জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ঘোষিত ‘জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এবার ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে যাচ্ছে না জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। দলটি জানিয়েছে, ওই দিন গোপালগঞ্জে কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণে পদযাত্রা হবে না। পরিবর্তে স্থানীয় নেতা–কর্মীদের উদ্যোগে সাংগঠনিক আলোচনা, দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ পালন করা হবে।
এনসিপির শীর্ষ নেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, এ সিদ্ধান্তের পেছনে মূল কারণ নিরাপত্তাসংক্রান্ত বিবেচনা এবং একই দিনে রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতসহ কেন্দ্রীয় কর্মসূচিতে তাঁদের ব্যস্ততা।
সোমবার থেকে শুরু হচ্ছে ‘জুলাই পদযাত্রা’
জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বর্ষপূর্তিকে সামনে রেখে ‘গণভোট বাস্তবায়ন, কর্মসংস্থান ও সীমান্ত সুরক্ষার দাবিতে জুলাই পদযাত্রা ২০২৬’ শীর্ষক মাসব্যাপী কর্মসূচি সোমবার থেকে শুরু করছে এনসিপি।
দলটি জানিয়েছে, দেশের ৬৪ জেলায় এবং নির্বাচিত ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় এ কর্মসূচি পরিচালনা করা হবে। প্রথমে প্রকাশিত সূচিতে ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জেও পদযাত্রার কর্মসূচি রাখা হয়েছিল। তবে ঘোষণার কিছু সময় পর সংশোধিত সূচিতে সেই কর্মসূচি বাদ দেওয়া হয়।
ঘোষণার পরই পরিবর্তন, শুরু হয় আলোচনা
শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলামোটরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এনসিপির জুলাই পদযাত্রার রোডম্যাপ ঘোষণা করা হয়।
সেখানে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে দলের উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম বলেন, প্রথম ধাপে যেসব উপজেলা ও পৌরসভায় দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে, তার মধ্যে গোপালগঞ্জেরও একটি পৌরসভা রয়েছে। তিনি জানান, এনসিপি ৬৪ জেলার পাশাপাশি এসব নির্বাচিত এলাকায়ও পদযাত্রা করবে।
সংবাদ সম্মেলনের পর সাংবাদিকদের দেওয়া কর্মসূচির সূচিতে ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে পদযাত্রার উল্লেখ ছিল। বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দেয়। তবে প্রায় এক ঘণ্টা পর দলটি সংশোধিত কর্মসূচি প্রকাশ করে, যেখানে গোপালগঞ্জের পদযাত্রা বাদ দেওয়া হয়। এরপর বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে–বিপক্ষে নানা প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।
‘নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু বিষয় আছে’
রোববার এ বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সারজিস আলম বলেন, ১৬ জুলাই এনসিপির শীর্ষ নেতারা রংপুরে শহীদ আবু সাঈদের কবর জিয়ারতসহ বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নেবেন।
তিনি আরও বলেন, গত বছরের ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে জুলাই পদযাত্রাকে কেন্দ্র করে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেছিল। একই তারিখে এবারও কর্মসূচি পড়ায় ‘নিরাপত্তাসংক্রান্ত কিছু বিষয়’ বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
তাঁর ভাষায়, গোপালগঞ্জে পদযাত্রার পরিবর্তে স্থানীয় নেতা–কর্মীরা সাংগঠনিক আলোচনা এবং দোয়া–মোনাজাত করবেন। ওই কর্মসূচিতে ঢাকা থেকে কেন্দ্রীয় নেতাদের কেউ অংশ নেবেন না।
গত বছরের সহিংসতার প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালে জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের প্রথম বর্ষপূর্তি উপলক্ষে ‘দেশ গড়তে জুলাই পদযাত্রা’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে এনসিপির শীর্ষ নেতারা বিভিন্ন জেলায় সফর করেছিলেন।
গোপালগঞ্জ সফরের আগে দলটির কয়েকজন নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘মার্চ টু গোপালগঞ্জ’–সহ বিভিন্ন প্রচার চালান। এর পর ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে দলটির কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে ব্যাপক উত্তেজনা সৃষ্টি হয়, যা পরে সহিংসতায় রূপ নেয়।
সে সময় সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে জেলায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয় এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি ঘটায় এলাকায় থমথমে পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
সহিংসতার পর এনসিপির দক্ষিণাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক হাসনাত আবদুল্লাহ, উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলমসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতাদের সেনাবাহিনী, পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির সহায়তায় গোপালগঞ্জ থেকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়। তাঁদের সেনাবাহিনীর সাঁজোয়া যানে ওঠার ছবি সে সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে।
সেপ্টেম্বরে গোপালগঞ্জ সফরের পরিকল্পনা
যদিও জুলাই মাসে গোপালগঞ্জে পদযাত্রা হচ্ছে না, তবে আগামী সেপ্টেম্বরে স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সেখানে যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছে এনসিপি।
দলের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরাম রাজনৈতিক পর্ষদের সদস্য সারোয়ার তুষার বলেন, এনসিপি ইতোমধ্যে ১০০টি উপজেলা ও পৌরসভায় প্রার্থী ঘোষণা করেছে এবং শিগগিরই আরও এলাকায় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে। যেসব এলাকায় দলীয় প্রার্থী থাকবে, সেসব স্থানে নির্বাচনী প্রচারের অংশ হিসেবে সেপ্টেম্বর মাসে কেন্দ্রীয় নেতারা সফর করবেন। সেই কর্মসূচির আওতায় গোপালগঞ্জেও যাওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
দলের রাজনৈতিক পর্ষদের আরেক সদস্য আলী আহসান জুনায়েদও জানিয়েছেন, এনসিপি ভবিষ্যতে গোপালগঞ্জে সাংগঠনিক কর্মসূচি পালন করবে। তবে তিনি সফরের নির্দিষ্ট সময় উল্লেখ করেননি।
এনসিপির সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ১৬ জুলাই গোপালগঞ্জে কেন্দ্রীয় নেতাদের অংশগ্রহণে পদযাত্রা না হলেও স্থানীয় পর্যায়ে ‘জুলাই শহীদ দিবস’ উপলক্ষে সাংগঠনিক আলোচনা, দোয়া ও মোনাজাতের কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হবে। দলটির ভাষ্য, নিরাপত্তা পরিস্থিতি বিবেচনায় রেখেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।