একটি ফোনকল বদলে দিয়েছিল তিন ভাইয়ের পুরো জীবন। ২০০৯ সালে আন্তর্জাতিক পুলিশ সংস্থা ইন্টারপোল থেকে স্কটল্যান্ডের এক পরিবারের কাছে আসে সেই ফোন। জানানো হয়, ৫৩ বছর বয়সী জিন হ্যানলন গ্রিসের ক্রিট দ্বীপে নিখোঁজ হয়েছেন।
প্রথমে নিখোঁজ, পরে মরদেহ উদ্ধার, এরপর মৃত্যুকে ‘দুর্ঘটনা’ হিসেবে ঘোষণা—সব মিলিয়ে মামলাটি যেন ধীরে ধীরে চাপা পড়ছিল। কিন্তু হ্যানলনের তিন ছেলে রবার্ট, ডেভিড ও মাইকেল পোর্টার মায়ের মৃত্যুকে দুর্ঘটনা হিসেবে মেনে নেননি। তাঁদের নিরলস ১৭ বছরের লড়াই, নতুন তদন্ত এবং আদালতের বিচারের পর অবশেষে প্রমাণিত হয়েছে, এটি ছিল একটি হত্যাকাণ্ড।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের শেষে আদালত এক ব্যক্তিকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করলেও আপিল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত তাঁকে কারাগারে যেতে হবে না। ফলে রায়ের পরও পুরোপুরি স্বস্তি পাননি নিহতের পরিবার।
একটি ফোনকল, তারপর জীবনের মোড় ঘুরে যায়
ঘটনার সময় মাইকেল পোর্টার ইংল্যান্ডের ম্যানসফিল্ডে থাকতেন। বড় ভাই রবার্ট ফোন করে জানান, ইন্টারপোল থেকে খবর এসেছে—তাঁদের মা গ্রিসে নিখোঁজ।
মাইকেলের ভাষায়, প্রথম প্রতিক্রিয়াই ছিল, ‘মা নিখোঁজ মানে কী?’
তিনি বলেন, তখনই সবচেয়ে খারাপ আশঙ্কা মনে এসেছিল। তবে সামনে আরও ভয়াবহ বাস্তবতা অপেক্ষা করছে, তা কল্পনাও করেননি।
জিন হ্যানলনের ক্রিট দ্বীপে একটি বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুর দেখাশোনার দায়িত্ব নেওয়ার কথা ছিল। সময়মতো তিনি সেখানে না পৌঁছানোয় উদ্বেগ তৈরি হয় এবং পরে তাঁকে খুঁজতে শুরু করে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
মায়ের মরদেহ শনাক্তের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা
সংবাদ পেয়ে তিন ভাই গ্রিসে ছুটে যান।
প্রথমে তাঁদের জানানো হয়েছিল, হেরাক্লিয়নের একটি জলাশয় থেকে প্রায় ৩০ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধার হয়েছে। যেহেতু তাঁদের মায়ের বয়স ছিল ৫৩ বছর, তাই কিছুটা আশাবাদী ছিলেন তাঁরা।
কিন্তু হাসপাতালের মর্গে গিয়ে একগাদা কাপড়ের মধ্যে মায়ের পোশাক দেখে তাঁদের সব আশা শেষ হয়ে যায়।
মাইকেল বলেন, ভাইরা তাঁকে মানসিকভাবে প্রস্তুত করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তিনি জানতেন, যদি মরদেহটি তাঁর মায়ের হয়, তাহলে সেটিই হবে শেষ দেখা।
তিনি বলেন, সবচেয়ে কষ্টের বিষয় ছিল, মাকে ছুঁয়ে দেখার বা শেষবারের মতো জড়িয়ে ধরারও সুযোগ পাননি।
দুর্ঘটনা নয়, হত্যার সন্দেহ
মরদেহ দেখেই তিন ভাইয়ের মনে সন্দেহ তৈরি হয়।
হ্যানলনের মাথার পেছনে গুরুতর আঘাতের চিহ্ন ছিল। শরীরের বিভিন্ন স্থানে আরও একাধিক জখমও দেখা যায়।
জানা যায়, নিখোঁজ হওয়ার রাতে হেরাক্লিয়নের একটি ক্যাফেতে এক ব্যক্তির সঙ্গে তাঁকে দেখা গিয়েছিল।
তবে এসব তথ্য থাকা সত্ত্বেও গ্রিক কর্তৃপক্ষ প্রথমে ঘটনাটিকে দুর্ঘটনা হিসেবে ঘোষণা করে।
পরিবার এই সিদ্ধান্ত মেনে নেয়নি। তারা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পুনঃপর্যালোচনার দাবি জানায়।
দুই বছর পর পুনঃবিশ্লেষণে বিশেষজ্ঞরা জানান, শরীরের কিছু আঘাত ধস্তাধস্তির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
মাইকেল বলেন, তাঁরা লড়াই চালিয়ে না গেলে এসব গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হয়তো কখনোই সামনে আসত না।
বারবার থেমে গেছে তদন্ত
জিন হ্যানলন একসময় স্কটল্যান্ডের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান এনএইচএসে কাজ করতেন। পরে তিনি গ্রিসে চলে যান এবং পর্যটন খাতে কাজ শুরু করেন।
ক্রিট দ্বীপকে তিনি নিজের দ্বিতীয় বাড়ি মনে করতেন।
সেই জায়গাতেই তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু পরিবারের কাছে আরও বেদনাদায়ক হয়ে ওঠে।
পরবর্তী কয়েক বছরে গ্রিক কর্তৃপক্ষ চারবার মামলার তদন্ত বন্ধ করে আবার চালু করে।
একপর্যায়ে দুই ব্যক্তিকে ভুলভাবে সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
গ্রিসের জনপ্রিয় অপরাধবিষয়ক টেলিভিশন অনুষ্ঠান ‘ক্রাইমওয়াচ’–এ ঘটনাটি প্রচারিত হয়। এরপরও তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়নি।
১৭ বছর পর নতুন মোড়
২০১৯ সালে মাইকেল ও তাঁর ভাইয়ের মেয়ে রেবেকা আবার ক্রিটে যান।
তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, মামলাটি আবার জনসমক্ষে তুলে ধরা এবং তদন্তে নতুন গতি আনা।
তবুও তেমন কোনো অগ্রগতি হয়নি।
অবশেষে ২০২৩ সালের শেষ দিকে তিন ভাই নিজেদের অর্থায়নে বেসরকারি তদন্তকারী হ্যারিস ভেরামন এবং তাঁর সহকর্মী নিকোস আরকুলিসকে নিয়োগ দেন।
সেখান থেকেই মামলার মোড় ঘুরতে শুরু করে।
ডায়েরিতেই মিলল গুরুত্বপূর্ণ সূত্র
নতুন তদন্তে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয় জিন হ্যানলনের ব্যক্তিগত ডায়েরিকে।
ডায়েরিতে এমন এক ব্যক্তির কথা উল্লেখ ছিল, যার সঙ্গে ২০০৯ সালের শুরুতে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। কিন্তু পরে তিনি সেই সম্পর্ক শেষ করে দেন।
তদন্তকারীদের ধারণা, ওই ব্যক্তি সম্পর্ক ভেঙে যাওয়াকে মেনে নিতে পারেননি।
তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, তিনি ছিলেন এক ‘প্রত্যাখ্যাত প্রেমিক’, যিনি ভুলভাবে বিশ্বাস করেছিলেন যে হ্যানলনের অন্য কারও সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে।
পুনঃতদন্তে সাক্ষীদের বক্তব্য, পুরোনো তথ্য এবং বিভিন্ন পরিস্থিতিগত প্রমাণ বিশ্লেষণ করে নিশ্চিত হওয়া যায়, নিখোঁজ হওয়ার রাতে ওই ব্যক্তির সঙ্গেই শেষবার দেখা গিয়েছিল হ্যানলনকে।
যদিও মামলায় কোনো সিসিটিভি ফুটেজ বা ডিএনএ প্রমাণ ছিল না, তবুও পরিস্থিতিগত প্রমাণ আদালতে অভিযোগ গঠনের জন্য যথেষ্ট বলে বিবেচিত হয়।
আদালতে সাক্ষ্য ও দোষী সাব্যস্ত
মায়ের মরদেহ শনাক্ত করার ১৭ বছর পর তিন ভাই আবার ক্রিটে যান—এবার আদালতে সাক্ষ্য দিতে।
বিচারের দ্বিতীয় দিনে মামলার গুরুত্বপূর্ণ মোড় আসে।
সন্দেহভাজন ব্যক্তির বোন আদালতে জানান, তাঁর ভাই মানসিক সমস্যায় ভুগতেন এবং নিয়মিত ওষুধ না খেলে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতেন।
সরকারি কৌঁসুলিদের দাবি, হ্যানলনের সঙ্গে সম্পর্ক চলাকালে অভিযুক্ত ব্যক্তি নিয়মিত ওষুধ সেবন করছিলেন না।
অভিযুক্তের বক্তব্যেও একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে।
ফরেনসিক বিশেষজ্ঞের সাক্ষ্যে স্পষ্ট হয় হত্যার চিত্র
আদালতে ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ জানান, জিন হ্যানলনের মৃত্যুর প্রধান কারণ ছিল মাথার পেছনে জোরালো আঘাত।
তাঁর মতে, হ্যানলনকে যখন পানিতে ফেলে দেওয়া হয়, তখনও তিনি সম্ভবত জীবিত ছিলেন।
এই সাক্ষ্য মামলার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হিসেবে বিবেচিত হয়।
১৭ বছর পর মিলল ন্যায়বিচার
শেষ পর্যন্ত বিচারক ও জুরিবোর্ড প্রায় তিন ঘণ্টা আলোচনার পর অভিযুক্তকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করেন।
তবে মানসিক অসুস্থতার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে আদালত তাঁর দায় আংশিকভাবে লঘু করেন।
তাঁকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হলেও আপিলের শুনানি শেষ না হওয়া পর্যন্ত কারাগারে যেতে হবে না।
গ্রিসের আইন অনুযায়ী, আপিলসহ সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত দোষী ব্যক্তির পরিচয় প্রকাশ করা হয় না।
‘অবশেষে মায়ের কথা শোনা হয়েছে’
রায় ঘোষণার পর আদালতের বাইরে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিন ভাই।
মাইকেল পোর্টার বলেন, সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো, ‘আমার মা অবশেষে মুক্তি পেয়েছেন।’
তবে আপিল চলাকালে দণ্ডপ্রাপ্ত ব্যক্তির মুক্ত থাকা তাঁদের জন্য উদ্বেগের বিষয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
বড় ছেলে রবার্ট পোর্টার বলেন, অচেনা মানুষদের নিয়ে গঠিত একটি জুরি তাঁদের মায়ের কথা শুনেছে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এটাই তাঁর সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
মেজ ছেলে ডেভিড পোর্টার বলেন, তিনি চান অভিযুক্তকে অবিলম্বে কারাগারে পাঠানো হোক।
‘এটি ন্যায়বিচারের বিজয়’
পরিবারটির আইনজীবী অ্যাসপোস্টোলোস জিরিটাকিস, যিনি ২০১২ সাল থেকে মামলাটি পরিচালনা করছেন, বলেন, এটি তাঁর পেশাজীবনের সবচেয়ে দীর্ঘ মামলা।
তাঁর ভাষায়, ১৭ বছরের লড়াইয়ের পর পরিবারটি অন্তত এই অনুভূতি পেয়েছে যে তারা ন্যায়বিচার অর্জন করেছে।
তবে আইনি লড়াই এখনো শেষ হয়নি। কারণ, আপিলের প্রক্রিয়া বাকি রয়েছে।
তারপরও দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের সংগ্রামের পর তিন ভাই অন্তত একটি বিষয় নিশ্চিত করতে পেরেছেন—যে মৃত্যুকে একসময় দুর্ঘটনা বলে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল, সেটি ছিল পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড।