চিকিৎসাসেবার পরিধি সম্প্রসারণ এবং বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল পূর্ণাঙ্গভাবে পরিচালনার লক্ষ্য নিয়ে জাতীয় সংসদে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল’ পাস হয়েছে। নতুন আইনের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টি শিক্ষা কার্যক্রমের পাশাপাশি চিকিৎসাসেবা পরিচালনার জন্য মুনাফাভিত্তিক অথবা অলাভজনক (অমুনাফাভিত্তিক) কোম্পানি গঠন করতে পারবে।
সোমবার (১৪ জুলাই) জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হয়। তবে বিলটি নিয়ে সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে তীব্র বিতর্ক হয়। বিরোধী দল অভিযোগ করে, এ আইন কার্যকর হলে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণ ঘটবে এবং দরিদ্র জনগোষ্ঠীর চিকিৎসা পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত হবে। অন্যদিকে সরকার বলছে, এটি চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন ও বিশেষায়িত হাসপাতাল পরিচালনায় একটি প্রয়োজনীয় ও সময়োপযোগী উদ্যোগ।
বিরোধী দলের অভিযোগ: স্বাস্থ্যসেবার বাণিজ্যিকীকরণের পথ খুলবে
বিলটি পাসের আগে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব উত্থাপন করেন বিরোধী দলের একাধিক সংসদ সদস্য। তাঁরা বলেন, একটি সরকারি মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়কে মুনাফাভিত্তিক কোম্পানি গঠনের ক্ষমতা দেওয়া হলে তা দেশের সরকারি স্বাস্থ্যব্যবস্থার চরিত্র পরিবর্তন করবে।
তাঁদের অভিযোগ, এ ধরনের উদ্যোগের ফলে চিকিৎসাসেবা ধীরে ধীরে বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। এতে সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষ বর্তমানে যে স্বল্প ব্যয়ে চিকিৎসাসেবা পান, ভবিষ্যতে তা আর পাওয়া কঠিন হতে পারে।
বিরোধী সদস্যদের ভাষ্য, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত শিক্ষা, গবেষণা এবং জনকল্যাণ। সেখানে আয় বা ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলে জনস্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
শফিকুর রহমান: ‘যাঁদের সামর্থ্য নেই, তাঁরাই এখানে চিকিৎসা নিতে আসেন’
বিলের বিরোধিতা করে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেন, দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবা দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দেশের স্বাস্থ্যশিক্ষার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এখানে মূলত সেই সব মানুষ চিকিৎসা নিতে আসেন, যাঁদের ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালে যাওয়ার সামর্থ্য নেই।
তাঁর ভাষায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রমের সঙ্গে লাভজনক ব্যবসায়িক কাঠামো যুক্ত করা হলে শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয় জনগণের ওপরই চাপানো হবে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমানে মানুষ যে পরিমাণ স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে, তাতেও বিঘ্ন ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর জবাব: লাভের অর্থ বাইরে যাবে না
বিরোধী দলের সমালোচনার জবাবে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, বিলটির উদ্দেশ্য কোনোভাবেই স্বাস্থ্যসেবাকে বাণিজ্যিকীকরণ করা নয়; বরং আন্তর্জাতিক মানের একটি সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত কাঠামো তৈরি করা।
তিনি বলেন, হাসপাতালটি থেকে কোনো লাভ হলে সেই অর্থ ব্যক্তি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে যাবে না। বরং তা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন ও চিকিৎসাসেবা সম্প্রসারণে ব্যয় করা হবে।
মন্ত্রী জানান, কোম্পানির কাঠামোয় সরকারের ১০ শতাংশ শেয়ার থাকবে এবং পুরো কার্যক্রম বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেটের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে।
তিনি বলেন, কোম্পানি আইনের আওতায় দক্ষ ও অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞদের যুক্ত করে আরও উন্নত, আধুনিক ও মানসম্মত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করাই এই সংশোধনের মূল লক্ষ্য।
দরিদ্র রোগীদের জন্য থাকবে বিশেষ কোটা
স্বাস্থ্যমন্ত্রী আরও বলেন, বিরোধী দলের দাবি অনুযায়ী দরিদ্র মানুষ চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হবেন—এ ধারণা সঠিক নয়।
তিনি জানান, নিম্নআয়ের রোগীদের জন্য বিশেষ কোটা রাখা হবে এবং হাসপাতালটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান হিসেবেই পরিচালিত হবে।
তাঁর ভাষায়, “হাসপাতালকে জনকল্যাণমুখী করা হচ্ছে। এখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।”
কণ্ঠভোটে বিরোধী দলের প্রস্তাব নাকচ
বিলের ওপর দীর্ঘ আলোচনার পর বিরোধী দলের উত্থাপিত জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব কণ্ঠভোটে নাকচ করে দেয় সংসদ।
পরে একইভাবে কণ্ঠভোটে ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (দ্বিতীয় সংশোধন) বিল’ পাস হয়।
আইনে যেসব নতুন ক্ষমতা দেওয়া হলো
পাস হওয়া বিলে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা কার্যক্রমের অতিরিক্ত হিসেবে চিকিৎসাসেবার পরিধি সম্প্রসারণের জন্য—
কোম্পানি আইনের অধীনে মুনাফাভিত্তিক বা অমুনাফাভিত্তিক কোম্পানি গঠন করতে পারবে;
অন্য কোনো আইনের আওতায় জনকল্যাণমূলক বা দাতব্য কার্যক্রম পরিচালনার জন্য পৃথক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে;
এসব কার্যক্রম থেকে অর্জিত আয় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব প্রয়োজন ও উন্নয়নমূলক কাজে ব্যয় করতে পারবে;
প্রয়োজনে বিভিন্ন কোম্পানির শেয়ার অর্জন, ধারণ এবং হস্তান্তরের ক্ষমতাও বিশ্ববিদ্যালয়ের থাকবে।
কেন প্রয়োজন হলো আইন সংশোধনের
বিলের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে সরকার জানিয়েছে, বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নির্মিত ‘বাংলাদেশ মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতাল’–এর অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স এবং অন্যান্য সহায়ক জনবল নিয়োগ না হওয়া এবং পরিচালনার জন্য সুস্পষ্ট প্রশাসনিক কাঠামো না থাকায় হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
এই বাস্তবতা বিবেচনায় হাসপাতালটিকে কোম্পানি আইনের আওতায় পরিচালনা করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যাতে প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ, দক্ষ ব্যবস্থাপনা এবং আর্থিক কার্যক্রম আরও কার্যকরভাবে পরিচালনা করা যায়।
সরকারের মতে, নতুন আইনের মাধ্যমে সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালটি পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হবে এবং দেশের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা আরও বৃদ্ধি পাবে। তবে বিরোধী দল মনে করছে, এ উদ্যোগ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে জনস্বার্থ, চিকিৎসার ব্যয় এবং দরিদ্র মানুষের সেবাপ্রাপ্তি নিশ্চিত করতে সরকারের পক্ষ থেকে আরও স্পষ্ট নীতিমালা ও জবাবদিহি প্রয়োজন।