২০১৮ সালে ভারতকে হারিয়ে বাংলাদেশের মেয়েদের এশিয়া কাপ জয় ছিল দেশের ক্রিকেটে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। ছেলেদের দল তখনও এশিয়ার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করতে পারেনি, এমনকি এখনো পারেনি। তাই মেয়েদের সেই সাফল্যকে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটে নতুন অধ্যায়ের সূচনা হিসেবে দেখা হয়েছিল।
কিন্তু এরপর কেটে গেছে বেশ কয়েক বছর। পরের তিনটি এশিয়া কাপের কোনোটিতেই ফাইনালে উঠতে পারেনি বাংলাদেশ। সর্বশেষ আসরেও ভারতের বিপক্ষে সেমিফাইনালে প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়তে পারেনি দল। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ২০১৮ সালের সেই সাফল্যের পরও কি বাংলাদেশের নারী ক্রিকেট কাঙ্ক্ষিত গতিতে এগোতে পারেনি?
সমস্যার জায়গাগুলো খুঁজতে গেলে শুধু মাঠের পারফরম্যান্স নয়, সামনে আসে ঘরোয়া ক্রিকেটের দুর্বল কাঠামো, ফিটনেসের ঘাটতি এবং নতুন খেলোয়াড় উঠে আসার সীমিত সুযোগ।
সবচেয়ে বড় দুর্বলতা ব্যাটিংয়ে
সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের নারী দলের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হিসেবে ব্যাটিংই সামনে আসে। বোলাররা মাঝেমধ্যে ম্যাচ জেতানোর মতো পারফরম্যান্স করলেও ব্যাটাররা নিয়মিতভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্কোর গড়তে পারছেন না।
২০২৩ সালের শুরু থেকে টেস্ট খেলুড়ে দেশগুলোর বিপক্ষে টি-টোয়েন্টিতে বাংলাদেশের ব্যাটাররা দেড় শ বা তার বেশি রান করতে পেরেছেন মাত্র দুবার। দুবারই প্রতিপক্ষ ছিল আয়ারল্যান্ড।
একই সময়ে ওভারপ্রতি গড়ে ছয় রান তোলার ঘটনাও খুব বেশি নয়। গত তিন বছরে এমন হয়েছে মাত্র ১৪ বার। এর মধ্যে চারটি শ্রীলঙ্কা এবং তিনটি আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে।
নারী দলের প্রধান কোচ সরোয়ার ইমরানের মতে, এর পেছনে ফিটনেসের ঘাটতিও বড় কারণ। দ্রুত রান নেওয়ার সময় রানআউটের ভয় এবং অল্পতেই ক্লান্ত হয়ে পড়ার সমস্যা রয়েছে ক্রিকেটারদের মধ্যে।
তাঁর মতে, জাতীয় দলের ক্যাম্প শুরুর আগে মাত্র এক সপ্তাহের ফিটনেস অনুশীলন দিয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। সারা বছর ধরে ক্রিকেটারদের ফিটনেস নিয়ে কাজ করতে হবে।
ঘরোয়া ক্রিকেটে বড় শূন্যতা
সমস্যাটা শুধু জাতীয় দলের পারফরম্যান্সে সীমাবদ্ধ নয়। জাতীয় দলে নতুন ক্রিকেটার আসার পথও অনেকটা সংকুচিত হয়ে গেছে।
নারীদের সর্বশেষ ঘরোয়া টুর্নামেন্ট হয়েছিল প্রায় এক বছর আগে, গত ডিসেম্বর মাসে। জাতীয় দলের ব্যস্ত সূচির কারণে ঢাকা প্রিমিয়ার লিগও আয়োজন করা সম্ভব হয়নি।
ফলে নির্বাচকদের সামনে নতুন প্রতিভা খুঁজে বের করার সুযোগ কমে গেছে। জাতীয় দলের বাইরে নিয়মিত প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট না থাকায় যারা একবার দলে জায়গা করে নেন, তাঁদেরই বারবার সুযোগ দিতে হয়।
আবার জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের বাদ দিয়ে ঘরোয়া টুর্নামেন্ট আয়োজন করাও কঠিন হয়ে পড়ে, কারণ তাঁদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার মতো পর্যাপ্ত ক্রিকেটার এখনো তৈরি হয়নি।
বছরজুড়ে এইচপি কার্যক্রমের প্রস্তাব
এই পরিস্থিতি থেকে বের হতে নারী দলের জন্য ছেলেদের আদলে বছরব্যাপী হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) কার্যক্রম চালুর প্রয়োজন দেখছেন প্রধান নির্বাচক সাজ্জাদ আহমেদ।
তাঁর মতে, জাতীয় দলের জন্য একটি শক্তিশালী পাইপলাইন তৈরির এখনই উপযুক্ত সময়। ঘরোয়া ক্রিকেটের বর্তমান বাস্তবতা দ্রুত বদলানো কঠিন হওয়ায় বিসিবির তত্ত্বাবধানে আলাদা কোচিং স্টাফ দিয়ে নারী এইচপি চালানো যেতে পারে।
এতে জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের ওপরও পারফরম্যান্সের চাপ বাড়বে বলে মনে করেন তিনি। তাঁর যুক্তি, পেছনে উঠে আসা ক্রিকেটারদের নিয়ে প্রতিযোগিতা তৈরি হলে জাতীয় দলের খেলোয়াড়দের জায়গা ধরে রাখার তাগিদ বাড়বে। তখন নতুন কিছু করার সাহসও তৈরি হতে পারে।
এশিয়ান গেমসের পর পরিবর্তনের আভাস
বিসিবির একটি সূত্রের বরাতে জানা গেছে, এশিয়ান গেমস শেষ হওয়ার পর নারী ক্রিকেটে বেশ কিছু পরিবর্তন আনার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। কোচিং স্টাফ থেকে শুরু করে অধিনায়কত্ব—বিভিন্ন বিষয় পর্যালোচনা করা হতে পারে।
বর্তমানে নারী দলে পুরোপুরি স্থানীয় কোচিং স্টাফ কাজ করছেন। ভবিষ্যতে আবার বিদেশি কোচ যুক্ত করার সম্ভাবনাও রয়েছে।
তবে অধিনায়ক নিগার সুলতানাকে এখনই সরিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা নেই বলে জানা গেছে। দেশের নারী ক্রিকেটের অন্যতম সেরা ব্যাটার, উইকেটকিপার ও অধিনায়ক হিসেবে তাঁর ওপর আস্থা রাখতে চায় বিসিবি।
নিগার নিজে সরে দাঁড়ালে বিকল্প হিসেবে সহ-অধিনায়ক নাহিদা আক্তারের পাশাপাশি সোবহানা মোস্তারির নামও আলোচনায় রয়েছে।
তবে এসব পরিবর্তন নিয়ে এখনই বিস্তারিত কিছু বলতে রাজি নন নারী উইংয়ের প্রধান রফিকুল ইসলাম। তাঁর বক্তব্য, এ মুহূর্তে কোনো সিদ্ধান্ত প্রকাশ্যে এলে তা চলমান দলের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এশিয়ান গেমস শেষে নারী ক্রিকেট নিয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
মূল চ্যালেঞ্জ তাই শুধু একটি ভালো জাতীয় দল তৈরি করা নয়—নিয়মিত ঘরোয়া ক্রিকেট, শক্তিশালী পাইপলাইন, উন্নত ফিটনেস ও প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশ নিশ্চিত করাই হতে পারে বাংলাদেশের নারী ক্রিকেটকে সেই একই বৃত্ত থেকে বের করে আনার প্রধান পথ।