সম্প্রতি মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়াকে ‘গুরুতরভাবে ত্রুটিপূর্ণ’ আখ্যা দিয়ে এর সমালোচনা করেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দলটির দাবি, বর্তমান খসড়া আইনে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব এমন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ওপরই রাখা হয়েছে, যাদের সদস্যদের বিরুদ্ধেই গুমের অভিযোগ উঠতে পারে। ফলে প্রস্তাবিত আইন কার্যকর হলে গুমের ঘটনায় দায়মুক্তি ও অস্বীকারের সংস্কৃতি আরও টিকে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
এনসিপি মনে করে, গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ তদন্তে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। এ জন্য খসড়া আইনের ১৪ ধারা সংশোধন করে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনে তালিকাভুক্ত অন্যান্য বাহিনীর ‘চেইন অব কমান্ডের’ বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে গুমের প্রতিটি অভিযোগ তদন্তের সুযোগ রাখার দাবি জানিয়েছে দলটি।
বৃহস্পতিবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে এনসিপি এসব দাবি জানায়। দলের পক্ষ থেকে বিবৃতিটি পাঠান দপ্তর সেলের সদস্য সাদিয়া ফারজানা।
খসড়া আইনের ১৪ ধারা নিয়ে আপত্তি
এনসিপির মূল আপত্তি খসড়া আইনের ১৪ ধারা নিয়ে। দলটির বক্তব্য, এই ধারায় গুমের অভিযোগ দায়েরের জন্য থানায় যাওয়ার কথা বলা হয়েছে এবং অভিযোগের তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে পুলিশকে।
কিন্তু একই খসড়া আইনে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যদের সম্ভাব্য গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার বিষয়টি স্বীকার করা হয়েছে। আইনের আওতায় পুলিশ, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনী, র্যাব, বিজিবি, কোস্ট গার্ড, আনসার এবং সরকারের বিভিন্ন গোয়েন্দা ও তদন্ত সংস্থার সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠতে পারে।
এনসিপির প্রশ্ন, যেসব প্রতিষ্ঠানের সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ তদন্তের প্রয়োজন হতে পারে, তাদেরই কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেই অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হলে তদন্ত কতটা স্বাধীন ও নিরপেক্ষ হবে।
দলটির অভিযোগ, এ ধরনের ব্যবস্থায় কোনো পরিবার যদি পুলিশের কোনো সদস্যের বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ করে, তাহলে সেই অভিযোগের তদন্তও পুলিশের হাতেই থাকবে। এতে তদন্তকারী সংস্থা ও সম্ভাব্য অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
‘নিজের বিরুদ্ধে অভিযোগ নিজেই তদন্ত’
বিবৃতিতে এনসিপি বলেছে, প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় পুলিশ নিজের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ নিজেই তদন্ত করার সুযোগ পেতে পারে। ফলে তদন্তের ফলাফল কী হবে, তা নিয়ে ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকারকর্মীদের মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
দলটির মতে, গুমের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থাকে অবশ্যই অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠান থেকে স্বাধীন হতে হবে। কারণ তদন্তের ওপর যদি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণ থাকে, তাহলে অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটন, সাক্ষ্য সংগ্রহ, নথি সংরক্ষণ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা কঠিন হতে পারে।
এনসিপি আরও বলেছে, খসড়া আইনে মিথ্যা অভিযোগের জন্য শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা থাকার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে তাদের আপত্তি নেই। কিন্তু সমস্যা তৈরি হচ্ছে তখনই, যখন অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণের জন্য স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত না করেই অভিযোগকারীকে শাস্তির ঝুঁকির মধ্যে রাখা হচ্ছে।
দলটির আশঙ্কা, এতে প্রকৃত ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করতে ভয় পেতে পারেন। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করার ক্ষেত্রে পরিবারগুলো যদি মনে করে যে অভিযোগের তদন্ত অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের হাতেই থাকবে, তাহলে অনেকেই আইনি প্রতিকার চাইতে অনিচ্ছুক হতে পারেন।
গুমের ঘটনায় আইনি কাঠামোর প্রয়োজন
এনসিপি অবশ্য বলছে, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য একটি নতুন আইন প্রণয়ন জরুরি। দলটির বিবৃতি অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভা ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার খসড়া আইন, ২০২৬’ অনুমোদন করেছে।
এর আগে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুম বিষয়ে একটি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার এপ্রিল মাসে সেই অধ্যাদেশ বিলুপ্ত করেছে। ফলে নতুন করে সংঘটিত গুমের ঘটনায় দেশে বর্তমানে একটি সুস্পষ্ট আইনি সংজ্ঞা ও কাঠামোর ঘাটতি রয়েছে বলে মনে করে এনসিপি।
দলটির বক্তব্য, গুমের মতো গুরুতর অপরাধ প্রতিরোধ, তদন্ত, ভুক্তভোগীদের প্রতিকার এবং দায়ীদের বিচারের আওতায় আনতে একটি কার্যকর আইন প্রয়োজন। তবে সেই আইন শুধু কাগজে-কলমে অপরাধের সংজ্ঞা নির্ধারণ করলেই হবে না; অভিযোগ তদন্ত ও বিচারপ্রক্রিয়াতেও স্বাধীনতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে।
আন্তর্জাতিক সনদের বাধ্যবাধকতার কথা তুলে ধরেছে এনসিপি
গুম প্রতিরোধে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কথাও বিবৃতিতে তুলে ধরেছে এনসিপি। দলটি বলেছে, বাংলাদেশ ২০২৪ সালের আগস্টে ‘গুম থেকে সব ব্যক্তির সুরক্ষাবিষয়ক আন্তর্জাতিক সনদে’ যোগ দিয়েছে।
এনসিপির দাবি, ওই সনদের ১২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী গুমের অভিযোগ দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। একই সঙ্গে জাতিসংঘের গুমবিষয়ক কমিটি স্পষ্ট করেছে যে কোনো বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে গুমে সম্পৃক্ততার অভিযোগ থাকলে সেই বাহিনী তদন্তে অংশ নিতে পারে না।
দলটির মতে, খসড়া আইনের ১৪ ধারা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত এই ন্যূনতম মানদণ্ডও পূরণ করছে না। ফলে আইনটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতা ও মানবাধিকার মানদণ্ড বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
অন্তর্বর্তী সরকারের অধ্যাদেশের ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি
গুমের অভিযোগ তদন্তে স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে প্রণীত অধ্যাদেশে থাকা একটি ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে এনসিপি।
দলটির বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ওই অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে গুমের অভিযোগ তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। সরকার এপ্রিল মাসে অধ্যাদেশটি বিলুপ্ত করার পর সেই ব্যবস্থাও আর কার্যকর নেই।
এনসিপির দাবি, আগের ওই ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা যেতে পারে। অথবা সরকার চাইলে নতুন একটি স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠন করতে পারে। তবে সংস্থাটি এমন হতে হবে, যাতে পুলিশ, সামরিক বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও অন্যান্য নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে তদন্ত করার জন্য পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা, সাংগঠনিক স্বাধীনতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা থাকে।
স্বাধীন তদন্ত সংস্থার দাবি
এনসিপি সরকারের কাছে যে দাবিগুলো জানিয়েছে, তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা। দলটি চায়, গুমের প্রতিটি অভিযোগ পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা এবং খসড়া আইনে তালিকাভুক্ত অন্যান্য বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত করা হোক।
তাদের মতে, শুধু তদন্তকারী সংস্থার নাম পরিবর্তন করলেই স্বাধীনতা নিশ্চিত হবে না। সংস্থাটিকে অভিযুক্ত বাহিনীর প্রশাসনিক বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখতে হবে। পাশাপাশি তদন্ত পরিচালনা, সাক্ষ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং প্রয়োজনীয় নথি পাওয়ার ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আইনি ক্ষমতা দিতে হবে।
এনসিপির বক্তব্য, গুমের অভিযোগের ক্ষেত্রে তদন্তকারী সংস্থা যদি অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানের অধীনেই থাকে, তাহলে ভুক্তভোগী পরিবার ও সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করা কঠিন হবে।
দায়মুক্তির সংস্কৃতি নিয়ে উদ্বেগ
বাংলাদেশে অতীতে গুমের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে মানবাধিকার সংগঠন ও ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে অভিযোগ ও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব অভিযোগের তদন্তে স্বাধীনতা ও জবাবদিহির প্রশ্নও বারবার সামনে এসেছে।
এনসিপি মনে করছে, নতুন আইন প্রণয়নের সময় অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের ভাষ্য, গুমবিরোধী আইন যদি এমন হয় যেখানে অভিযুক্ত প্রতিষ্ঠানই নিজেদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করবে, তাহলে আইনটি প্রকৃত অর্থে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে পারবে না।
বরং এতে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর মধ্যে অনাস্থা তৈরি হতে পারে এবং অনেক অভিযোগ তদন্তের পর্যায়েই থেমে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিতে পারে।
সরকারের প্রতি দুটি মূল দাবি
বিবৃতিতে এনসিপি সরকারের কাছে গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়া সংশোধনের আহ্বান জানিয়েছে। দলটির মূল দাবিগুলো হলো—
১. খসড়া আইনের ১৪ ধারা সংশোধন করে পুলিশ, সশস্ত্র বাহিনী, গোয়েন্দা সংস্থা ও আইনে তালিকাভুক্ত অন্যান্য বাহিনীর চেইন অব কমান্ডের বাইরে থাকা একটি স্বাধীন সংস্থাকে দিয়ে গুমের প্রতিটি অভিযোগ তদন্তের ব্যবস্থা করা।
২. অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে গুমবিষয়ক অধ্যাদেশে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের প্রশিক্ষিত তদন্ত ইউনিটকে যে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল, সেই ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা অথবা একই ধরনের ক্ষমতাসম্পন্ন একটি সত্যিকার স্বাধীন তদন্ত সংস্থা গঠন করা।
এনসিপির মতে, নতুন তদন্ত সংস্থাকে পুলিশ, সামরিক, গোয়েন্দা ও অন্যান্য নিরাপত্তা সংস্থার বিরুদ্ধে তদন্ত করার প্রয়োজনীয় আইনি ক্ষমতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা দিতে হবে।
আইন প্রণয়নের আগে সংশোধনের আহ্বান
গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারের জন্য আইন প্রণয়নের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও এনসিপি মনে করে, বর্তমান খসড়া সেই লক্ষ্য পূরণে যথেষ্ট নয়। বিশেষ করে তদন্তব্যবস্থার স্বাধীনতা নিশ্চিত না করলে আইনটি গুমের অভিযোগের কার্যকর প্রতিকার দিতে ব্যর্থ হতে পারে।
দলটির ভাষ্য, গুমবিরোধী আইন এমন হতে হবে যাতে ভুক্তভোগী পরিবার রাষ্ট্রের কাছে অভিযোগ জানাতে নিরাপদ বোধ করে এবং অভিযোগের তদন্ত নিয়ে তাদের আস্থা থাকে। একই সঙ্গে মিথ্যা অভিযোগের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা থাকলেও সেটি যেন প্রকৃত ভুক্তভোগীদের ভয় দেখানোর হাতিয়ার না হয়, সেদিকেও নজর দিতে হবে।
এনসিপি বলছে, স্বাধীন তদন্তব্যবস্থা ছাড়া গুমবিরোধী কোনো আইনই কার্যকর জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে পারবে না। বরং বর্তমান খসড়া অপরিবর্তিত থাকলে দায়মুক্তি ও অস্বীকারের যে সংস্কৃতির বিরুদ্ধে আইন করার কথা, সেটিই আরও টিকে থাকার সুযোগ পাবে।
তাই আইনটি চূড়ান্ত করার আগে ১৪ ধারাসহ তদন্তপ্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিধানগুলো পুনর্বিবেচনা করে একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্তব্যবস্থা নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে দলটি।