ঢাকা

আরজি কর হত্যাকাণ্ডে বড় পদক্ষেপ, সাবেক তৃণমূল বিধায়ক গ্রেপ্তার

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
কলকাতার আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার নারী চিকিৎসকের মরদেহ দ্রুত সৎকারের অভিযোগে পশ্চিমবঙ্গের সাবেক তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়ক নির্মল ঘোষকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। বৃহস্পতিবার ওডিশা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে তাঁকে ট্রানজিট রিমান্ডে কলকাতায় এনে আদালতে তোলা হতে পারে।

নির্মল ঘোষের বিরুদ্ধে দায়ের করা নতুন মামলায় তথ্যপ্রমাণ নষ্টের চেষ্টা, অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রসহ একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। নিহত চিকিৎসকের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে তাঁর সঙ্গে আরও দুজনের বিরুদ্ধে এ মামলা করা হয়েছে। তাঁরা হলেন পানিহাটি পৌরসভার সাবেক চেয়ারম্যান সোমনাথ দে এবং তৃণমূল কংগ্রেসের স্থানীয় নেতা সঞ্জীব মুখোপাধ্যায়।

মরদেহ সৎকার নিয়ে শুরু থেকেই প্রশ্ন

২০২৪ সালের ৯ আগস্ট আরজি কর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে এক নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার পর তাঁর মরদেহ দ্রুত পানিহাটি শ্মশানে সৎকার করা হয়। সেই সৎকারের প্রক্রিয়া নিয়েই শুরু থেকেই নানা প্রশ্ন উঠেছিল।

নিহত চিকিৎসকের পরিবারের অভিযোগ, নির্মল ঘোষসহ তৃণমূলের কয়েকজন নেতা পরিবারের সম্মতি ও আপত্তিকে উপেক্ষা করে মরদেহ দ্রুত সৎকারের উদ্যোগ নেন। এমনকি পরিবারের সদস্যদের শেষবারের মতো মরদেহ দেখার সুযোগ যথাযথভাবে দেওয়া হয়নি বলেও অভিযোগ করা হয়।

পরিবারের পক্ষ থেকে দ্বিতীয়বার ময়নাতদন্তের দাবি তোলা হয়েছিল। এর মধ্যেই মরদেহকে ‘ভিআইপি মর্যাদা’ দিয়ে দ্রুত পানিহাটি শ্মশানে নিয়ে দাহ করা হয় বলে পরিবারের পক্ষ থেকে আদালতে করা আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে।

মরদেহ সৎকারের সময় যথাযথ ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালন করা হয়েছিল কি না, সেটিও তদন্তের অংশ হয়ে উঠেছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—মরদেহ দ্রুত সৎকারের পেছনে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল কি না এবং এর মাধ্যমে কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ নষ্ট বা তদন্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা হয়েছিল কি না।

পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে নতুন মামলা

নিহত চিকিৎসকের পরিবারের অভিযোগের পর পুলিশ নির্মল ঘোষসহ তিনজনের বিরুদ্ধে নতুন করে এফআইআর করে। মামলায় তথ্যপ্রমাণ নষ্টের চেষ্টা এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মতো গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে।

পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, ওই রাতে হাসপাতাল থেকে মরদেহ শ্মশানে নেওয়ার সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়েছিল, কারা সেখানে উপস্থিত ছিলেন এবং দ্রুত সৎকারের বিষয়ে কারা ভূমিকা রেখেছিলেন।

একই সঙ্গে পানিহাটি শ্মশানে মরদেহ সৎকারের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। ঘটনার সময় আরজি কর হাসপাতালে কর্মরত চিকিৎসক, নার্স ও অন্যান্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহ করছে তদন্তকারীরা।

তদন্তের আওতায় রাখা হয়েছে মরদেহ হাসপাতাল থেকে বের করা থেকে শুরু করে শ্মশানে নেওয়া এবং সৎকার সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াটি।

মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যের পর নতুন করে তদন্ত

মামলাটি নতুন করে আলোচনায় আসে আরজি করের নারী চিকিৎসকের মৃত্যুর দুই বছর পূর্তিকে ঘিরে আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানের পর। ওই অনুষ্ঠানে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী প্রশ্ন তোলেন, পরিবারের আপত্তি থাকা সত্ত্বেও কেন এত দ্রুত মরদেহ সৎকার করা হয়েছিল।

এরপর ব্যারাকপুর পুলিশ কমিশনারেট নতুন করে বিষয়টি তদন্তের উদ্যোগ নেয়। পুলিশের তদন্তে এখন মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পাচ্ছে—মরদেহ দ্রুত সৎকারের সিদ্ধান্ত কেন নেওয়া হয়েছিল এবং সেই প্রক্রিয়ায় কোনো অনিয়ম বা তথ্যপ্রমাণ নষ্ট করার চেষ্টা হয়েছিল কি না।

তদন্তকারীরা ঘটনার সময়কার প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্যের পাশাপাশি সৎকারের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন তথ্য ও নথিও যাচাই করছেন।

আগেও সিবিআইয়ের জিজ্ঞাসাবাদের মুখে নির্মল

আরজি করের নারী চিকিৎসককে ধর্ষণ ও হত্যার মূল মামলাতেও নির্মল ঘোষকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা সিবিআই। ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তাঁকে এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

তবে এবার তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা করা হয়েছে, সেটি মূল ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পাশাপাশি মরদেহ সৎকারের প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে নতুন তদন্তের অংশ।

অর্থাৎ, হত্যাকাণ্ডের পর অপরাধের তদন্তে কোনোভাবে বাধা সৃষ্টি, তথ্যপ্রমাণ নষ্ট বা ঘটনাটিকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনের চেষ্টা হয়েছিল কি না—নতুন মামলায় সেই বিষয়গুলোই খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

স্থানীয়দের উচ্ছ্বাস

নির্মল ঘোষের গ্রেপ্তারের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বৃহস্পতিবার পানিহাটি পৌরসভার সামনে একদল স্থানীয় মানুষকে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। তাঁরা একে অপরকে মিষ্টি খাওয়ান।

ঘটনাটি আরজি কর হত্যাকাণ্ডের তদন্তকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে মানুষের আগ্রহ ও ক্ষোভেরও প্রতিফলন ঘটিয়েছে।

ছেলেকেও এর আগে গ্রেপ্তার করা হয়

নির্মল ঘোষের পরিবারের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে আরও একটি আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। গত ১৩ জুলাই তাঁর ছেলে তীর্থঙ্কর ঘোষকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।

২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতা এবং এক কোটি রুপির লটারির টিকিট ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগসংক্রান্ত মামলায় তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে নির্মল ঘোষকে গ্রেপ্তারের মধ্য দিয়ে আরজি কর হত্যাকাণ্ডের পর মরদেহ দ্রুত সৎকারের ঘটনাটি আবারও তদন্তের কেন্দ্রে চলে এসেছে। পুলিশ এখন খতিয়ে দেখছে, ওই সিদ্ধান্তের পেছনে কারা ছিলেন, কী কারণে পরিবারের আপত্তি সত্ত্বেও দ্রুত সৎকার করা হয়েছিল এবং এতে তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কোনো তথ্যপ্রমাণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল কি না। তদন্তে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স