ঢাকা

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি বাড়ছে, পাঠানো হচ্ছে নতুন রণতরি

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে মোতায়েন থাকা বিমানবাহী রণতরি ইউএসএস আব্রাহাম লিংকনের পরিবর্তে নতুন একটি বিমানবাহী রণতরি পাঠানোর পরিকল্পনা করছে যুক্তরাষ্ট্র। সম্ভাব্য এই পরিবর্তনের অংশ হিসেবে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানো হতে পারে। গতকাল বৃহস্পতিবার দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল-এর এক প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে মিডল ইস্ট মনিটর এ তথ্য জানিয়েছে।

দীর্ঘ সময় ধরে টানা সামরিক দায়িত্ব পালন করতে থাকা আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের জীবনযাত্রা ও কাজের পরিবেশ নিয়ে মার্কিন আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগের মধ্যেই নতুন রণতরি পাঠানোর পরিকল্পনার খবর সামনে এল। বিশেষ করে রণতরির নাবিকদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী, বিশুদ্ধ পানি, পয়োনিষ্কাশন, ডাকব্যবস্থা ও মানসিক স্বাস্থ্যের মতো বিষয়গুলো নিয়ে অভিযোগ পাওয়ার পর বিষয়টি ওয়াশিংটনে গুরুত্ব পেয়েছে।

২৫০ দিনের বেশি সময় ধরে মোতায়েন

ইউএসএস আব্রাহাম লিংকন ইতিমধ্যে ২৫০ দিনেরও বেশি সময় ধরে মোতায়েন রয়েছে। এর মধ্যে গত প্রায় ২০০ দিনে রণতরিটি কোনো বন্দরে থামেনি। দীর্ঘ সময় সমুদ্রে থেকে একের পর এক সামরিক অভিযান পরিচালনা করায় রণতরির নাবিকদের ওপর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ছে বলে মার্কিন আইনপ্রণেতারা জানিয়েছেন।

গত বছরের নভেম্বরে আব্রাহাম লিংকনকে মোতায়েন করা হয়। পরবর্তী সময়ে জানুয়ারিতে ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান শুরুর আগে রণতরিটিকে মধ্যপ্রাচ্যের দিকে পাঠানো হয়।

যুদ্ধ চলাকালে ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’তে আব্রাহাম লিংকন ও এর সঙ্গে থাকা যুদ্ধবিমানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিমানবাহী রণতরি থেকে পরিচালিত যুদ্ধবিমানগুলো সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতির অন্যতম প্রধান উপাদান হিসেবে কাজ করে।

যুদ্ধ শেষ হওয়ার পরও আব্রাহাম লিংকনের দায়িত্ব শেষ হয়নি। ইরানের বন্দরগুলো ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ কার্যকর রাখার সামরিক তৎপরতার সঙ্গেও রণতরিটি যুক্ত ছিল।

ফলে যুদ্ধ, নজরদারি ও অবরোধ—সব মিলিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে রণতরিটি উচ্চমাত্রার সামরিক দায়িত্ব পালন করছে।

নাবিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে আইনপ্রণেতাদের উদ্বেগ

দীর্ঘ সময় ধরে কোনো বন্দরে না থেমে একটি বিমানবাহী রণতরির মোতায়েন থাকা শুধু সামরিক সক্ষমতার বিষয় নয়; এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকে হাজার হাজার নাবিকের দৈনন্দিন জীবন।

মার্কিন আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ, আব্রাহাম লিংকনে দায়িত্ব পালনরত নাবিকদের জীবনযাত্রার মান নিয়ে একাধিক সমস্যা তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে পেন্টাগনের কাছে বিস্তারিত তথ্য চাওয়া হয়েছে।

মার্কিন সিনেটর রিচার্ড ব্লুমেন্থাল প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং ভারপ্রাপ্ত নৌবাহিনী প্রধান হুং কাওকে লেখা এক চিঠিতে রণতরিটির পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন।

চিঠিতে তিনি রণতরিতে মৌলিক সামগ্রীর ঘাটতি, পানিদূষণ, পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থার সমস্যা, নাবিকদের মানসিক স্বাস্থ্যের অবনতি এবং ডেকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে ডাকব্যবস্থায় বিঘ্নের অভিযোগও তুলে ধরেন তিনি।

ব্লুমেন্থালের বক্তব্য অনুযায়ী, নাবিকদের পরিবারের সদস্যরা যে পার্সেল ও প্রয়োজনীয় সামগ্রী পাঠাচ্ছেন, সেগুলোর অনেকগুলোও গন্তব্যে পৌঁছাচ্ছে না। কিছু পার্সেল কয়েক মাস ধরে নিখোঁজ রয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের কারণে নাবিকদের ওপর তৈরি হওয়া চাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরছে।

নতুন রণতরি পাঠানোর সম্ভাবনা

এই পরিস্থিতিতে ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনকে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে আব্রাহাম লিংকনের দীর্ঘ মোতায়েনের অবসান ঘটিয়ে সেটিকে তুলনামূলক বিশ্রাম, রক্ষণাবেক্ষণ ও পুনর্গঠনের সুযোগ দেওয়া সম্ভব হবে।

তবে জর্জ ওয়াশিংটন ঠিক কখন মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাবে এবং কতদিন সেখানে থাকবে, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।

বিমানবাহী রণতরি শুধু একটি যুদ্ধজাহাজ নয়; এর সঙ্গে থাকে বিপুলসংখ্যক নাবিক, যুদ্ধবিমান, হেলিকপ্টার এবং বিভিন্ন সহায়ক সামরিক ব্যবস্থা। ফলে একটি রণতরিকে অন্য একটি রণতরি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েনের ভারসাম্য রক্ষারও অংশ।

মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক উপস্থিতি

ইরানকে ঘিরে সাম্প্রতিক সংঘাতের পর মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিমানবাহী রণতরিগুলো এ ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান কৌশলগত সম্পদ।

একটি বিমানবাহী রণতরি থেকে দীর্ঘ পাল্লার সামরিক অভিযান পরিচালনা করা যায়। একই সঙ্গে আকাশ প্রতিরক্ষা, নজরদারি এবং সমুদ্রপথে শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও এগুলো গুরুত্বপূর্ণ।

তাই আব্রাহাম লিংকনকে সরিয়ে জর্জ ওয়াশিংটন পাঠানোর সম্ভাব্য সিদ্ধান্তকে শুধু একটি রণতরির পরিবর্তন হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র তার নৌ ও বিমান সক্ষমতার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে চাইছে বলেও ধারণা করা যায়।

‘যাঁরা দেশের সেবা করছেন, তাঁদের যত্ন নেওয়া হচ্ছে কি না’

আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের পরিস্থিতি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসের উদ্বেগ ক্রমেই প্রকাশ্য হচ্ছে।

মার্কিন প্রতিনিধি মার্লিন স্টুটজম্যান সিএনএন-কে বলেছেন, তিনি এ বিষয়ে পেন্টাগন ও মার্কিন প্রশাসনের কাছ থেকে নতুন তথ্য চাইবেন।

তাঁর বক্তব্যের মূল বিষয় ছিল—যেসব সামরিক সদস্য দেশের হয়ে দীর্ঘ সময় ধরে কঠিন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব পালন করছেন, তাঁদের অন্তত এই নিশ্চয়তা পাওয়া প্রয়োজন যে সরকার তাঁদের যথাযথভাবে দেখভাল করছে।

এটি শুধু একটি রণতরির ব্যবস্থাপনার প্রশ্ন নয়; দীর্ঘমেয়াদি সামরিক মোতায়েনের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের জনবল ব্যবস্থাপনা ও সেনাসদস্যদের কল্যাণ নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।

যুদ্ধের সক্ষমতার পাশাপাশি মানবিক দিকও গুরুত্বপূর্ণ

বিমানবাহী রণতরি সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক শক্তির প্রতীক হিসেবে আলোচিত হয়। কিন্তু আব্রাহাম লিংকনের সাম্প্রতিক পরিস্থিতি দেখাচ্ছে, একটি দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে শুধু অস্ত্র ও যুদ্ধক্ষমতা যথেষ্ট নয়।

একটি রণতরির কার্যকারিতা নির্ভর করে সেখানে থাকা নাবিকদের ওপর। দীর্ঘদিন বন্দরে না থামা, পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগে সমস্যা, প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ঘাটতি, পানিব্যবস্থা ও পয়োনিষ্কাশনের সমস্যা এবং মানসিক চাপ—এসব সমস্যা চলতে থাকলে তা সামরিক সক্ষমতার ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।

এ কারণে জর্জ ওয়াশিংটনকে সম্ভাব্যভাবে মধ্যপ্রাচ্যে পাঠানোর পরিকল্পনা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একই সঙ্গে কৌশলগত ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনার বিষয় হয়ে উঠেছে।

সামনে কী

মধ্যপ্রাচ্যে নতুন রণতরি পাঠানোর পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্র একদিকে ওই অঞ্চলে তার সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রাখতে পারবে, অন্যদিকে আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের দীর্ঘমেয়াদি মোতায়েন থেকে কিছুটা স্বস্তি দেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।

তবে আব্রাহাম লিংকনের নাবিকদের জীবনযাত্রা নিয়ে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর তদন্ত ও সমাধান এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে পানিদূষণ, পয়োনিষ্কাশন, ডাকব্যবস্থা, নিরাপত্তা এবং মানসিক স্বাস্থ্যের মতো মৌলিক বিষয়গুলো সমাধান না হলে নতুন রণতরি মোতায়েন করলেও দীর্ঘমেয়াদি সমস্যার পুরোপুরি সমাধান হবে না।

মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক চাপ ও সংঘাতের মাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রকে এখন দুটি বিষয় একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে—একদিকে ওই অঞ্চলে তার সামরিক সক্ষমতা ও কৌশলগত উপস্থিতি বজায় রাখা, অন্যদিকে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা সামরিক সদস্যদের শারীরিক ও মানসিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। ইউএসএস জর্জ ওয়াশিংটনের সম্ভাব্য মোতায়েন সেই দুই প্রয়োজনের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির একটি প্রচেষ্টা হিসেবেই সামনে এসেছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স