ঢাকা

জামায়াতের এমপিকে হুমকি দেওয়ার অভিযোগ, রংপুরে ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে মামলা

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
রংপুর-৬ (পীরগঞ্জ) আসনের জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য নুরুল আমীনকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে মানহানিকর, অপমানজনক ও হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তাঁদের বিরুদ্ধে পীরগঞ্জ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছেন সংসদ সদস্যের ব্যক্তিগত সহকারী আরিফ মিয়া।

অভিযুক্ত দুই নেতা হলেন পীরগঞ্জ মহাবিদ্যালয় ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক মাফিউজ্জামান মিরাজ এবং উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মিলু সরকার।

অভিযোগের পর বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে মাফিউজ্জামানের একটি ভিডিওতে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে মন্তব্যকে অনভিপ্রেত বলে স্বীকার করা হলেও মোস্তাফিজার রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করা হয়েছে।

ফেসবুক পোস্ট ও ভিডিও নিয়ে অভিযোগ

পীরগঞ্জ থানায় দেওয়া জিডিতে বলা হয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে পীরগঞ্জ বাজারের আলহাজ সোলায়মান মার্কেটে সংসদ সদস্য নুরুল আমীনের ব্যক্তিগত কার্যালয়ে অবস্থান করছিলেন তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আরিফ মিয়া। এ সময় তিনি ফেসবুকে একটি পোস্ট ও একটি ভিডিও দেখতে পান।

অভিযোগ অনুযায়ী, ওই পোস্ট ও ভিডিওতে সংসদ সদস্য এবং স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে অপমানজনক, মানহানিকর ও উসকানিমূলক বক্তব্য দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে হুমকিমূলক বক্তব্যও রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।

জিডিতে মোস্তাফিজার রহমান মিলু সরকারের ফেসবুক পোস্টের বক্তব্যের উল্লেখ করে বলা হয়েছে, তিনি জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের রাজনীতি ‘চিরতরে নির্মূল’ করার কথা বলেছেন এবং সংসদ সদস্য নুরুল আমীনকে নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন।

এ ছাড়া মাফিউজ্জামান মিরাজের ফেসবুক আইডি থেকে প্রকাশিত একটি ভিডিওতে জাতীয় যুবশক্তির কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ এবং তাঁর ছোট ভাই মুতাসিম বিল্লাহকে কুপিয়ে জখম ও তাঁদের হাত-পা ভেঙে দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।

তবে এসব বক্তব্যের সত্যতা, পোস্ট ও ভিডিওর প্রেক্ষাপট এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের প্রকৃত উদ্দেশ্য তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

মন্তব্যের ঘরেও উসকানিমূলক বক্তব্যের অভিযোগ

জিডিতে আরিফ মিয়া আরও উল্লেখ করেছেন, অভিযুক্তদের পোস্ট ও ভিডিওর মন্তব্যের ঘরে আরও কয়েকজন ব্যক্তি আক্রমণাত্মক ও উসকানিমূলক মন্তব্য করে তাঁদের বক্তব্যকে সমর্থন করেছেন।

তাঁর অভিযোগ, এ ধরনের বক্তব্য ও মন্তব্যের কারণে স্থানীয় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে এবং ভবিষ্যতে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটতে পারে। রাজনৈতিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হুমকি ও উসকানিমূলক বক্তব্য ছড়িয়ে পড়লে তা স্থানীয় পর্যায়ে উত্তেজনা বাড়াতে পারে বলেও অভিযোগে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।

অভিযোগের সঙ্গে ফেসবুক পোস্ট ও ভিডিওর স্ক্রিনশটের প্রিন্ট কপি এবং ভিডিওর একটি কপি পেনড্রাইভে করে থানায় দেওয়া হয়েছে।

ছাত্রদলের এক নেতার বক্তব্য নিয়ে দুঃখ প্রকাশ

অভিযোগের বিষয়ে পীরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মিলু সরকারের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও একাধিকবার ফোন করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

তবে পীরগঞ্জ উপজেলা ছাত্রদলের সদস্যসচিব সুজাল মাহমুদ মাফিউজ্জামান মিরাজের ফেসবুক ভিডিওতে ইউএনও ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে করা মন্তব্যকে অনভিপ্রেত বলে মন্তব্য করেছেন।

তিনি বলেন, এ ধরনের বক্তব্য কাম্য নয় এবং এ ঘটনায় তাঁরা দুঃখিত। বিষয়টি জেলা কমিটিকে জানানো হয়েছে। মাফিউজ্জামান কারও প্ররোচনায় এমন বক্তব্য দিয়েছেন কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে বলে জানান তিনি।

সুজাল মাহমুদের বক্তব্য অনুযায়ী, সংগঠনের কোনো নেতা বা কর্মীর বক্তব্য যদি রাজনৈতিক শিষ্টাচার ও সংগঠনের অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে বিষয়টি সাংগঠনিকভাবে পর্যালোচনা করা হবে।

মোস্তাফিজারের বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি

অন্যদিকে উপজেলা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মোস্তাফিজার রহমান মিলু সরকারের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেছেন সুজাল মাহমুদ।

তাঁর ভাষ্য, রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল এবং এলাকায় অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির উদ্দেশ্যে মোস্তাফিজার রহমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁকে বিভিন্নভাবে হেয়প্রতিপন্ন করার চেষ্টা চলছে বলেও দাবি করেন তিনি।

ফলে একই ঘটনায় অভিযোগের বিষয়ে দুই পক্ষের বক্তব্যে স্পষ্ট ভিন্নতা দেখা দিয়েছে। একদিকে জামায়াতের পক্ষ থেকে বিষয়টি নিয়ে তদন্ত ও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি করা হয়েছে, অন্যদিকে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে অন্তত একজন নেতার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলা হয়েছে।

সংবাদ সম্মেলনে জামায়াতের প্রতিবাদ

অভিযোগের পর বৃহস্পতিবার বিকেল চারটায় পীরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতে ইসলামী দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলন করে। এতে ছাত্রদল নেতা মোস্তাফিজার রহমান মিলুর ফেসবুক আইডি থেকে জামায়াতে ইসলামী, ইসলামী ছাত্রশিবির ও সংসদ সদস্য নুরুল আমীনকে নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ, অশালীন ও অবমাননাকর’ বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগে তীব্র নিন্দা জানানো হয়।

সংবাদ সম্মেলনে পীরগঞ্জ উপজেলা জামায়াতের আমির মিজানুর রহমান বলেন, পীরগঞ্জ মহাবিদ্যালয় ছাত্রদলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক মাফিউজ্জামান মিরাজের বিরুদ্ধেও সংসদ সদস্যকে উদ্দেশ করে হুমকিমূলক বক্তব্য দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

তাঁর মতে, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে এ ধরনের বক্তব্য রাজনৈতিক সহনশীলতা, পারস্পরিক সম্মান এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। মতপার্থক্য থাকলেও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের পরস্পরের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা প্রয়োজন বলে তিনি মন্তব্য করেন।

পোস্ট প্রত্যাহার ও তদন্তের দাবি

সংবাদ সম্মেলন থেকে জামায়াতে ইসলামী কয়েকটি দাবি তুলে ধরে। এর মধ্যে মোস্তাফিজার রহমান মিলুকে তাঁর প্রকাশিত বক্তব্য প্রত্যাহার করে প্রকাশ্যে দুঃখ প্রকাশ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে থাকা আপত্তিকর পোস্ট সরিয়ে নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।

একই সঙ্গে মাফিউজ্জামান মিরাজের বিরুদ্ধে ওঠা হুমকির অভিযোগসহ পুরো বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্তের দাবি জানিয়েছে দলটি। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে।

জামায়াতের পক্ষ থেকে বলা হয়, রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার স্বাভাবিক অংশ। কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন ব্যক্তিগত আক্রমণ, হুমকি কিংবা সহিংসতার আহ্বানে পরিণত না হয়, সে বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বশীল থাকা প্রয়োজন।

থানায় জিডি গ্রহণ

ছাত্রদলের দুই নেতার বিরুদ্ধে থানায় অভিযোগ দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন পীরগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) নজমুল হক। তিনি জানান, অভিযোগটি সাধারণ ডায়েরি হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে।

তবে জিডি গ্রহণের পর অভিযোগের সত্যতা যাচাই ও প্রয়োজনীয় আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করার বিষয়টি পুলিশের তদন্তের ওপর নির্ভর করবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত কোনো বক্তব্য বা ভিডিওর ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট, পোস্টের প্রকৃত উৎস, বক্তব্যের প্রেক্ষাপট এবং তা আইন লঙ্ঘন করেছে কি না—এসব বিষয় যাচাই করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

রাজনৈতিক উত্তেজনা এড়ানোর তাগিদ

পীরগঞ্জে জামায়াতের সংসদ সদস্যকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যের অভিযোগকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক দলগুলোর নেতা-কর্মীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া বক্তব্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে তার প্রভাব পড়তে পারে।

এ অবস্থায় অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়াকেই গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও দায়িত্বশীল বক্তব্য ও আচরণ প্রত্যাশিত।

ঘটনাটি নিয়ে একদিকে জামায়াত তদন্ত ও আইনগত ব্যবস্থা দাবি করেছে, অন্যদিকে ছাত্রদল বলছে, একজন নেতার বক্তব্য অনভিপ্রেত হলেও অপর নেতার বিরুদ্ধে অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। ফলে অভিযোগের প্রকৃত সত্যতা নির্ধারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তদন্তই এখন গুরুত্বপূর্ণ।

পীরগঞ্জ থানায় জিডি গ্রহণের মধ্য দিয়ে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে পুলিশের নজরে এসেছে। এখন অভিযোগের সঙ্গে জমা দেওয়া ফেসবুক পোস্ট, ভিডিও, স্ক্রিনশট ও অন্যান্য তথ্য যাচাই করে পরবর্তী আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স