ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচনের মধ্য দিয়ে আগামী নভেম্বর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছিল নির্বাচন কমিশন (ইসি)। প্রথম ধাপে আগামী ১২ নভেম্বর ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখও জানিয়েছিল কমিশন। তবে সরকারের সঙ্গে আলোচনার পর সেই পরিকল্পনায় পরিবর্তন আসতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বার্ষিক পরীক্ষা, রমজান ও ঈদ এবং এরপর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষার সময় বিবেচনায় আগামী বছরের মে মাসের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে সরকারের অবস্থান জানতে চাইলে স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বুধবার প্রথম আলোকে বলেন, নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে আন্তমন্ত্রণালয় সভা ডেকেছে। সেখানে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধিরা তাঁদের মতামত এবং প্রস্তুতির অবস্থা তুলে ধরবেন। সবার মতামত পাওয়ার পর কখন নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব, সে বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। এরপর এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নির্বাচন কমিশন পরবর্তী সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, সভায় আলোচনার আগে নির্দিষ্ট কোনো সময়ের কথা বলা ঠিক হবে না।
আজ বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিয়ে এই আন্তমন্ত্রণালয় সভা হওয়ার কথা। সভায় মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, জনপ্রশাসন, স্বরাষ্ট্র, নৌপরিবহন, পররাষ্ট্র, অর্থ, তথ্য ও সম্প্রচার, স্থানীয় সরকার, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও সংস্থার কর্মকর্তাদের আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে।
কেন নভেম্বরের ভোট অনিশ্চিত
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ১২ নভেম্বর থেকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম ধাপ শুরু হওয়ার কথা ছিল। এরপর ১৩ ডিসেম্বর ও ৩০ ডিসেম্বর দ্বিতীয় ও তৃতীয় ধাপে ভোট আয়োজনের সম্ভাব্য তারিখ রাখা হয়। পরবর্তী ধাপগুলোর জন্য আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে তারিখ বিবেচনায় রাখা হয়েছিল।
তবে এসব তারিখ চূড়ান্ত নয়। ইসি নিজেই জানিয়েছে, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত নেওয়ার পর সময়সূচি চূড়ান্ত করা হবে।
সরকার-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, নির্বাচনের সময় নির্ধারণের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পরীক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচন শুধু ভোটের দিনেই সীমাবদ্ধ নয়; এর আগে প্রচার, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাপনা, ভোটকেন্দ্র প্রস্তুত করা এবং প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্বাচনী কাজে যুক্ত করার প্রয়োজন হয়। ফলে পরীক্ষার সময়ের সঙ্গে নির্বাচনের প্রস্তুতি ও আয়োজনের সংঘাত এড়াতে চায় সরকার।
২০২৬ শিক্ষাবর্ষের মাধ্যমিক ও নিম্নমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষাপঞ্জি অনুযায়ী, বার্ষিক পরীক্ষা নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহে শুরু হয়ে ডিসেম্বরের প্রথমার্ধে শেষ হওয়ার কথা। ফলে নভেম্বর-ডিসেম্বর সময়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের ওপর এর প্রভাব পড়তে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, শুধু ভোটের দিন পরীক্ষামুক্ত রাখাই যথেষ্ট নয়। ভোটকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, শিক্ষক-কর্মচারীদের নির্বাচনী দায়িত্ব এবং পরীক্ষার প্রস্তুতির বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।
এরপর রমজান ও ঈদ
বার্ষিক পরীক্ষার পর নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বিবেচনা হয়ে উঠছে রমজান ও ঈদের সময়। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো আগামী বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে রমজান শুরু এবং ১০ মার্চ ঈদুল ফিতর হওয়ার সম্ভাবনা ধরে সময় বিবেচনা করছে।
রমজান ও ঈদের সময় স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন করতে চায় না সরকার-সংশ্লিষ্ট অংশীজনেরা। ফলে নভেম্বর থেকে শুরু করে ডিসেম্বর, জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারির সম্ভাব্য সময়গুলো একে একে সংকুচিত হয়ে আসতে পারে।
এরপর ঈদের পরপরই রয়েছে এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষা। শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনুমোদিত সময়সূচি অনুযায়ী, আগামী বছরের ১৪ মার্চ পরীক্ষা শুরু হয়ে ১৫ এপ্রিল শেষ হওয়ার কথা। আগে জানুয়ারিতে এসএসসি পরীক্ষা শুরুর পরিকল্পনা থাকলেও পরে তা পরিবর্তন করা হয়েছে।
ফলে পরীক্ষা, রমজান ও ঈদের সময় বাদ দিলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য এপ্রিলের পরের সময়টিই তুলনামূলকভাবে বাস্তবসম্মত হয়ে উঠতে পারে। এ কারণে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো মনে করছে, আগামী মে মাসের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হওয়ার সম্ভাবনা কম।
তবে মে মাসেই নির্বাচন হবে—এমন কোনো সিদ্ধান্ত এখনো হয়নি। আজকের আন্তমন্ত্রণালয় সভায় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মতামত পাওয়ার পর সম্ভাব্য সময় সম্পর্কে আরও স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।
ইসির প্রাথমিক পরিকল্পনায় সাত ধাপ
গত সোমবার নির্বাচন কমিশনার আবুল ফজল মো. সানাউল্লাহ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের সম্ভাব্য সময়সূচি জানান। তাঁর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রথম ধাপে ৮০টি উপজেলার ইউনিয়ন পরিষদে আগামী ১২ নভেম্বর ভোট করার পরিকল্পনা ছিল।
প্রাথমিক পরিকল্পনায় দ্বিতীয় ধাপে ১৩ ডিসেম্বর এবং তৃতীয় ধাপে ৩০ ডিসেম্বর ভোটের সম্ভাব্য তারিখ রাখা হয়। পরবর্তী চার ধাপের জন্য আগামী বছরের ১৭ জানুয়ারি, ৪ ফেব্রুয়ারি, ২২ এপ্রিল ও ২৭ মে তারিখ বিবেচনা করা হয়েছিল।
তবে এই সম্ভাব্য সময়সূচি প্রকাশের পর সরকারের সঙ্গে আলোচনা না হওয়ার বিষয়টি সামনে আসে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম মঙ্গলবার সচিবালয়ে সাংবাদিকদের বলেন, ঘোষিত তারিখগুলোর বিষয়ে সরকার বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় অবহিত নয়। সময়সূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে চিঠি আদান-প্রদান বা অন্য কোনোভাবেও আলোচনা হয়নি।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রচলিত নিয়মে স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজনের আগে সরকারের সঙ্গে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা করা হয়। নির্বাচনের প্রস্তুতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ও বাজেটসহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নিয়ে ভোটের তারিখ নির্ধারণ করা হয়।
এরপর একই দিন ইসি সচিবালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব আখতার আহমেদ বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন। তিনি জানান, আলোচিত তারিখগুলো একেবারেই প্রাথমিক। প্রস্তুতিমূলক আলোচনার ভিত্তিতে পাঁচটি মূল ধাপের পাশাপাশি দুটি অতিরিক্ত ধাপ রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোর মতামত পাওয়ার পর কমিশন সময়সূচি চূড়ান্ত করবে।
অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন আয়োজন ও পরিচালনার সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব ইসির হলেও নির্বাচন পরিচালনার জন্য প্রশাসনিক, আইনশৃঙ্খলা ও অন্যান্য সহায়তা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার কাছ থেকে নিতে হয়। আজকের আন্তমন্ত্রণালয় সভার মূল উদ্দেশ্য সেই প্রস্তুতি ও সক্ষমতার বিষয়গুলো পর্যালোচনা করা।
ভোট বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা জামায়াতের
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে জামায়াতে ইসলামী। দলটির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে বুধবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, নানা প্রশাসনিক ও অন্যান্য অজুহাতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত করার একটি পরিকল্পিত প্রবণতা তৈরি হচ্ছে বলে তাঁরা আশঙ্কা করছেন।
তিনি বলেন, অনির্বাচিত প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার মেয়াদ দীর্ঘায়িত হলে জনগণের ভোটাধিকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিত্ব আরও পিছিয়ে যাবে।
জামায়াত দ্রুত একটি সুস্পষ্ট ও সময়বদ্ধ নির্বাচনী রূপরেখা ঘোষণার দাবি জানিয়েছে। একই সঙ্গে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তে সরকারি হস্তক্ষেপ না করারও দাবি জানিয়েছে দলটি।
তবে সরকারের পক্ষ থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন ইচ্ছাকৃতভাবে বিলম্বিত করার কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি। বরং পরীক্ষা, রমজান, ঈদ ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির মতো বাস্তব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে উপযুক্ত সময় নির্ধারণের কথা বলা হচ্ছে।
জনপ্রতিনিধি পেতে অপেক্ষা বাড়তে পারে
দেশে ইউনিয়ন পরিষদের সংখ্যা ৪ হাজার ৫৮০। এসব ইউনিয়নে সর্বশেষ বড় পরিসরে কয়েক ধাপে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল ২০২১-২২ সালে। প্রথম ধাপে ২০২১ সালের ২১ জুন ২০৪টি ইউনিয়নে ভোট হয়। এর বড় অংশ ছিল বরিশাল বিভাগে। শুধু বরিশাল জেলার নয়টি উপজেলার ৫০টি ইউনিয়নে সেদিন ভোট হয়েছিল। ওই নির্বাচনের পাঁচ বছর পূর্ণ হয়েছে গত জুনে।
তবে স্থানীয় সরকারের সব ধরনের প্রতিষ্ঠানের নির্বাচন একই সময়ে হয়নি। উপজেলা পরিষদের সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন হয়েছে ২০২৪ সালে। জেলা পরিষদের নির্বাচন হয়েছিল ২০২২ সালের অক্টোবরে। আবার ২০২৪ সালের আগস্টে ১২টি সিটি করপোরেশনের মেয়রকে অপসারণ করে সেখানে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়।
ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হলেও কোন ধরনের প্রতিষ্ঠানে আগে ভোট হবে, সেটিও আলাদাভাবে নির্ধারণ করতে হবে। বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মেয়াদ, বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থা ও নির্বাচনী প্রস্তুতি বিবেচনায় নিয়ে ধাপে ধাপে ভোট আয়োজনের পরিকল্পনা করতে হবে।
এবার স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে না। ইতিমধ্যে এ-সংক্রান্ত আইনও সংশোধন করা হয়েছে।
এদিকে মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়া ইউনিয়ন পরিষদগুলোর বিষয়টিও নির্বাচন নিয়ে আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বরিশালের ১৯টি ইউনিয়নে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের আরও অনেক স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানও বর্তমানে প্রশাসকদের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে।
ফলে নির্বাচন যদি আগামী মে মাস পর্যন্ত পিছিয়ে যায়, তাহলে এসব প্রতিষ্ঠানে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি পাওয়ার জন্য স্থানীয় বাসিন্দাদের অপেক্ষার সময় আরও দীর্ঘ হবে। একদিকে নির্বাচন আয়োজনের ক্ষেত্রে পরীক্ষা, রমজান ও প্রশাসনিক প্রস্তুতির মতো বিষয়গুলো বিবেচনা করতে হচ্ছে; অন্যদিকে দীর্ঘদিন অনির্বাচিত ব্যবস্থায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান পরিচালনার প্রশ্নও সামনে থাকছে।
আজকের আন্তমন্ত্রণালয় সভার পর স্থানীয় সরকার নির্বাচনের সম্ভাব্য সময় নিয়ে এই দুই দিকের মধ্যে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে বিষয়ে আরও স্পষ্টতা পাওয়ার কথা রয়েছে।