দীর্ঘ দেড় মাসের বেশি সময় পর দেশে গ্যাস সরবরাহ কিছুটা বাড়ানো হয়েছে। শিল্পকারখানায় গ্যাসের সংকট কমাতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনার পর সোমবার রাত থেকেই সরবরাহ বাড়তে শুরু করে। মঙ্গলবার তা আরও কিছুটা বৃদ্ধি পেয়েছে।
পেট্রোবাংলার কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বাড়তি গ্যাসের ক্ষেত্রে শিল্প খাতকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে অতিরিক্ত সরবরাহের বড় অংশই শিল্পকারখানায় পাঠানো হচ্ছে।
এলএনজি আমদানি ও সরবরাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মহেশখালীর ভাসমান টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ডের পর গ্যাস সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটে। পরে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে কয়েকটি এলএনজি কার্গো দেশে পৌঁছাতে দেরি হওয়ায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে সময় লাগে। বর্তমানে কার্গো আসা আবার নিয়মিত হয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট। তবে এত দিন ২৬৫ থেকে ২৭০ কোটি ঘনফুট সরবরাহের মাধ্যমে চাহিদা সামাল দিতে হয়েছে। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেছে।
সোমবার রাত ১০টায় এলএনজি থেকে ৯৮ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। মঙ্গলবার রাত আটটার দিকে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১০১ কোটি ঘনফুটে। ওই সময়ে মোট গ্যাস সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৩ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে এসেছে ১৬২ কোটি ঘনফুট।
এর আগে ২১ জুলাই মহেশখালীতে মার্কিন কোম্পানি এক্সিলারেট পরিচালিত ভাসমান টার্মিনালে আগুন লাগার পর সেখান থেকে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। দুর্ঘটনার আগে দৈনিক সরবরাহ ছিল প্রায় ২৬৪ কোটি ঘনফুট। তখন এলএনজি থেকে পাওয়া যেত প্রায় ৯৯ কোটি ঘনফুট। বর্তমানে এলএনজি সরবরাহ প্রায় আগের পর্যায়ে থাকলেও দেশীয় গ্যাস উৎপাদন প্রায় ৪ কোটি ঘনফুট কমেছে।
সেপ্টেম্বরে এলএনজি আসছে ৯টি কার্গো
পেট্রোবাংলা ও আরপিজিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, চলতি সেপ্টেম্বরে ১০টি এলএনজি কার্গো আনার পরিকল্পনা ছিল। দরপত্রের মাধ্যমে সবগুলো সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দামও বেড়েছে। শেষ পর্যন্ত ৯টি কার্গো নিশ্চিত হয়েছে।
এর মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গানভর থেকে দুটি, স্বল্পমেয়াদি চুক্তিতে আরামকো থেকে দুটি এবং স্পট মার্কেট থেকে পাঁচটি কার্গো কেনা হয়েছে।
আরপিজিসিএল জানিয়েছে, এ মাসে আরামকোর দুটি এবং ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম ও পস্কোর একটি করে কার্গো ইতিমধ্যে দেশে এলএনজি সরবরাহ করেছে। পরবর্তী সময়ে ১৬ সেপ্টেম্বর গানভর, ১৮ সেপ্টেম্বর আরামকো, ২৩ সেপ্টেম্বর টোটাল এনার্জি, ২৫ সেপ্টেম্বর আরামকো এবং ২৮ সেপ্টেম্বর গানভরের কার্গো আসার কথা রয়েছে।
অক্টোবরে ১১টি এলএনজি কার্গো সংগ্রহের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে আটটি ইতিমধ্যে নিশ্চিত হয়েছে। বাকি তিনটির জন্য মঙ্গলবার দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে।
শিল্পকারখানায় চাপ এখনও প্রয়োজনের তুলনায় কম
নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লার ফকির নিটওয়্যার লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক সৈয়দ ইমতিয়াজ রাজীব জানান, তাঁদের কারখানায় গ্যাসের চাপ কিছুটা বেড়েছে। তবে প্রয়োজনীয় ১০ পিএসআইয়ের বিপরীতে বর্তমানে প্রায় ৪ পিএসআই চাপ পাওয়া যাচ্ছে।
নারায়ণগঞ্জ ডাইং ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আমজাদ হোসেনের বক্তব্য, কারখানা স্বাভাবিকভাবে পরিচালনার জন্য যে পরিমাণ গ্যাসের চাপ দরকার, মঙ্গলবার পর্যন্ত তা পাওয়া যায়নি।
লোডশেডিং কমলেও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি
গ্যাসের ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎ উৎপাদনেও চাপ তৈরি হয়েছে। কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও কয়লার সংকট ও বিভিন্ন কারিগরি সমস্যার কারণে প্রত্যাশিত উৎপাদন সম্ভব হয়নি। ফলে প্রায় এক মাস ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিং চলছিল।
পরিস্থিতি সামাল দিতে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে উৎপাদন বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে পর্যাপ্ত ফার্নেস অয়েল না থাকায় সেখানেও উৎপাদন সীমিত। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ২০ সেপ্টেম্বরের পর তেলভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
গত বুধবার রাতে কারিগরি সমস্যার কারণে আদানি বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদন কমে যায় এবং লোডশেডিং বেড়ে যায়। রোববার দুপুর থেকে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট আবার বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করে। এরপর সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে কেন্দ্রটি থেকে ১ হাজার ৪০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
এর আগে রোববার সকালে কারিগরি সমস্যায় বাগেরহাটের রামপাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিটও বন্ধ হয়ে যায়। একটি ইউনিট বন্ধ থাকায় মঙ্গলবার কেন্দ্রটি প্রায় ৬১০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। পুরো সক্ষমতায় ফিরতে আরও দুই দিন সময় লাগতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পটুয়াখালীর দুটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যেও একটি কেন্দ্রে কারিগরি সমস্যার কারণে একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে। ফলে সেখানে উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ৫৭০ মেগাওয়াটে। অবশ্য কেন্দ্রটিতে পর্যাপ্ত কয়লা মজুত রয়েছে। একই জেলার অন্য একটি কেন্দ্রে কয়লার সরবরাহ বাড়ায় মঙ্গলবার উৎপাদন ১ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়েছে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ও পাওয়ার গ্রিড কোম্পানির তথ্য অনুযায়ী, কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ থাকলেও গত এক মাস ধরে কেন্দ্রগুলো পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যাচ্ছে না। জ্বালানি তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে সর্বোচ্চ প্রায় সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে।
সোমবার রাত ১টার দিকে দেশে লোডশেডিং ছিল ২ হাজার ৫০০ মেগাওয়াটের বেশি। মঙ্গলবার দিনের সর্বোচ্চ সময়ে তা প্রায় ২ হাজার মেগাওয়াটে নেমে আসে। গত মাসে একসময় লোডশেডিং সাড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াট ছাড়িয়ে গিয়েছিল। ফলে সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী, বিদ্যুৎ ঘাটতির কারণে লোডশেডিংয়ের মাত্রা আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে।