সংবিধানে গণভোটের বিধান (প্রভিশন) নেই—সরকারি দলের এমন অবস্থানের কঠোর সমালোচনা করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, যদি সংবিধানের দোহাই দিয়ে গণভোটের ফল বাস্তবায়ন না করা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে ২০২৬ সালেও জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের সাংবিধানিক ভিত্তি থাকবে না।
সোমবার (১৪ জুলাই) রাতে জাতীয় সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এ মন্তব্য করেন।
শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন ২০২৯ সালে হওয়ার কথা। ফলে সংবিধানের বিধানকে যদি এক ক্ষেত্রে মানা হয় এবং অন্য ক্ষেত্রে উপেক্ষা করা হয়, তাহলে তা সাংবিধানিক ও রাজনৈতিকভাবে অসঙ্গত হবে।
তিনি বলেন, “সংবিধানের মধ্যে যদি গণভোটের কোনো প্রভিশন না থাকে, তাহলে ২০২৬ সালেও কোনো নির্বাচন নেই। সংবিধান অনুযায়ী ২০২৬ সালে নির্বাচন হওয়ার কথা নয়, সেই নির্বাচন হওয়ার কথা ২০২৯ সালে।”
‘গণভোটে হ্যাঁ ভোটের পক্ষে সরকারও প্রচারণা চালিয়েছিল’
বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, গণভোটের আগে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী নিজেও ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন। একই অবস্থান নিয়েছিল বিরোধী দলও। সে সময় ক্ষমতাসীন দল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট বিজয়ী হলে জনগণের রায় বাস্তবায়ন করা হবে।
তিনি বলেন, গণভোটের ফল অনুযায়ী দুটি পৃথক শপথ গ্রহণের কথা ছিল—একটি সংসদ সদস্য হিসেবে এবং অন্যটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে।
শফিকুর রহমানের দাবি, বিরোধী দলের ৭৭ জন সংসদ সদস্য দুটি শপথই নিয়েছেন। কিন্তু সরকারি দলের সদস্যরা কেবল সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিয়েছেন এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের বিষয়টি বাস্তবায়ন করেননি।
‘জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন’
গণভোটের ফল বাস্তবায়নের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, জনগণের রায় বা অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন।
তাঁর ভাষায়, “জনগণের উইল হচ্ছে সুপ্রিম ল (জনগণের অভিপ্রায়ই সর্বোচ্চ আইন)। জনগণ চেয়েছিল বলেই ফ্যাসিস্ট সরকার বিদায় নিয়েছে। কোনো সংবিধানের আলোকে সেই সরকার বিদায় নেয়নি। পরে জনগণের অভিপ্রায়ে একটি সরকার গঠিত হয়েছে এবং সেই সরকারের জারি করা আদেশের ভিত্তিতেই গণভোট ও সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, একই প্রক্রিয়ায় সংসদ নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে কিন্তু গণভোটের ফল অগ্রহণযোগ্য হবে—এ ধরনের অবস্থান গ্রহণযোগ্য নয়।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “একটা যদি হালাল হয়, আরেকটা হারাম হয় কীভাবে?”
‘৫১ শতাংশ ভোট বড়, নাকি ৬৮.৬ শতাংশ?’
সরকারের অবস্থানের সমালোচনা করে শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমান বাস্তবতায় সংবিধান অনুযায়ী পূর্ববর্তী সরকারি দল কিংবা বিরোধী দল—কোনোটিই আর কার্যকর অবস্থায় নেই।
তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, সংসদ ও সরকারকে যদি জনগণের অভিপ্রায়ের ভিত্তিতে বৈধ ধরা হয়, তাহলে গণভোটে দেওয়া জনগণের রায় কেন অস্বীকার করা হবে?
তাঁর ভাষায়, “আপনি সংসদ মানবেন, সরকার মানবেন, জনগণের অভিপ্রায়ের এক অংশ মানবেন, আরেক অংশ মানবেন না। গণভোটকে অস্বীকার করবেন, আবার বলবেন ৫১ শতাংশ মানুষ আমাদের ভোট দিয়েছে। তাহলে ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ মানুষ যে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ বলেছে—৫১ শতাংশ বড়, নাকি ৬৮ দশমিক ৬ শতাংশ বড়?”
‘গণতন্ত্রের স্বার্থে নির্বাচন মেনে নিয়েছি’
জামায়াত আমির বলেন, জাতীয় নির্বাচনে সরকার গঠনের জন্য যে ভোট হয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের বিভিন্ন আপত্তি থাকলেও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার স্বার্থে সেটি মেনে নিয়েছেন।
তিনি বলেন, “আমাদের অনেক রিজার্ভেশন থাকা সত্ত্বেও আমরা মেনে নিয়েছি। শান্তি-শৃঙ্খলার স্বার্থে, গণতান্ত্রিক ধারা ফিরে আসুক—সেই স্বার্থে। তাহলে জনগণের বৃহত্তর অভিপ্রায়কে আমরা অস্বীকার করব কীভাবে? আমরা জনগণের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করতে চাই না।”
‘সংসদে ও রাজপথে আন্দোলন চলবে’
গণভোটের ফল বাস্তবায়নের দাবিতে সংসদের ভেতরে এবং রাজপথ—উভয় জায়গায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন বিরোধীদলীয় নেতা।
তিনি বলেন, “আমাদের লড়াই চলবে। আমরা বিশ্বাস করি, কোনো জনপদে জনগণের অভিপ্রায় বা রায় কখনো বৃথা যায় না। শেষ পর্যন্ত সেটাই বাস্তবায়িত হবে, ইনশা আল্লাহ।”
একই সঙ্গে তিনি বলেন, জনগণের অধিকার ও স্বার্থ উপেক্ষিত হলে বিরোধী দল কখনো নীরব থাকবে না।
তাঁর ভাষায়, “১৮ কোটি মানুষের রায়, স্বার্থ ও অধিকার উপেক্ষিত হবে আর বিরোধী দল সংসদে বসে সমর্থন দেবে—সেই বিরোধী দল আমরা নই। ভালো কিছু হলে অবশ্যই সমর্থন দেব, কিন্তু জনস্বার্থ বিঘ্নিত হলে অবশ্যই তার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াব। আজকের ওয়াকআউট সেই অবস্থানেরই অংশ।”
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আন্দোলনের প্রসঙ্গ
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ডা. শফিকুর রহমান ১৯৯৪ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরকার আন্দোলনের প্রসঙ্গ টেনে আনেন।
তিনি বলেন, সে সময়ও জামায়াতে ইসলামী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালুর জন্য সরকারকে অনুরোধ করেছিল। সরকার তা গ্রহণ না করায় সংসদের ভেতরে ও বাইরে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়।
তিনি বলেন, “শেষ পর্যন্ত সরকার আরেকটি সংসদ গঠন করে একটি মাত্র বিল পাস করেই বিদায় নিয়েছিল। সেই বিলটিই ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিল।”
‘সরকার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক’
জামায়াত আমির বলেন, সরকার পাঁচ বছর পর নয়, এখনই জনগণের সঙ্গে করা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করুক।
তিনি বলেন, জনগণ বর্তমানে এক ধরনের রাজনৈতিক অস্বস্তির মধ্যে রয়েছে এবং সেই পরিস্থিতি দূর করার দায়িত্ব সরকারেরই।
তাঁর বক্তব্য, “আমরা চাই সরকার তাদের দেওয়া ওয়াদায় ফিরে আসুক। জনগণকে সম্মান করুক। অবিলম্বে তা বাস্তবায়ন করুক। জনগণ যে অস্বস্তির মধ্যে আছে, সরকারি দলের দায়িত্ব হচ্ছে সেই অস্বস্তি দূর করা।”
ওয়াকআউটের কারণ ব্যাখ্যা করলেন এনসিপির সদস্যসচিব
সংসদ থেকে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের কারণ ব্যাখ্যা করে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্যসচিব আখতার হোসেন বলেন, বিরোধী দল শুরু থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন এবং গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে আসছে।
তাঁর অভিযোগ, সরকার সংবিধান সংস্কারের পরিবর্তে কেবল সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিটি গঠনের পথে এগিয়েছে।
আখতার হোসেন বলেন, সোমবার সংসদে সরকার সংবিধান সংশোধনের জন্য একটি কমিটি ঘোষণা করেছে। বিরোধী দলের মতে, ওই কমিটির নৈতিক ভিত্তি নেই। এ কারণেই প্রতিবাদস্বরূপ বিরোধী দল সংসদ অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেছে।