বিরোধীদলীয় নারী সদস্যদের পোশাক নিয়ে ইঙ্গিতপূর্ণ মন্তব্যকে কেন্দ্র করে জাতীয় সংসদে ব্যাপক উত্তেজনা ও হইচইয়ের সৃষ্টি হয়েছে। বিএনপির সংসদ সদস্য (এমপি) মনিরুল হক চৌধুরীর এক বক্তব্য ঘিরে রোববারের সংসদ অধিবেশন একাধিকবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। পরে বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মুখে ওই বক্তব্যের একটি অংশ এক্সপাঞ্জ (বিয়োজন) করা হয়।
রোববার জাতীয় সংসদে ২০২৫–২৬ অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটের ওপর আলোচনার সময় এই ঘটনা ঘটে।
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে গিয়ে বিতর্কের সূত্রপাত
আলোচনার এক পর্যায়ে বিএনপি এমপি মনিরুল হক চৌধুরী ২০০১ সালের একটি দাওয়াত অনুষ্ঠানের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। সেখানে তিনি তৎকালীন ও বর্তমান রাজনৈতিক ব্যক্তিদের উপস্থিতির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন।
তিনি বলেন, ওই অনুষ্ঠানে বর্তমান বিরোধীদলীয় উপনেতা জামায়াতে ইসলামীর নেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে উপস্থিত ছিলেন।
এরপর তিনি হাস্যরসের ঢঙে এমন মন্তব্য করেন, যা নিয়ে সংসদে উপস্থিত সদস্যদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দেয় এবং পরে তা দ্রুতই বিতর্কে রূপ নেয়।
নারী সংসদ সদস্যদের নিয়ে মন্তব্যে উত্তেজনা
বক্তব্যের একপর্যায়ে মনিরুল হক চৌধুরী সংসদের নারী সদস্যদের উদ্দেশে মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, তিনি কিছু নারী সংসদ সদস্যের বক্তব্য শুনেছেন এবং তাদের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন।
এরপর তিনি বিরোধী দল ও বিএনপির নারী সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে ইঙ্গিত করে বলেন, “আপনারা এদিকে দেখতে পারেন, আমরা এই দিকে দেখলে কী আছে বুঝব না—এটা ঠিক না।”
এই মন্তব্যের পরপরই বিরোধী দলের নারী ও পুরুষ সদস্যরা দাঁড়িয়ে তীব্র প্রতিবাদ জানান এবং সংসদে হইচই শুরু হয়।
ডেপুটি স্পিকারের হস্তক্ষেপ
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল হস্তক্ষেপ করেন এবং সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে শালীনতা বজায় রাখার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও পারিবারিক বিষয় নিয়ে সংসদে মন্তব্য করা উচিত নয়।
তিনি বিরোধী দলের সদস্যদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সংসদীয় নিয়ম মেনে চলার নির্দেশ দেন।
একই সঙ্গে তিনি মনিরুল হক চৌধুরীর বক্তব্যের বিতর্কিত অংশ প্রত্যাহার বা এক্সপাঞ্জ করার বিষয়ে নির্দেশনা দেন।
বক্তব্য প্রত্যাহার ও ক্ষমা প্রার্থনা
উত্তেজনার মধ্যে বিএনপি এমপি মনিরুল হক চৌধুরী বলেন, তিনি কাউকে ছোট করার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেননি। তবে যদি কেউ আহত হয়ে থাকেন, সে জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
এরপর ডেপুটি স্পিকার সংসদের রীতি অনুযায়ী তাঁর বক্তব্যের নির্দিষ্ট অংশ এক্সপাঞ্জ করার ঘোষণা দেন। এ সময় বিরোধী দলের সদস্যরা টেবিল চাপড়িয়ে সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানান।
সংসদে শৃঙ্খলা নিয়ে সতর্ক বার্তা
ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল সংসদ সদস্যদের উদ্দেশে বলেন, জাতীয় সংসদ জনগণের প্রতিনিধিদের সর্বোচ্চ গণতান্ত্রিক মঞ্চ। এখানে শালীনতা ও মর্যাদা রক্ষা করা সবার দায়িত্ব।
তিনি বলেন, ব্যক্তিগত স্বাধীনতা বা পারিবারিক বিষয় নিয়ে ভবিষ্যতে সংসদে মন্তব্য করা থেকে বিরত থাকতে হবে।
দ্বিতীয় দফায় উত্তেজনা
বিতর্কিত পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হওয়ার পর পুনরায় বক্তব্য শুরু করেন মনিরুল হক চৌধুরী। তবে শেষ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমানকে নিয়ে মন্তব্য করলে সংসদে আবারও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
এরপর সরকার ও বিরোধী দলের সদস্যরা একযোগে হইচই শুরু করেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাওয়ায় ডেপুটি স্পিকার অধিবেশন কিছু সময়ের জন্য বিরতি দেন এবং আসরের নামাজের বিরতি ঘোষণা করেন।
বিরতির পর বিরোধীদের প্রতিক্রিয়া
বিরতির পর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম বক্তব্য দেন।
তিনি বলেন, বিএনপির সংসদ সদস্যের বক্তব্য সংসদীয় শিষ্টাচার ও সাংবিধানিক রীতিনীতির সীমা অতিক্রম করেছে।
তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীদলীয় উপনেতার ব্যক্তিগত ও পারিবারিক বিষয় সংসদে টেনে এনে অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্য করা হয়েছে, যা অনভিপ্রেত ও অগ্রহণযোগ্য।
তিনি আরও বলেন, নারী সংসদ সদস্যদের পোশাক নিয়ে করা মন্তব্য তাদের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার ওপর আঘাত।
‘বর্ণবাদী আচরণ’ হিসেবে আখ্যা
নাহিদ ইসলাম ওই বক্তব্যকে ‘হীন ও বর্ণবাদী আচরণ’ হিসেবে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, সংসদে প্রত্যেক সদস্যের ধর্মীয় ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার প্রতি সম্মান দেখানো বাধ্যতামূলক।
এক্সপাঞ্জের ঘোষণা
ডেপুটি স্পিকার পরে জানান, সংসদীয় রীতিনীতি বহির্ভূত অংশগুলো নিয়ম অনুযায়ী এক্সপাঞ্জ করা হয়েছে।
তিনি পুনরায় সকল সংসদ সদস্যকে সংসদের মর্যাদা রক্ষার আহ্বান জানান এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ব্যক্তিগত মন্তব্য থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেন।
এ ঘটনায় সংসদ অধিবেশন দীর্ঘ সময় ধরে উত্তপ্ত থাকায় বাজেট আলোচনার কার্যক্রমও সাময়িকভাবে ব্যাহত হয়।:::