ভিস তার মূল দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছে বলেও দাবি করেন তিনি।
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালও আগে তথ্যটি প্রকাশ করেছিল
ইরানের সম্ভাব্য হুমকি সম্পর্কে ইসরায়েল যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি করেছিল—এ তথ্য গত মাসে প্রথম প্রকাশ করেছিল দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল।
এখন দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট-এর নতুন প্রতিবেদন সেই ঘটনার আরও বিস্তারিত চিত্র সামনে এনেছে। বিশেষ করে তথ্যটির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে সিআইএর সংশয়, ট্রাম্পকে গোপনে সরিয়ে নেওয়া, বিকল্প উড়োজাহাজ এবং এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের পাহারার বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
ফলে ঘটনাটি শুধু একজন মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তা অভিযান হিসেবেই নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন, ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক এবং মধ্যপ্রাচ্য নীতির জটিল আন্তঃসম্পর্কের দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
নিরাপত্তা নাকি কৌশলগত প্রভাব—প্রশ্ন এখন সেখানেই
পুরো ঘটনার সবচেয়ে বড় অনিশ্চয়তা এখনো রয়ে গেছে গোয়েন্দা তথ্যটির প্রকৃত মূল্য ও উৎস নিয়ে।
যদি তথ্যটি সত্যিই দুর্বল হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবে—কেন এত বড় নিরাপত্তা অভিযান পরিচালনা করা হলো? আর যদি তথ্যটির পেছনে এমন কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস থাকে, যা প্রকাশ্যে জানানো সম্ভব নয়, তাহলে সিআইএর সন্দেহের কারণ কী ছিল?
আরেকটি প্রশ্ন হলো, ইসরায়েল তথ্যটি শুধু নিরাপত্তার স্বার্থে ভাগ করে নিয়েছিল, নাকি এর মাধ্যমে ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যপ্রাচ্যনীতি প্রভাবিত করার কোনো কৌশলও ছিল।
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো স্পষ্ট নয়। তবে একটি বিষয় পরিষ্কার—গোয়েন্দা তথ্যের নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সংশয় থাকলেও মার্কিন প্রেসিডেন্টের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে সিক্রেট সার্ভিস সর্বোচ্চ সতর্কতার পথই বেছে নিয়েছিল।
আঙ্কারা থেকে এয়ারফোর্স ওয়ান ছেড়ে ক্যাটারিং ট্রাকের আড়ালে বিকল্প উড়োজাহাজে ওঠা, এরপর এফ–১৬ যুদ্ধবিমানের পাহারায় যুক্তরাজ্যে পৌঁছানো—ট্রাম্পের এই গোপন যাত্রা সেই সতর্কতারই নাটকীয় বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু এর পেছনে আসল হুমকি কতটা বাস্তব ছিল এবং ইসরায়েলি গোয়েন্দা তথ্য কতটা নির্ভরযোগ্য ছিল, সে প্রশ্নের চূড়ান্ত উত্তর এখনো মেলেনি।