ঢাকা

চুক্তির সমঝোতায় ইরানের কট্টরপন্থীদের অসন্তোষ, জানাল আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি সম্ভাব্য শান্তিচুক্তিকে কেন্দ্র করে ইরানের অভ্যন্তরে তীব্র রাজনৈতিক উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। চুক্তির খসড়া ও সম্ভাব্য শর্তাবলি প্রকাশ্যে আসার পর দেশটির কট্টরপন্থী শিবির এটিকে “অন্যায্য সমঝোতা” বলে অভিহিত করেছে। তাদের দাবি, এতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, ক্ষতিপূরণ এবং কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণের নিশ্চয়তা নেই।

ব্রিটিশ দৈনিক The Guardian–এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান একটি সম্ভাব্য চুক্তিতে পৌঁছেছে এবং আগামী শুক্রবার তা স্বাক্ষরের সম্ভাবনা রয়েছে। তবে এই অগ্রগতির খবরের মধ্যেই ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

কট্টরপন্থীদের অভিযোগ: “এটি জয় নয়, আত্মসমর্পণ”

ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য কামরান গাজানফারি প্রস্তাবিত চুক্তিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বলেন, সরকারের “জয় হয়েছে” দাবি বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাঁর ভাষায়, এটি একটি “ভুল ব্যাখ্যা” এবং যুক্তরাষ্ট্র কোনো বাস্তব ছাড় দিচ্ছে না।

অন্যদিকে, কট্টরপন্থী শিবিরের সঙ্গে যুক্ত প্রভাবশালী গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক মেইসাম নিলি এই সমঝোতাকে “বিপর্যয়কর আত্মসমর্পণ” বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি সাধারণ ইরানিদের এই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার আহ্বান জানান।

সরকারের অবস্থান: যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক অগ্রগতি

তেহরানের পক্ষ থেকে আলোচনায় যুক্ত প্রতিনিধিরা কট্টর সমালোচনার জবাব দিয়েছেন। আলোচক দলের ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা মেহদি মোহাম্মাদি এক অডিও বার্তায় দাবি করেন, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে এটি একটি বড় যুদ্ধের অবসান ঘটাবে।

তিনি বলেন, চুক্তির কাঠামোয় ইরানকে নতুন কোনো পারমাণবিক প্রতিশ্রুতি দিতে বাধ্য করা হয়নি। বরং আগের অবস্থানই বহাল রয়েছে, যেখানে ইরান পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি না করার নীতি বজায় রাখে।

পারমাণবিক কর্মসূচি ও ইউরেনিয়াম ইস্যু

চুক্তির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের ভবিষ্যৎ। তবে এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি। আলোচনায় একটি বিকল্প প্রস্তাব রয়েছে, যেখানে ইরানের ভেতরেই ইউরেনিয়ামকে নিম্নমাত্রায় রূপান্তর করা হতে পারে।

পরবর্তী ৬০ দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে বলে জানা গেছে।

নিষেধাজ্ঞা ও সম্পদ প্রত্যাহার প্রশ্ন

মোহাম্মাদি দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছে। তাঁর মতে, চুক্তির দ্বিতীয় ধাপে এ প্রক্রিয়া আরও বিস্তৃত হতে পারে।

তবে চুক্তির সমালোচকদের দাবি, বিদেশে জব্দ থাকা ইরানের অর্থ (প্রায় ১,২০০ কোটি মার্কিন ডলার) ফেরত দেওয়ার বিষয়টি এখনো অনিশ্চিত।

হরমুজ প্রণালি নিয়ে কৌশলগত বিতর্ক

চুক্তির সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয়গুলোর একটি হলো হরমুজ প্রণালি। ইরানের কট্টরপন্থীরা দাবি করছেন, এই প্রণালির ওপর তেহরানের কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার কোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্য নয়।

মোহাম্মাদি দাবি করেন, ইরান তার সামরিক ও কৌশলগত সক্ষমতা দিয়ে প্রণালির ওপর প্রভাব বজায় রাখে এবং প্রয়োজনে এক ঘণ্টার মধ্যে এটি বন্ধ করার সক্ষমতা রাখে—যা কট্টর বক্তব্য হিসেবে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে বিতর্ক তৈরি করেছে।

হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি পরিবহনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রুট হওয়ায় বিষয়টি আন্তর্জাতিকভাবে সংবেদনশীল।

কট্টরপন্থীদের রাজনৈতিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ বিক্ষোভ

ইরানের অভ্যন্তরে কট্টরপন্থী গোষ্ঠী “পেদারি ফ্রন্ট”–এর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন নেতা ও বিশ্লেষক চুক্তির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

তারা তেহরানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে বিক্ষোভও করেছেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “We will not accept” হ্যাশট্যাগ ব্যবহার করে প্রচারণা চালাচ্ছেন।

কায়হান পত্রিকার প্রধান সম্পাদক হোসেন শরিয়তমাদারি ও পার্লামেন্ট সদস্য মাহমুদ নাবাভিয়ানও চুক্তির তীব্র সমালোচক হিসেবে সামনে এসেছেন।

সরকারপন্থীদের পাল্টা যুক্তি

সরকারপন্থী বিশ্লেষকদের দাবি, কট্টরপন্থীদের অবস্থান বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাদের মতে, এই গোষ্ঠী যে কোনো ধরনের সমঝোতারই বিরোধিতা করে এবং তারা জনমতের প্রতিনিধিত্ব করে না।

তাদের যুক্তি, দীর্ঘমেয়াদি সংঘাতের পরিবর্তে কূটনৈতিক সমাধানই ইরানের জন্য বেশি কার্যকর।

২০১৫ সালের চুক্তির সঙ্গে তুলনা

বিশ্লেষকদের মতে, নতুন সমঝোতা ২০১৫ সালের Joint Comprehensive Plan of Action–এর তুলনায় ভিন্ন প্রকৃতির।

২০১৫ সালের চুক্তিতে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর বিস্তারিত সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল এবং বিনিময়ে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করা হয়েছিল।

নতুন প্রস্তাবটি তুলনামূলকভাবে কম কাঠামোবদ্ধ এবং মূলত যুদ্ধবিরতি ও কূটনৈতিক উত্তেজনা কমানোর দিকে বেশি মনোযোগী বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।

আন্তর্জাতিক ও রাজনৈতিক প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই চুক্তি বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান প্রশাসন এই চুক্তিকে সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতির ধারাবাহিকতা হিসেবে উপস্থাপন করতে চাইছে।

অন্যদিকে, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিভাজন এই সমঝোতার বাস্তবায়নকে জটিল করে তুলতে পারে।



যুক্তরাষ্ট্র–ইরান সম্ভাব্য চুক্তি এখনো চূড়ান্ত হয়নি, তবে এর খসড়া ঘিরে ইরানের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর বিভাজন স্পষ্ট। একদিকে সরকারপন্থীরা এটিকে কূটনৈতিক অগ্রগতি হিসেবে দেখছেন, অন্যদিকে কট্টরপন্থীরা এটিকে জাতীয় স্বার্থের সঙ্গে আপস হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন।

চুক্তির ভবিষ্যৎ এখন মূলত তেহরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সমঝোতা এবং ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত অবস্থানের ওপর নির্ভর করছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স