ঢাকা

মারিব-তাইজে হুতিদের অগ্রগতি কেন গুরুত্বপূর্ণ, ইরান যুদ্ধে চাপে সৌদি-যুক্তরাষ্ট্র

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
ইয়েমেনে হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে দেশটির সরকারি বাহিনীর লড়াই নতুন করে তীব্র হয়ে উঠেছে। গত এক সপ্তাহে সরকারি বাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন কয়েকটি এলাকায় নিজেদের অবস্থান শক্ত করেছে ইরান-সমর্থিত হুতিরা। তাদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব-সমর্থিত সরকারি বাহিনী পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলের মারিব এবং পশ্চিমাঞ্চলের তাইজকে ঘিরে সংঘাতের তীব্রতা বেড়েছে।

মারিব ও তাইজ—দুই অঞ্চলই ইয়েমেনের চলমান যুদ্ধে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। মারিব হচ্ছে উত্তরাঞ্চলে হুতিবিরোধী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ বড় শক্ত ঘাঁটি। একই সঙ্গে অঞ্চলটি ইয়েমেনের গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসসম্পদের কেন্দ্র। অন্যদিকে, তাইজ উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন এবং লোহিত সাগর উপকূলের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

বিশ্লেষকদের মতে, হুতিরা মারিব ও তাইজে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ আরও বিস্তৃত করতে পারলে ইয়েমেনের সামরিক ও রাজনৈতিক ভারসাম্যে বড় পরিবর্তন আসতে পারে। এর প্রভাব পড়তে পারে সৌদি আরবের নিরাপত্তা এবং ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতেও।

মারিবে কেন এত লড়াই

মারিব উত্তর ইয়েমেনে হুতিবিরোধী বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা সর্বশেষ শক্ত ঘাঁটি। অঞ্চলটির নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে গেলে উত্তর ইয়েমেনে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের সামরিক ও রাজনৈতিক উপস্থিতি আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

তবে মারিবের গুরুত্ব শুধু সামরিক অবস্থানের কারণে নয়। ইয়েমেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তেল ও গ্যাসক্ষেত্রগুলোর কয়েকটি এ অঞ্চলে অবস্থিত। ফলে মারিবের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, তারা দেশটির গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামোর একটি অংশ এবং সম্ভাব্য রাজস্বের বড় উৎসের ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

ইয়েমেনের রাজনৈতিক বিশ্লেষক সাদ্দাম আল-হুরাইবি আল–জাজিরাকে বলেন, হুতিরা এক দশকের বেশি সময় ধরে মারিবের তেল ও গ্যাসসম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে আসছে। মারিবে বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে না পড়লে এ লক্ষ্য অর্জনে তারা লড়াই চালিয়ে যাবে।

তাঁর মতে, মারিবের নিয়ন্ত্রণ হুতিদের হাতে চলে গেলে ভবিষ্যতে কোনো রাজনৈতিক মধ্যস্থতার উদ্যোগে নিজেদের পক্ষে শর্ত আদায়ে গোষ্ঠীটি বাড়তি প্রভাব বিস্তার করতে পারবে।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান নিউ আমেরিকার ‘ফিউচার সিকিউরিটি প্রোগ্রাম’-এর ফেলো অ্যাডাম ব্যারনের মতে, মারিবের পতন ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও সামরিক পরিস্থিতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় তৈরি করবে।

তবে মারিবের লড়াই সহজ হবে না বলেও মনে করেন তিনি। তাঁর মতে, সরকারি বাহিনী এই যুদ্ধকে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই হিসেবে দেখবে। মারিবের নিয়ন্ত্রণ হারানো আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইয়েমেন সরকারের অনুগত বাহিনীর জন্য বড় ধরনের পরাজয় হিসেবে বিবেচিত হবে।

ভৌগোলিক অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ

মারিবের আরেকটি বড় গুরুত্ব এর ভৌগোলিক অবস্থানে। উত্তর ইয়েমেন থেকে দক্ষিণের শাবওয়া প্রশাসনিক অঞ্চল ও আল-মাহরা প্রদেশে যাওয়ার গুরুত্বপূর্ণ সড়ক মারিবের মধ্য দিয়ে গেছে। শাবওয়া আবার এডেন উপসাগর ও আরব সাগরের উপকূলের সঙ্গে যুক্ত।

ফলে মারিবের নিয়ন্ত্রণ শুধু উত্তর ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ সামরিক ভারসাম্যকেই প্রভাবিত করবে না, বরং দেশের দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের দিকে যাতায়াতের ক্ষেত্রেও তাৎপর্য তৈরি করবে।

ইয়েমেনি লেখক ও মানবাধিকারকর্মী নাবিল হেতারির মতে, মারিবে জয় হুতিদের জন্য সামরিক সাফল্যের পাশাপাশি বড় ধরনের প্রচারণামূলক সুবিধাও তৈরি করবে। এর মাধ্যমে তারা ইয়েমেনের মানুষের কাছে নিজেদের ধারাবাহিক সামরিক সাফল্যের দাবি আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারবে।

যুদ্ধের মধ্যে আটকা বেসামরিক মানুষ

মারিবকে ঘিরে সংঘাতের মানবিক প্রভাবও বড়। ইয়েমেনে দীর্ঘদিন ধরে চলা যুদ্ধের কারণে বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশের ভেতরেই বাস্তুচ্যুত হয়েছেন। রাজধানী সানা হুতিদের নিয়ন্ত্রণে যাওয়ার পর বহু বাস্তুচ্যুত পরিবার মারিব শহর ও আশপাশের এলাকায় আশ্রয় নিয়েছে।

আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার (আইওএম) ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, ইয়েমেনে প্রায় ২৮ লাখ মানুষ অভ্যন্তরীণভাবে বাস্তুচ্যুত ছিলেন। তাঁদের ৫৮ শতাংশের বেশি মারিবে অবস্থান করছিলেন।

সাম্প্রতিক লড়াইয়ে নতুন করে হাজারো মানুষের বাস্তুচ্যুত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। আইওএমের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরের শুরু থেকে ইয়েমেনে ৮৫ হাজারের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে দুই হাজারের বেশি মানুষ জিবুতির উত্তর উপকূলে আশ্রয় নিয়েছেন।

ফলে মারিবের যুদ্ধ শুধু সামরিক নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন নয়; বাস্তুচ্যুত জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা ও মানবিক সহায়তার বিষয়টিও এর সঙ্গে সরাসরি জড়িত।

তাইজ কেন গুরুত্বপূর্ণ

ইয়েমেনের পশ্চিমাঞ্চলের তাইজও নতুন করে সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। গত সপ্তাহে হুতিরা তাইজের পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নেয়। সৌদি আরব-সমর্থিত বাহিনী এখন এসব এলাকা পুনর্দখলের জন্য পাল্টা হামলা চালাচ্ছে।

সোমবার ইয়েমেনের সেনাবাহিনী একটি ভিডিও প্রকাশ করে দাবি করেছে, এতে হুতিদের অবস্থান ও যানবাহনে বোমা হামলার দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।

তাইজের কৌশলগত গুরুত্ব মূলত এর ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে। অঞ্চলটি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে থাকা উত্তরাঞ্চল, সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন দক্ষিণাঞ্চল এবং লোহিত সাগর উপকূলের মধ্যবর্তী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল।

ফলে তাইজের নিয়ন্ত্রণ যে পক্ষের হাতে থাকবে, তারা দেশের অভ্যন্তর থেকে দক্ষিণের বন্দরনগরী এডেনে অস্ত্র ও রসদ সরবরাহের ক্ষেত্রে কৌশলগত সুবিধা পেতে পারে।

রাজনৈতিক গুরুত্বের দিক থেকেও তাইজ গুরুত্বপূর্ণ। এটি ইয়েমেনের অন্যতম জনবহুল অঞ্চল। ২০১৪ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখলের পর তাইজ তাদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।

বছরের পর বছর ধরে এখানে লড়াই চলেছে। শহরে প্রবেশ ও যোগাযোগের ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সময়ে বিধিনিষেধ ছিল। ফলে তাইজে হুতিদের বড় ধরনের অগ্রগতি হলে তার সামরিক প্রভাবের পাশাপাশি প্রতীকী গুরুত্বও থাকবে।

মোখা থেকে বাব আল-মানদেব

তাইজের পশ্চিম উপকূল লোহিত সাগরের তীর ধরে ঐতিহাসিক বন্দরনগরী মোখা পর্যন্ত বিস্তৃত। গত সপ্তাহে মোখার নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার দাবি করেছে হুতিরা।

এরপর তাদের নিয়ন্ত্রণের আওতা আরও বিস্তৃত হয়েছে বাব আল-মানদেব প্রণালির দিকে। ময়ুন বা পেরিম দ্বীপও এর মধ্যে রয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। দ্বীপটি বাব আল-মানদেব প্রণালির ভেতরে অবস্থিত।

লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে বাব আল-মানদেব। ইয়েমেন ও জিবুতির মধ্যবর্তী এ সংকীর্ণ জলপথ আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর প্রস্থ প্রায় ২০ কিলোমিটার বা ১২ মাইল।

লড়াই নতুন করে তীব্র হওয়ার আগে বিশ্বের মোট বাণিজ্যের প্রায় ১২ শতাংশ এই নৌপথ দিয়ে পরিচালিত হতো বলে আল–জাজিরার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

গত শুক্রবার ময়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর বাব আল-মানদেব দিয়ে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে হুতিরা।

ইরান যুদ্ধের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত

ইয়েমেনের এই সংঘাতের আঞ্চলিক গুরুত্ব আরও বেড়েছে ইরানকে ঘিরে চলমান যুদ্ধের কারণে। হুতিদের সামরিক অগ্রযাত্রা একই সঙ্গে সৌদি আরব ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য নতুন কৌশলগত চাপ তৈরি করতে পারে।

ইয়েমেনি বিশ্লেষক ও লেখক ফুয়াদ মুসেদ বলেন, হুতিরা গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের কাছাকাছি নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করতে চায়, যাতে সমুদ্রপথে জাহাজ চলাচল হুমকির মুখে ফেলা যায়। তাঁর মতে, হরমুজ প্রণালি ও বাব আল-মানদেবকে ইরানের প্রভাবাধীন রাখার মাধ্যমে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর ওপর চাপ তৈরির কৌশলের অংশ হিসেবেও বিষয়টি দেখা যেতে পারে।

হুতিদের বাব আল-মানদেবের কাছে অবস্থান শক্ত করা সৌদি আরবের জন্য বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে তেল রপ্তানির ক্ষেত্রে সৌদি আরবের জন্য লোহিত সাগরের নৌপথ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প।

ফলে ইয়েমেনে হুতিদের সামরিক অগ্রগতি শুধু দেশটির গৃহযুদ্ধের গতিপথকেই প্রভাবিত করবে না; লোহিত সাগর ও বাব আল-মানদেবের নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যপথের ওপরও এর প্রভাব পড়তে পারে।

সামনে কী হতে পারে

মারিব ও তাইজ—দুই ফ্রন্টে হুতিদের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকলে ইয়েমেনের যুদ্ধের সামরিক ভারসাম্যে পরিবর্তন আসতে পারে। মারিব হারালে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের উত্তরাঞ্চলীয় অবস্থান বড় ধরনের চাপে পড়বে। আর তাইজ ও পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অবস্থান শক্ত হলে দক্ষিণাঞ্চল ও লোহিত সাগরের মধ্যে যোগাযোগের ওপর তাদের প্রভাব বাড়বে।

অন্যদিকে বাব আল-মানদেবের কাছে হুতিদের উপস্থিতি বাড়লে সংঘাতের প্রভাব ইয়েমেনের সীমানা ছাড়িয়ে আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্য ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকবে।

এ কারণে বর্তমানে ইয়েমেনের যুদ্ধের কেন্দ্র শুধু মারিব বা তাইজের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে গেছে দেশটির তেল-গ্যাসসম্পদ, দক্ষিণাঞ্চলের যোগাযোগপথ, লোহিত সাগরের বন্দর এবং বাব আল-মানদেবের মতো গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিয়ন্ত্রণ। আর ইরানকে ঘিরে চলমান আঞ্চলিক সংঘাতের প্রেক্ষাপটে এসব ফ্রন্টের প্রতিটি অগ্রগতি সৌদি আরব, যুক্তরাষ্ট্র এবং বৃহত্তর মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত হিসাবেও নতুন চাপ তৈরি করতে পারে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স