ঢাকা

মক্কার আকাশে হুতিদের ড্রোনের অভিযোগ, নিরাপত্তা সতর্কতা সৌদি আরবে

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : ইং
পবিত্র মক্কা নগরীর দিকে ইয়েমেনের ইরানপন্থী হুতিদের একটি ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ করেছে সৌদি আরব। সৌদি কর্তৃপক্ষের দাবি, ড্রোনটি শনাক্ত করে সংরক্ষিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয়েছে। তবে মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ সরাসরি অস্বীকার করেছে হুতিরা।

হুতিদের সঙ্গে সৌদি আরবের নতুন করে উত্তেজনা বাড়ার মধ্যেই মক্কা অভিমুখে ড্রোন পাঠানোর এ অভিযোগ সামনে এলো। এ ঘটনার পর মক্কা নগরীসহ দেশটির কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সাময়িক নিরাপত্তা সতর্কতাও জারি করা হয়।

মক্কা অভিমুখী ড্রোন ভূপাতিতের দাবি

ইয়েমেনে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল–মালিকি দাবি করেছেন, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষা বাহিনী একটি শত্রুপক্ষের ড্রোন শনাক্ত করে। ড্রোনটি সংরক্ষিত আকাশসীমায় প্রবেশের আগেই ভূপাতিত করা হয় বলে জানান তিনি।

তুর্কি আল–মালিকি এ ঘটনাকে মুসল্লিদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি এবং বেসামরিক মানুষের ক্ষতি করার চেষ্টা হিসেবে বর্ণনা করে নিন্দা জানান।

তিনি বলেন, মুসলিমদের পবিত্র দুই মসজিদ—মসজিদুল হারাম ও মসজিদে নববি—এবং মুসল্লিদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।

সৌদি কর্তৃপক্ষের এ বক্তব্য অনুযায়ী, ড্রোনটি মক্কা নগরীর দিকে যাচ্ছিল। তবে সেটি কোথা থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছিল কিংবা ড্রোনটি ঠিক কী ধরনের ছিল, সে বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হয়নি।

মক্কায় সাময়িক নিরাপত্তা সতর্কতা

ড্রোন শনাক্ত ও ভূপাতিত করার ঘটনার পর মক্কা নগরীতে নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করে সৌদি সরকার। তবে কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেই সতর্কতা তুলে নেওয়া হয়।

একই ধরনের সতর্কতা তাইফ ও সৌদি আরবের দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর জেদ্দাতেও জারি করা হয়েছিল।

২০১৭ সালে হুতিদের বিরুদ্ধে মক্কা নগরী লক্ষ্য করে হামলার চেষ্টা চালানোর অভিযোগ উঠেছিল। এরপর এবারই প্রথম মক্কায় এ ধরনের নিরাপত্তা সতর্কতা জারি করা হলো বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পবিত্র নগরী মক্কায় মসজিদুল হারাম অবস্থিত। প্রতিবছর বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে বিপুলসংখ্যক মুসল্লি হজ ও ওমরাহ পালনের জন্য সেখানে যান। ফলে মক্কাকে ঘিরে যেকোনো নিরাপত্তা হুমকির বিষয়টি সৌদি কর্তৃপক্ষের জন্য বিশেষভাবে সংবেদনশীল।

অভিযোগ অস্বীকার হুতিদের

তবে সৌদি আরবের অভিযোগ সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে হুতিরা। মক্কা বা অন্য কোনো পবিত্র স্থানকে লক্ষ্য করে হামলার হুমকি বা চেষ্টা করার অভিযোগকে তারা ‘ভুল তথ্য’ বলে অভিহিত করেছে।

ইয়েমেনের সরকারি বার্তা সংস্থা সাবা মঙ্গলবার হুতিদের একটি বিবৃতি প্রকাশ করে। এতে সংগঠনটির একটি সামরিক সূত্র মক্কা ও অন্যান্য পবিত্র স্থানের প্রতি হুতিদের কোনো হুমকি থাকার অভিযোগ জোরালোভাবে অস্বীকার করে।

বিবৃতিতে বলা হয়, ‘মক্কা নগরী ও অন্য কোনো পবিত্র স্থানের প্রতি ইয়েমেন থেকে হুমকি রয়েছে—এমন অভিযোগ দ্ব্যর্থহীনভাবে অস্বীকার করছি আমরা।’

হুতিরা এর আগেও মক্কা নগরীকে লক্ষ্য করে হামলার অভিযোগ অস্বীকার করেছে। তাদের দাবি, তারা কখনোই পবিত্র স্থানগুলোকে নিশানা করে না।

সৌদি আরবের কয়েকটি শহরে হামলার অভিযোগ

মক্কা অভিমুখে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগের পাশাপাশি সৌদি আরবের আরও কয়েকটি শহরে হুতিদের হামলার অভিযোগ করেছে সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট।

জোটের এক বিবৃতিতে বলা হয়, সোমবার সৌদি আরবের দক্ষিণাঞ্চলের খামিস মুশাইত, আবহা ও তাইফ শহরের বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হুতিরা হামলা চালিয়েছে। এতে ১৩ জন বেসামরিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং সাতটি বাড়ি ও দুটি গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করা হয়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত ওই বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হুতিরা কয়েকটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে তিনটি শহরে এসব হামলা চালায়।

তবে এসব হামলার বিষয়ে হুতিদের পক্ষ থেকে পৃথক কোনো বক্তব্যের তথ্য প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।

ইয়েমেনের দীর্ঘ সংঘাতের নতুন পর্ব

সৌদি আরব ও হুতিদের বর্তমান উত্তেজনার পেছনে রয়েছে ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ। ২০১৫ সালে হুতিরা রাজধানী সানা দখল করে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার পর সংঘাত আরও তীব্র হয়। পরে হুতিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট সরাসরি যুক্ত হয়।

এরপর কয়েক বছর ধরে ইয়েমেনে সংঘাত চললেও সাম্প্রতিক সময়ে পরিস্থিতিতে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল এবং লোহিত সাগর ঘিরে হুতিদের সামরিক তৎপরতা সৌদি আরব ও দেশটির মিত্রদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

সম্প্রতি পশ্চিম ইয়েমেনে হুতিদের অগ্রযাত্রার ফলে দেশটির সরকারি বাহিনীর সঙ্গে বিদ্যমান যুদ্ধবিরতিও হুমকির মুখে পড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মোখা ও মায়ুন দ্বীপ ঘিরে কৌশলগত গুরুত্ব

ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূলে হুতিদের অগ্রযাত্রার মধ্যে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি এলাকার নিয়ন্ত্রণ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, হুতিরা লোহিত সাগরের তীরের গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরী মোখা দখলের পর বাব আল–মানদেব প্রণালির মুখে অবস্থিত মায়ুন দ্বীপের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে। এর ফলে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের সংযোগস্থলকে ঘিরে তাদের সামরিক অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে।

বাব আল–মানদেব প্রণালি আন্তর্জাতিক নৌবাণিজ্যের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি সমুদ্রপথ। লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগর ও ভারত মহাসাগরের সঙ্গে যুক্ত করা এই প্রণালির নিরাপত্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ রয়েছে।

হুতিরা এরই মধ্যে বাব আল–মানদেব প্রণালি পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকিও দিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পাল্টাপাল্টি হামলায় বাড়ছে উত্তেজনা

হুতিদের অগ্রযাত্রা ঠেকাতে সৌদি আরব–সমর্থিত ইয়েমেন সরকারের বাহিনী পাল্টা হামলা চালাচ্ছে। পাশাপাশি সৌদি নেতৃত্বাধীন সামরিক জোট হুতিদের অবস্থান লক্ষ্য করে বিমান হামলা চালিয়েছে।

জবাবে হুতিরাও সৌদি আরবের সামরিক ও বেসামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালাচ্ছে বলে সৌদি পক্ষের অভিযোগ।

এই পাল্টাপাল্টি হামলার মধ্যেই এবার মক্কার দিকে ড্রোন পাঠানোর অভিযোগ সামনে আসায় পরিস্থিতি আরও স্পর্শকাতর হয়ে উঠেছে। যদিও হুতিরা অভিযোগ অস্বীকার করেছে, পবিত্র নগরীর নিরাপত্তা নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সতর্ক অবস্থান আঞ্চলিক উত্তেজনার নতুন মাত্রার ইঙ্গিত দিচ্ছে।

নিউজটি আপডেট করেছেন : নিউজ ডেস্ক

কমেন্ট বক্স