যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সাম্প্রতিক যুদ্ধ, দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির মৃত্যু এবং মধ্যপ্রাচ্যের দ্রুত পরিবর্তিত ভূরাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্যে ইরান এখন এক নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করেছে। দেশটির ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে নতুন এক প্রজন্মের নেতৃত্ব, যাদের রাজনৈতিক ও সামরিক কৌশল আগের নেতৃত্বের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী, দ্রুত সিদ্ধান্তনির্ভর এবং প্রয়োজন হলে আরও আক্রমণাত্মক বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
বিবিসির এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তন শুধু ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং এর প্রভাব পুরো মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষমতার ভারসাম্য এবং যুক্তরাষ্ট্রসহ আঞ্চলিক শক্তিগুলোর কৌশলেও পড়তে পারে।
যুদ্ধবিরতি, কিন্তু অনিশ্চয়তা কাটেনি
গত মাসে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি প্রশমিত হয়নি। ফ্রান্সের ভার্সাই প্রাসাদে স্বাক্ষরিত ওই চুক্তিকে অনেক বিশ্লেষক ঐতিহাসিক ১৯১৯ সালের ভার্সাই চুক্তির সঙ্গে তুলনা করেছেন।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটানো সেই চুক্তি যেমন ইউরোপের রাজনৈতিক মানচিত্র বদলে দিয়েছিল, তেমনি অনেকের প্রশ্ন—ইরানের সঙ্গে হওয়া নতুন চুক্তিও কি ভবিষ্যতে মধ্যপ্রাচ্যের রাজনীতিতে বড় কোনো মোড় তৈরি করবে?
যদিও যুদ্ধবিরতি এখনো মোটামুটি কার্যকর রয়েছে, তবে হরমুজ প্রণালি ও আশপাশের এলাকায় বিচ্ছিন্ন সংঘর্ষ অব্যাহত রয়েছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, যুদ্ধের মূল কারণগুলোর কোনো স্থায়ী সমাধান এখনো হয়নি। ফলে পুরো অঞ্চল এখনো গভীর অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে।
খামেনির মৃত্যু, নতুন যুগের সূচনা
যুদ্ধের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়েছে ইরানের নেতৃত্বে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলায় দেশটির দীর্ঘদিনের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি নিহত হওয়ার পর ইরানের ক্ষমতার কাঠামোতে বড় পরিবর্তন আসে। একই হামলায় তেহরানের সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকজনও নিহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এটি কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন নয়; বরং ইরানের রাষ্ট্র পরিচালনার দর্শন ও কৌশলেও পরিবর্তনের সূচনা।
‘দাবার ছক নতুন করে সাজানো হয়েছে’
জনস হপকিনস স্কুল অব অ্যাডভান্সড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজ–এর আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক অধ্যাপক ভ্যালি নাসর মনে করেন, এই যুদ্ধের প্রভাব অনেক গভীর।
তাঁর ভাষায়, বড় ধরনের যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক রাজনীতির দাবার ছক নতুন করে সাজিয়ে দেয়। মধ্যপ্রাচ্যের ক্ষেত্রেও এবার ঠিক সেটিই ঘটছে।
তিনি বলেন, ইরানে এখন পুরোপুরি নতুন এক প্রজন্ম ক্ষমতায় এসেছে। যুদ্ধ পরিচালনার পাশাপাশি এখন তারাই শান্তি আলোচনা এগিয়ে নিচ্ছে এবং তাদের লক্ষ্য আগের নেতৃত্বের তুলনায় অনেক বেশি সুস্পষ্ট।
অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যেও টিকে থাকা
যুদ্ধের আগেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কারণে ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরে চাপে ছিল। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে আগের সংঘাতের ক্ষতও তখন পুরোপুরি কাটিয়ে উঠতে পারেনি দেশটি।
অন্যদিকে, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। যুক্তরাষ্ট্র দাবি করেছিল, তারা ইরানের পারমাণবিক সক্ষমতা প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছে। যদিও বিশ্লেষকদের মতে, কর্মসূচিটি পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি, তবে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে।
ইরানের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের বড় অংশ কোথায় রয়েছে, তা এখনো নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি। ধারণা করা হচ্ছে, উল্লেখযোগ্য অংশ ইসফাহান পারমাণবিক স্থাপনার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে।
‘প্রতিরোধ অক্ষ’ও দুর্বল হয়েছে
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের অন্যতম কৌশলগত শক্তি ছিল তাদের মিত্রদের নিয়ে গঠিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’ বা ‘প্রতিরোধ অক্ষ’।
কিন্তু যুদ্ধের আগে ও পরে এই জোট একের পর এক ধাক্কা খেয়েছে।
সিরিয়ায় ঘনিষ্ঠ মিত্র বাশার আল-আসাদ সরকারের পতন হয়েছে।
লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহ নেতৃত্বের বড় অংশ ইসরায়েলি হামলায় নিহত হয়েছে।
হামাস গাজায় ভয়াবহ সামরিক চাপের মুখে পড়েছে।
ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরাও যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও ইসরায়েলের ধারাবাহিক হামলার শিকার হয়েছে।
এসব ঘটনার পর অনেকেই মনে করেছিলেন, ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরান হয়তো অস্তিত্ব সংকটে পড়বে।
কিন্তু বাস্তবে তা ঘটেনি।
বদলে গেছে ক্ষমতার কেন্দ্র
বর্তমান ইরানের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন ঘটেছে নেতৃত্বে।
নতুন সর্বোচ্চ নেতা মোজতবা খামেনির বয়স ৫৬ বছর। তিনি তাঁর বাবা আলী খামেনির তুলনায় অনেক কম বয়সী এবং যুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতায় দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন।
বর্তমান প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানের বয়স ৭১ বছর হলেও ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের মূল নেতৃত্বের কেউ এখন আর ক্ষমতার কেন্দ্রে নেই।
ক্ষমতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দুই ব্যক্তি হলেন—
পার্লামেন্টের স্পিকার ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার প্রধান সমন্বয়কারী মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ।
ইসলামি রেভোল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি)–এর প্রধান কমান্ডার আহমদ ভাহিদি।
বিশ্লেষকদের মতে, এই নতুন নেতৃত্বের প্রায় সবাই আইআরজিসির সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত।
চ্যাথাম হাউসের পরিচালক সানাম ভাকিল বলেন, নতুন নেতৃত্ব ‘বিপ্লবের সন্তান’। তাঁদের রাজনৈতিক চিন্তা ও রাষ্ট্র পরিচালনার ধরন আগের প্রজন্মের তুলনায় আলাদা।
আগের তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক
বিশ্লেষকদের মতে, আলী খামেনির সময় ইরানের নীতি ছিল অনেকটা ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’—অর্থাৎ সীমিত উত্তেজনা বজায় রেখে সরাসরি বড় সংঘাতে না জড়ানো।
কিন্তু নতুন নেতৃত্ব সেই অবস্থান থেকে সরে এসেছে।
সাম্প্রতিক যুদ্ধে ইরান সরাসরি অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
বাহরাইনে যুক্তরাষ্ট্রের পঞ্চম নৌবহরের সদর দপ্তর, কাতারের আল-উদাইদ বিমানঘাঁটিসহ একাধিক স্থাপনায় হামলা হয়। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি সাময়িকভাবে বন্ধ করে দিয়ে বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থাকেও বড় চাপের মুখে ফেলে তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, এই পদক্ষেপগুলো দেখিয়েছে যে নতুন নেতৃত্ব প্রয়োজনে ঝুঁকি নিতে আগের চেয়ে বেশি প্রস্তুত।
বদলে যাচ্ছে উপসাগরীয় অঞ্চলের সমীকরণ
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের ইরান প্রকল্পের পরিচালক আলী ভায়েজ বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এতদিন মনে করত, তাদের ভূখণ্ডে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি থাকাই নিরাপত্তার নিশ্চয়তা।
কিন্তু সাম্প্রতিক যুদ্ধে সেই ঘাঁটিগুলোই হামলার লক্ষ্যবস্তু হয়ে ওঠে।
তাঁর মতে, এর ফলে উপসাগরীয় দেশগুলো এখন যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চয়তা এবং নিজেদের প্রতিরক্ষা কৌশল—দুটিই নতুন করে মূল্যায়ন করছে।
বিভিন্ন কূটনৈতিক সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি আরবসহ কয়েকটি উপসাগরীয় দেশ ইতোমধ্যে ইরানের সঙ্গে সম্পর্ক আরও উন্নত করার উদ্যোগ নিয়েছে। এমনকি আঞ্চলিক উত্তেজনা কমাতে ইরান ও উপসাগরীয় দেশগুলোকে নিয়ে একটি সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তুতিও চলছে বলে জানা গেছে।
নতুন নেতৃত্ব, নতুন কৌশল
বিশ্লেষকদের মতে, ইরানের নতুন নেতৃত্ব আদর্শগত অবস্থান ধরে রাখলেও কৌশলগতভাবে আগের প্রজন্মের তুলনায় অনেক বেশি বাস্তববাদী ও অভিযোজনক্ষম। তারা প্রয়োজন হলে সরাসরি সামরিক শক্তি প্রয়োগ করছে, আবার একই সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনায়ও অংশ নিচ্ছে।
এই পরিবর্তন মধ্যপ্রাচ্যের ভবিষ্যৎ রাজনীতিকে কোন দিকে নিয়ে যাবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট—আলী খামেনি-পরবর্তী ইরান আর আগের ইরান নয়। নতুন নেতৃত্বের অধীনে দেশটির অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার ভারসাম্য, সামরিক কৌশল এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে একটি নতুন যুগের সূচনা হয়েছে, যার প্রভাব আগামী কয়েক বছর মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।