যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প আনুষ্ঠানিকভাবে মার্কিন কংগ্রেসকে জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র আবারও ইরানের সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়িয়েছে। কংগ্রেসে পাঠানো এক চিঠিতে তিনি বলেন, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন করে পরিচালিত সামরিক অভিযান যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস–এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত শুক্রবার (১০ জুলাই) তারিখে লেখা ওই চিঠিতে ট্রাম্প কংগ্রেসকে নতুন সামরিক অভিযানের বিষয়ে অবহিত করেন। এর মধ্য দিয়ে হোয়াইট হাউস ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানের আইনি ভিত্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
যুদ্ধক্ষমতা নিয়ে কংগ্রেসের সঙ্গে বিরোধ
ইরানকে ঘিরে ট্রাম্প প্রশাসনের সামরিক পদক্ষেপ নিয়ে এর আগেই কংগ্রেসের প্রতিনিধি পরিষদ প্রেসিডেন্টের যুদ্ধ পরিচালনার ক্ষমতার ওপর সীমাবদ্ধতা আরোপের উদ্যোগ নিয়েছিল।
আইনপ্রণেতাদের অভিযোগ ছিল, গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার আগে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কংগ্রেসের অনুমোদন নেননি।
যুক্তরাষ্ট্রের ১৯৭৩ সালের ‘ওয়ার পাওয়ারস রেজোল্যুশন’ (War Powers Resolution) অনুযায়ী, কংগ্রেসের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন ছাড়া কোনো সামরিক অভিযান শুরু করলে ৬০ দিনের মধ্যে প্রেসিডেন্টকে মার্কিন বাহিনী প্রত্যাহার করতে হয়, যদি না কংগ্রেস পরবর্তী অনুমোদন দেয়।
ট্রাম্পের যুক্তি: মার্কিন নাগরিক ও স্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব
কংগ্রেসে পাঠানো চিঠিতে ট্রাম্প দাবি করেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের বিরুদ্ধে নতুন সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা তাঁর সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ।
তিনি লেখেন, এই অভিযান “দেশে এবং বিদেশে মার্কিন নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য” পরিচালিত হচ্ছে।
হোয়াইট হাউসের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন এই সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক নোটিশ দেওয়ার ফলে প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য আরও ৬০ দিনের আইনি সময়সীমা পাবে।
যুদ্ধবিরতির পর আবার সংঘর্ষ
এর আগে গত মে মাসে ট্রাম্প কংগ্রেসকে জানিয়েছিলেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ৭ এপ্রিল যুদ্ধবিরতি চুক্তি কার্যকর হওয়ায় ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ নামে পরিচালিত সামরিক অভিযান সমাপ্ত হয়েছে।
কিন্তু গত সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে নতুন করে হামলা শুরু হওয়ায় সেই যুদ্ধবিরতি কার্যত ভেঙে পড়ে।
এর পাশাপাশি ১৭ জুন যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকও অকার্যকর হয়ে যায়।
চুক্তি ভঙ্গের জন্য ওয়াশিংটন ও তেহরান—উভয় পক্ষই একে অপরকে দায়ী করছে। ফলে সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আবারও দ্রুত বেড়ে গেছে।
হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার ঘোষণা
সোমবার দেওয়া এক বক্তব্যে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প আরও দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্র এখন হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করছে।
বিশ্ব জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হিসেবে পরিচিত হরমুজ প্রণালি ইরান-যুক্তরাষ্ট্র উত্তেজনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি পরিবহনের একটি বড় অংশ এই জলপথ দিয়ে পরিচালিত হয়।
নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র এই নৌপথের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে এবং সব ধরনের পণ্যবাহী জাহাজ থেকে ২০ শতাংশ মাশুল আদায় করবে।
ইরানের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধের হুঁশিয়ারি
ট্রাম্প আরও বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোর বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করবে।
তাঁর দাবি, ইরান কিংবা ইরানের গ্রাহকদের কোনো জাহাজকে হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে দেওয়া হবে না।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের ভাষায়, “ওয়াশিংটন ইরানের বন্দরগুলোতে আবারও নৌ অবরোধ পুনর্বহাল করবে এবং ইরান বা দেশটির গ্রাহকদের কোনো জাহাজকে এ পথ দিয়ে চলাচল করতে দেবে না।”
নতুন করে আঞ্চলিক উত্তেজনার আশঙ্কা
বিশ্লেষকদের মতে, ট্রাম্পের এই ঘোষণাগুলো মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সামরিক উপস্থিতি বৃদ্ধি, নৌ অবরোধ এবং বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজার, বৈশ্বিক বাণিজ্য এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তার ওপর তার বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে।
এদিকে ইরান এখন পর্যন্ত ট্রাম্পের সর্বশেষ ঘোষণার বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। তবে সাম্প্রতিক সংঘাতের জন্য তেহরান ও ওয়াশিংটন পরস্পরকে দায়ী করে আসছে। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা প্রশমিত হওয়ার পরিবর্তে নতুন করে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের আশঙ্কা আরও জোরালো হয়েছে।