সাইবার সুরক্ষা আইনের প্রস্তাবিত সংশোধনীর খসড়া বিরোধী মত দমনের হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে—এমন আশঙ্কা প্রকাশ করেছে বিরোধী দল। বিশেষ করে ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ ছড়ানোর দায়ে কারাদণ্ডের বিধান রাখা হলেও এসব শব্দের সংজ্ঞা স্পষ্ট না থাকায় আইনটির অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে বলে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে মত দেওয়া হয়েছে।
বিপরীতে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, রাজনীতি ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাম্প্রতিক সময়ে গালিগালাজ এবং অপপ্রচারের যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে, তা রোধে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধন প্রয়োজন। তবে এ আইনের মাধ্যমে কাউকে নিপীড়ন বা হয়রানি করা হবে না বলেও আশ্বস্ত করা হয়েছে।
মঙ্গলবার জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠকে এ নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
আলোচ্যসূচিতে না থাকলেও খসড়া নিয়ে আলোচনা
সাধারণত কোনো বিল সংসদে উত্থাপনের পর তা পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য সংশ্লিষ্ট সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হলে কমিটির বৈঠকে সেটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। তবে মঙ্গলবারের বৈঠকের নির্ধারিত আলোচ্যসূচিতে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়াটি ছিল না।
বৈঠকে কমিটির সদস্য জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ বিষয়টি আলোচনায় তোলেন। সম্প্রতি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়া নিয়ে তিনি তাঁর উদ্বেগের কথা জানান।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ প্রথম আলোকে বলেন, প্রস্তাবিত খসড়ায় গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর দায়ে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’ বলতে কী বোঝানো হয়েছে, তার স্পষ্ট সংজ্ঞা খসড়ায় নেই বলে তিনি মনে করেন।
তাঁর ভাষ্য, সংজ্ঞা স্পষ্ট না হলে আইনের অপব্যবহারের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এর ফলে সাংবাদিকদের ওপর চাপ তৈরি হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশ এবং সরকারবিরোধী মত নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার হিসেবেও আইনটি ব্যবহৃত হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।
শফিকুল ইসলাম মাসুদ বলেন, “এটি হবে মূলত কণ্ঠরোধের আইন।” এ কারণে সংশোধনীর খসড়া চূড়ান্ত করার আগে সাংবাদিক, আইন বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজসহ সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সঙ্গে আলোচনা করার প্রয়োজন রয়েছে বলেও তিনি বৈঠকে মত দেন।
‘কেউ নিপীড়িত হবে না’
সংসদ সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদের ভাষ্য অনুযায়ী, তাঁর উত্থাপিত উদ্বেগের জবাবে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে কাউকে নিপীড়িত করা হবে না।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সাইবার পরিসরে অপপ্রচার ও ক্ষতিকর কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ নিশ্চিত করাও সংশোধিত আইনের অন্যতম লক্ষ্য।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বৈঠকের আলোচনার বিষয়ে বলা হয়, গত দুই বছরে রাজনীতিতে গালিগালাজের সংস্কৃতি চালু হয়েছে, যা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের কর্মকাণ্ড থেকে সুরক্ষা দিতে সাইবার সুরক্ষা আইন কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে বৈঠকে মত দেওয়া হয়।
একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার রোধে নিজ নিজ অবস্থান থেকে সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে।
অপতথ্য ও মতপ্রকাশের সীমা নিয়ে প্রশ্ন
সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়া নিয়ে আলোচনায় মূলত দুটি বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে—একদিকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপতথ্য ও অপপ্রচার মোকাবিলা; অন্যদিকে আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকারের সুরক্ষা।
বিরোধী দলের পক্ষ থেকে বৈঠকে যে উদ্বেগ তোলা হয়েছে, তার কেন্দ্রে রয়েছে ‘গুজব’ ও ‘অপতথ্য’-এর সংজ্ঞা। এসব শব্দের সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা ছাড়া শাস্তির বিধান কার্যকর হলে কোন বক্তব্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে, তা নিয়ে অস্পষ্টতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে।
বিশেষ করে সাংবাদিকতা ও রাজনৈতিক মতপ্রকাশের ক্ষেত্রে এমন বিধান কীভাবে প্রয়োগ করা হবে, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এ কারণে খসড়াটি চূড়ান্ত করার আগে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামত নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন কমিটির সদস্য শফিকুল ইসলাম মাসুদ।
অন্যদিকে সরকারের বক্তব্য হলো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও রাজনৈতিক গালিগালাজের প্রবণতা মোকাবিলা করতেও কার্যকর আইনি কাঠামো প্রয়োজন। বৈঠকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডকে অগ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের জবাবদিহির ওপর গুরুত্ব
বৈঠকে সাইবার সুরক্ষা আইন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
সংসদ সচিবালয়ের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের দ্রুত বিস্তারের ফলে তথ্যের পাশাপাশি বিভ্রান্তিকর ও ক্ষতিকর তথ্যও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা সরকার বললেও, আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়—এ বিষয়টিও আলোচনায় উঠে এসেছে।
কমিটির প্রথম বৈঠক
মঙ্গলবারের বৈঠকটি ছিল তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রথম বৈঠক। এতে সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি আমানউল্লাহ আমান।
বৈঠকে কমিটির সদস্যদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমান, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, আশরাফ উদ্দিন, মোস্তাফিজুর রহমান বাবুল, মজিবুর রহমান, নিলোফার চৌধুরী মনি, ফাহমিদা হক, শফিকুল ইসলাম ও নাজমুন নাহার।
বৈঠকে সাইবার সুরক্ষা আইনের সংশোধনীর খসড়া নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দায়িত্বশীল আচরণ, অপপ্রচার রোধ এবং তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে জবাবদিহি নিশ্চিত করার বিষয়েও আলোচনা হয়।