বাংলাদেশের বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, জাতীয় সংসদের সাবেক স্পিকার, সাবেক অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি এবং বিশিষ্ট আইনজীবী ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার আর নেই। রোববার (১২ জুলাই) ভোরে রাজধানীর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর।
বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান জানান, ভোর প্রায় ৪টার দিকে রাজধানীর শ্যামলীর স্পেশালাইজড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যু হয়।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক, বিচারিক ও সাংবিধানিক অঙ্গনে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। রাষ্ট্রীয় ও রাজনৈতিক বিভিন্ন মহল তাঁর দীর্ঘ কর্মজীবনের অবদান স্মরণ করে গভীর শোক প্রকাশ করেছে।
রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় জানাজা ও দাফন
সংসদ সচিবালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের জানাজা রোববার বিকেল ৫টায় জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় অনুষ্ঠিত হবে। জানাজা শেষে সংসদ ভবনের নির্ধারিত কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হবে।
এর আগে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল, তাঁর মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজার জন্য তিনটি পৃথক আয়োজন রাখা হবে। প্রথমে ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদে, পরে সুপ্রিম কোর্ট প্রাঙ্গণে এবং সর্বশেষ জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় জানাজা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। পরে সংসদ সচিবালয় জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত জানাজার সময়সূচি নিশ্চিত করে।
প্রধানমন্ত্রীর শোক
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী এক শোকবার্তায় মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং তাঁর শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের প্রতি আন্তরিক সমবেদনা জানান।
শোকবার্তায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের সংসদীয় গণতন্ত্র, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র পরিচালনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন। তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ভূমিকা জাতি গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে।
বিশিষ্টজনদের শোক
বর্ষীয়ান এই রাজনীতিকের মৃত্যুতে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ, ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল, চিফ হুইপ মো. নূরুল ইসলাম, তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস এবং বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর পৃথক শোকবার্তায় গভীর দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
তাঁরা ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের কর্মময় জীবনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে বলেন, তিনি দেশের গণতান্ত্রিক চর্চা, সংসদীয় কার্যক্রম এবং আইন পেশায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে গেছেন।
সুপ্রিম কোর্টে অর্ধদিবস কার্যক্রম বন্ধ
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে রোববার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ ও হাইকোর্ট বিভাগের কার্যক্রম দিনের দ্বিতীয় ভাগে (অর্ধবেলা) বন্ধ রাখা হয়েছে।
এ ছাড়া আপিল বিভাগের চেম্বার কোর্টের কার্যক্রমও এদিন বন্ধ থাকবে।
সুপ্রিম কোর্টের গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলাম এক বার্তায় এ তথ্য জানান।
এদিকে প্রধান বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরীও ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেছেন এবং তাঁর বিদেহী আত্মার শান্তি কামনা করেছেন।
বিএনপির একদিনের শোক কর্মসূচি
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকারের মৃত্যুতে আগামী সোমবার (১৩ জুলাই) ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণসহ সারা দেশে একদিনের শোক কর্মসূচি ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)।
দলটির ঘোষিত কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সব দলীয় কার্যালয়ে কালো পতাকা উত্তোলন করা হবে। একই সঙ্গে বিএনপির নেতাকর্মীরা কালো ব্যাজ ধারণ করে মরহুমের প্রতি শ্রদ্ধা জানাবেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক জীবন
ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার বাংলাদেশের রাজনীতি ও আইন অঙ্গনের একজন অভিজ্ঞ ও সম্মানিত ব্যক্তিত্ব ছিলেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার, অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি, মন্ত্রিসভার সদস্য এবং সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির জ্যেষ্ঠ আইনজীবী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
সংসদ পরিচালনা, সাংবিধানিক প্রক্রিয়া শক্তিশালীকরণ এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সম্পৃক্ত বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য হয়ে থাকবে বলে বিভিন্ন মহল মনে করছে।
তাঁর মৃত্যুতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে এক অভিজ্ঞ সংসদীয় ব্যক্তিত্বের অধ্যায়ের অবসান ঘটল।