যুদ্ধবিরতি চুক্তি অনুযায়ী গাজা উপত্যকা থেকে ধাপে ধাপে সেনা প্রত্যাহারের কথা থাকলেও বাস্তবে উল্টো চিত্র দেখা যাচ্ছে বলে দাবি করেছে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম Al Jazeera। তাদের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইসরায়েলি বাহিনী গাজার বিভিন্ন এলাকায় নতুন সামরিক ঘাঁটি নির্মাণ এবং পুরোনো ঘাঁটিগুলো সম্প্রসারণ করছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক উপস্থিতি ও ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণের কৌশলের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
আল–জাজিরার ওপেন সোর্স ইউনিটের বিশ্লেষণে ব্যবহৃত স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, গাজার ভেতরে অন্তত ৪০টি ইসরায়েলি সামরিক ঘাঁটির উপস্থিতি রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ঘাঁটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর নতুন করে নির্মিত হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পাশাপাশি একটি ঘাঁটির নির্মাণকাজ এখনো চলমান রয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে নতুন সামরিক অবকাঠামোর প্রমাণ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গাজাজুড়ে নির্মিত নতুন স্থাপনাগুলোকে অস্থায়ী পর্যবেক্ষণ পোস্ট হিসেবে নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি ব্যবহারের উপযোগী সামরিক অবকাঠামো হিসেবে দেখা যাচ্ছে। স্যাটেলাইট চিত্রে ভবন, সুরক্ষিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, যানবাহন রাখার স্থান এবং অভ্যন্তরীণ যোগাযোগব্যবস্থার উপস্থিতি শনাক্ত করা হয়েছে।
বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, নতুন সামরিক ঘাঁটিগুলো উত্তর, মধ্য ও দক্ষিণ গাজার বিভিন্ন কৌশলগত এলাকায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে উত্তর গাজায় দুটি, মধ্যাঞ্চলে দুটি, নেৎজারিম করিডরের পূর্বদিকে একটি এবং দক্ষিণাঞ্চলের খান ইউনিস এলাকায় তিনটি ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়েছে।
কবরস্থানের ওপর সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের অভিযোগ
অনুসন্ধানের সবচেয়ে আলোচিত অংশটি হলো দক্ষিণ গাজার খান ইউনিস এলাকায় একটি কবরস্থানের ওপর সামরিক ঘাঁটি নির্মাণের অভিযোগ।
স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে কবরস্থান এলাকায় ব্যাপক মাটি ভরাটের কাজ শুরু হয়। পরবর্তী কয়েক মাসের মধ্যে সেখানে একই ধরনের একাধিক স্থাপনা নির্মিত হয়। ২০২৬ সালের মে মাসের চিত্রে ওই স্থাপনাগুলোতে সামরিক যানবাহন অবস্থান করতে দেখা যায়।
বিশ্লেষকদের ধারণা, এসব স্থাপনা সেনা সদস্যদের আবাসন, কমান্ড সেন্টার এবং সামরিক বৈঠকের জন্য ব্যবহৃত হতে পারে।
বেইত লাহিয়ায় দ্রুত সামরিকীকরণ
উত্তর গাজার বেইত লাহিয়া এলাকাতেও একই ধরনের পরিবর্তন লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে এলাকা প্রায় খালি থাকলেও এক মাসের মধ্যে সেখানে নির্মাণকাজ শুরু হয়। পরবর্তী স্যাটেলাইট চিত্রে পূর্ণাঙ্গ সামরিক স্থাপনা ও অবকাঠামো দেখা গেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এত দ্রুত সামরিক অবকাঠামো গড়ে ওঠা পরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি উপস্থিতির ইঙ্গিত বহন করে।
‘ইয়েলো লাইন’ ঘিরে নতুন বাস্তবতা
প্রতিবেদনে ‘ইয়েলো লাইন’ নামে পরিচিত একটি সামরিক নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলও আলোচনায় এসেছে। এই সীমারেখা গাজার প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা জুড়ে বিস্তৃত বলে দাবি করা হয়েছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু বলেন, “গাজার ৬০ শতাংশ এলাকা এখন আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।” তাঁর এই বক্তব্যকে কেন্দ্র করে গাজায় দীর্ঘমেয়াদি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নিয়ে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন সামরিক ঘাঁটিগুলো এই নিয়ন্ত্রণ অঞ্চলের সঙ্গে সমন্বয় করেই গড়ে তোলা হচ্ছে এবং এগুলো পারস্পরিকভাবে সামরিক সড়ক, পরিখা ও মাটির বাঁধের মাধ্যমে সংযুক্ত।
পুরোনো ঘাঁটিও সম্প্রসারণ
নতুন ঘাঁটি নির্মাণের পাশাপাশি আগে থেকেই বিদ্যমান সামরিক অবস্থানগুলোও সম্প্রসারণ করা হচ্ছে বলে অনুসন্ধানে দাবি করা হয়েছে।
গাজা নগরীর পূর্বাঞ্চলের একটি সামরিক ঘাঁটির আয়তন ২০২৫ সালের অক্টোবর থেকে ২০২৬ সালের মে মাসের মধ্যে প্রায় ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে বলে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণে দেখা গেছে।
সেখানে সাঁজোয়া যান রাখার জন্য আলাদা এলাকা, নতুন প্রতিরক্ষাব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো পুনর্গঠনের চিত্রও শনাক্ত করা হয়েছে।
মধ্য গাজার একটি সামরিক অবস্থানের চারপাশে গভীর প্রতিরক্ষামূলক পরিখা খননের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি সামরিক অবস্থানের ইঙ্গিত হিসেবে দেখা হচ্ছে।
নেৎজারিম করিডরের কৌশলগত গুরুত্ব
অনুসন্ধানে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে নেৎজারিম করিডর–কে। এই করিডর উত্তর ও দক্ষিণ গাজার মধ্যে যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণের অন্যতম প্রধান এলাকা হিসেবে বিবেচিত।
আল–জাজিরার তথ্য অনুযায়ী, করিডরটির আশপাশে এবং পূর্বদিকে অন্তত তিনটি সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়েছে। এসব ঘাঁটির মাধ্যমে গাজার দুই অংশের মধ্যে মানুষের চলাচল ও যোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া জুহোর আদ-দিক এলাকায় একটি খোলা জমিকে দ্রুত সামরিক ঘাঁটিতে রূপান্তর করার চিত্রও স্যাটেলাইটে ধরা পড়েছে।
‘ফিলিস্তিনি জনবসতি ঘিরে ফেলার কৌশল’
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গাজাজুড়ে ছড়িয়ে থাকা ৪০টি সামরিক ঘাঁটির অবস্থান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এগুলো এমনভাবে স্থাপন করা হয়েছে যাতে ফিলিস্তিনি জনবসতিগুলো কার্যত চারদিক থেকে ঘিরে রাখা যায়।
বিশ্লেষকদের মতে, এই অবকাঠামো শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণই নয়, বরং বেসামরিক মানুষের চলাচল, কৃষিজমিতে প্রবেশ এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব ফেলতে পারে।
যুদ্ধবিরতি চুক্তির সঙ্গে সাংঘর্ষিক?
প্রতিবেদনটি দাবি করছে, এই সামরিক সম্প্রসারণ ২০২৫ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তির মূল শর্তগুলোর সঙ্গে সাংঘর্ষিক। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় হওয়া ওই সমঝোতায় যুদ্ধ বন্ধ, মানবিক সহায়তা প্রবেশ, হামাসকে নিরস্ত্রীকরণ এবং ধাপে ধাপে ইসরায়েলি সেনা প্রত্যাহারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
ফিলিস্তিনি রাজনৈতিক বিশ্লেষক আবদুল্লাহ আকরাবাবি মনে করেন, ২০২৩ সালের অক্টোবরের পর থেকে দখল, ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ এবং সীমান্ত সম্প্রসারণ ইসরায়েলের নিরাপত্তা নীতির কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়েছে।
তাঁর ভাষায়, নতুন কৌশলের লক্ষ্য হলো এমন একটি অঞ্চল তৈরি করা, যেখান থেকে ধীরে ধীরে ফিলিস্তিনি জনগণ ও নগর অবকাঠামো সরিয়ে দেওয়া হবে।
অব্যাহত মানবিক বিপর্যয়
গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়–এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের অক্টোবরে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে গাজায় প্রায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনি নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজার ৯১৯ জন আহত হয়েছেন। নিহত ও আহতদের বড় অংশ নারী ও শিশু।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দাবি, যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও সহিংসতা পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। যুদ্ধবিরতির পরবর্তী সাত মাসে অন্তত ৯২৯ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৮১১ জন আহত হয়েছেন।
আল–জাজিরার অনুসন্ধান নতুন করে সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে—গাজায় যুদ্ধবিরতির পরও বাস্তবে কি সামরিক উপস্থিতি কমছে, নাকি স্থায়ী নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য নতুন অবকাঠামো গড়ে তোলা হচ্ছে? বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে নতুন বিতর্ক এবং কূটনৈতিক আলোচনা জোরদার হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে।